
আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ : কৃষক মো: বোরহান খানের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তাঁর আবাদী জমির পরিমাণ ছিল ১০৫ শতাংশ। এই জমির ফসলই ছিল তার ৬ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের প্রধান উপার্জন খাত। বছর পাঁচেক আগেও ছিল তাঁর একান্নবর্তী সুখের সংসার। সন্তানরা বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। তাদের ঘরেও এসেছে সন্তানাদী। ছোট্ট বাড়িটিতে এখন অতিরিক্ত মানুষ আর সংকুলান হচ্ছে না। নতুন ঘর হয়ে পরে একান্ত প্রয়োজন। ছেলেদের নতুন বসতির জন্য নেই কোন ভিটে জমি। বাধ্য হয়েই ভাগ করে দেওয়া হয় আবাদী কৃষিজমি। সময়ের প্রয়োজনেই এ একান্নবর্তী পরিবারটি ভেঙে এখন তিন ভাগ হয়েছে। ফি বছর যেই জমিতে উঁকি দিতো নানা শস্য। পাকা ধানে মিশে থাকতো স্বপ্নের হাতছানি। ফসল আবাদের জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে
রঙিন টিনের চাল। সংগত কারণেই কৃষক বোরহান খানের আবাদী কৃষি জমি নেমে এসেছে এক তৃতীয়াংশে। জমি কমে যাওয়ায় তাঁর দুই ছেলে কৃষি কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে ছোট ব্যবসা করছেন।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার রাথুরা গ্রামের এই কৃষক বোরহানের নয়, জেলার সর্বত্রই আশংকাজনক হারেই কৃষিজমির মাঠজুড়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি,কারখানা, ইট ভাটা ও প্রতিষ্ঠান। আবাসন ও বাণিজ্যিক কাজে ফসলী জমির ব্যবহার মানিকগঞ্জে চরম মাত্রায় ঠেকেছে। এ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম
এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সারা দেশের মধ্যে কক্সবাজার, কুষ্টিয়া ও মানিকগঞ্জ জেলায় কৃষিজমির বাণিজ্যিক ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।

যেসব কারনে কমছে ও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি জমি : পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ এখনও কৃষিনির্ভর। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও নির্ধারিত হয়ে থাকে কৃষির উৎপাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর। কিন্তু দিন দিন দেশের কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। নতুন বসতভিটা,রাস্তাঘাট-অবকাঠামো নির্মাণ, ইটভাটা, কলকারখানা, নগরায়ণ,নদী ভাঙন, প্রাকৃতিক নানা দূর্যোগ, কৃষি জমির টপ সয়েল বিক্রি, তামাক চাষ, অধিগ্রহণেই ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে বেশি। বর্তমান এই হারে ভূমি অবক্ষয় চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কৃষিজমি আশংকাজনক হারে কমে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে খোদ সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর।
দিন দিন বাড়ছে মানুষ, কমছে কৃষিজমি। ফলে অব্যাহতভাবে আবাদী জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে বসত বাড়ি, স্থাপনা। মানুষের নিত্য নতুন আবাসন, রাস্তাঘাট আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে কৃষিজমিতেই। এছাড়া যত্রতত্র ইটের ভাটার ভীড়ে বিস্তর কৃষিজমি পরিণত হচ্ছে স্থায়ী অনাবাদী জমিতে। কারখানা ও ভাটার পাশ্ববর্তী জমিগুলোরও উর্বরতা শক্তি বিনষ্ট হচ্ছে মারাত্মক হারে। কোথাও আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ার নামে অপরিকল্পিতভাবে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে বিস্তর কৃষিজমি।
প্রবীণ সাংবাদিক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু বলেন, “ভূমি রক্ষায় রাষ্ট্রের সমন্বিত কোন পরিকল্পনা না থাকায় অপরিকল্পিতভাবে চলছে জমির ব্যবহার। গ্রামের কৃষি জমি দ্রুত অকৃষি খাতে যাচ্ছে। সংরক্ষিত ভূমি বলতে কিছু নেই। তবে নীতিমালা থাকলেও সরকারের মনিটরিংয়ের অভাবে এর তোয়াক্কা করছেন না কেউ।
প্রতিবছর মানুষের বসতি ও অবকাঠামোগত কারণে কমছে কৃষি ভূমি। তবে কি পরিমাণ কৃষিজমি কমছে কিংবা কি পরিমাণ জমি অনাবাদী হয়ে পড়ছে তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে। তবে কৃষি বিষয়ক বেসরকারি সংস্থার এক জার্নাল মারফত জানা গেছে, গড়ে বছরে প্রায় দেড়শ হেক্টর করে কৃষি জমি নিঃশেষ হচ্ছে।
১৩৭৮.৯৯ বর্গ কিঃমিঃ আয়তনের মানিকগঞ্জে ১৪ লাখের ওপরে জনসংখ্যার বাস। জেলার মোট জমির পরিমাণ ১২০৭৯৭.৩২ হেক্টর। আবাদী জমির পরিমাণ ১০৭৮১৭ হেক্টর উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে চিত্রটা অনেকটাই ভিন্ন। জেলার ঢাকা আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন বিস্তর জমি, ঘিওর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর উপজেলায় আবাসন,প্রতিষ্ঠান, কারখানা, ভাটা নির্মিত হওয়ায় আবাদী জমি কমেছে আশংকাজনক হারে।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা বারসিক এর মানিকগঞ্জ আঝ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল রায় বলেন, “কৃষিজমি প্রতিবছর কি পরিমাণ স্থাপনা, ভাটা, আবাসন ও নদী গর্ভে যাচ্ছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় প্রকৃত অবস্থা বোঝা মুশকিল। সঠিক পরিসংখ্যান করে কৃষিজমি রক্ষায় আইনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। নইলে ভবিষ্যতে স্থাপনার ভীড়ে আবাদী জমি কমে কৃষিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরো বলেন, “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ের অভাবে এবং এ সংক্রান্ত আইনের যথাথথ বাস্তবায়নের অভাবে দিন দিন আশংকাজনক হারে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি।
মানিকগঞ্জের ৭ ইউনিয়নে শতাধিক ইটের ভাটা রয়েছে। প্রভাবশালী লোকেরাই এসব ইটভাটার মালিক। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সিঙ্গাইরে ৪৭টি, ঘিওরে ৪টি, দৌলতপুরে ৩টি, সাটুরিয়ায় ৮টি, হরিরামপুরে ৫টি, মানিকগঞ্জ সদরের বিভিন্ন ইউনিয়নে ১২টি, শিবালয়ে ৬টি ইটভাটা চালু রয়েছে। এসব ভাটায় ইট তৈরির
প্রধান উপকরণ বিপুল পরিমাণ মাটির জোগান দিতে প্রতিবছরই ৪০০-৫০০ বিঘা তিন ফসলি জমি জলাশয়ে পরিণত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ইটভাটাই সরাসরি কৃষিজমিতে স্থাপন করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ঘিওরের শিবপুর মোড়ে প্রায় ৪০ একর কৃষিজমিতে ২টি, বাঙ্গালা এলাকায় প্রায় ১৪০ একর কৃষিজমিতে ১টি, সিংগাইরের বাইমাইল এলাকায় প্রায় ৪৮০ একর কৃষি জমিতে ৩টি, গিলন্ড এলাকার ৪৫ একর জমিতে ২টি ভাটাসহ ঢাকা আরিচা মহাসড়ক সংলগ্ন ও উপজেলা পর্যায়ে কমপক্ষে শতাধিক ভাটা সরাসরি আবাদী জমিতে গড়ে উঠেছে। সংগত কারণেই ভাটায় ইট পোড়ানোর ফলে পাশ্ববর্তী জমিগুলো দিন দিন অনূর্বর ও অনাবাদী হয়ে পড়ছে।
এই প্রসঙ্গে সাহিলী গ্রামের কৃষক মো. সাইদুর রহমান বলেন, “কৃষিজমিতে ইটভাটা গড়লে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ফসল উৎপাদন সম্ভব হয় না। আশপাশের জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। ফসল উৎপাদন কমে গেছে। এছাড়াও আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপনের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, দিন দিন বাড়ছে মানুষ, কমছে কৃষিজমি। ফলে অব্যাহতভাবে আবাদি জমিতে সৃষ্টি হচ্ছে বসতবাড়ি, স্থাপনা। মানুষের নিত্যনতুন আবাসন, রাস্তাঘাট আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে কৃষিজমিতেই। এ ছাড়া যত্রতত্র ইটভাটা নির্মাণ করায় কৃষিজমি পরিণত হচ্ছে স্থায়ী অনাবাদি জমিতে।
অপরদিকে তামাক চাষের কারণে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে মারাত্মকভাবে। এভাবে জমি ও এর উর্বরতা শক্তি বিপর্যয়ের ফলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে গত ১১ বছরে মোট ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে।
স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) এর বানিয়াজুরী শাখার কর্মকর্তা সুবীর কুমার সরকার বলেন, “কৃষিজমি সুরক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকার ফলে আমাদের কৃষিজমির যথেচ্ছাচার ব্যবহার করে নষ্ট করা হচ্ছে। কৃষিজমি নিয়ে বড় ধরনের
বিপর্যয়ের আগেই কার্য্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কৃষি জমি সুরক্ষায় তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের নিয়ে আমরা কাজ করছি।
এ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এক গবেষণায় বলেছে, বাংলাদেশে মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন হেক্টর। যার প্রায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশজুড়ে বনভূমি। ২০ দশমিক ১ শতাংশে স্থায়ী জলাধার, ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি, অবশিষ্ট ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ জমিকৃষি
কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। জমি কমায় আগামী ১০ বছরেই তা মারাত্মক আকার ধারণ করার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। গবেষণায় বলা হয়, দেশে গত ১১ বছরে মোট ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর বা ৮০ লাখ ৩৩ হাজার বিঘা কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। এই হিসেবে বছরে এ রূপান্তরের পরিমাণ ৭ লাখ ৩০ হাজার ৩২৬ বিঘা জমি। আর দেশে প্রতিদিন কমছে দুই হাজার বিঘা কৃষি জমি।

বিশিষ্ট আইনজীবী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন নেতা এ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষের মতে, কৃষিজমি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে প্রধানত কয়েকটি কারণে আর তা হলো, কৃষকের দুরদর্শী জ্ঞানের অভাব, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, ভূমিখেকো ও অসাধু ইটভাটা মালিকদের আগ্রাসন। অবিলম্বে কৃষি জমি সুরক্ষায় যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে অন্যথায় মারাত্মক খাদ্য ঝুঁকির আশংকা দেখা দিতে পারে বলে তিনি জানান।
বাড়ছে মানুষ। মানিকগঞ্জের স্থূল জন্মহার ১৬.৫৬ (হাজারে)। যা বিগত এক দশকের চেয়ে বৃদ্ধির হার প্রায় দেড় গুণ। গবেষণা বলছে, দেশে বছরে বাড়ছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। জমি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিশিষ্টজনেরা মনে করেন জনসংখ্যা বৃদ্ধি। প্রসঙ্গে জানাতে চাইলে, বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েশনের অতিরিক্ত মহা সচিব ডা. মো. আবুল হাসান বলেন, “ঘন জনবসতির দেশ হিসেবে সবার আগে বাংলাদেশে ভূমি ব্যবহারের জন্য নীতিমালা থাকা উচিত ছিল। তাইওয়ান, হল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ইসরাইলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিকল্পনা অনুযায়ী ভূমির ব্যবহার করা হচ্ছে। সেসব দেশে এক ইঞ্চি জমিও
পরিকল্পনার বাইরে ব্যবহারের সুযোগ নেই। কৃষি জমি দ্রুত বিভিন্ন খাতে রূপান্তরিত হচ্ছে। জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সবার আগে জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও নীতিমালা জরুরি।”
এ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এক গবেষণায় বলেছে, বাণিজ্যিক কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ৯৬ বিঘা বা ৬৯২ একর কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। রূপান্তরিত জমির পুরোটাই অকৃষি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে কৃষি জমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে।
ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এস আর আনসারী বিল্টু বলেন, পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে এক বাড়িতে স্থান সংকুলান সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, “আগের চাইতে মানুষের কৃষি কাজে এখন আগ্রহ কমে গেছে। অথচ কৃষিই আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।” রাথুরা গ্রামের ব্যবসায়ী মো. আকাশ আহমেদ রফিক বলেন, “কৃষিজমিতে এভাবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে স্থাপনা উঠলে তা উৎপাদনে প্রভাব পড়বেই। কৃষিজমি সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

কৃষি জমি অন্য খাতে ব্যবহার করতে হলে সরকারি অনুমোদনের বিষয় আছে। এছাড়া জলাধার সুরক্ষা আইন, বনভূমি ও পাহাড় রক্ষায়ও আইন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য ন্যাশনাল ল্যান্ড জোনিং প্রকল্পের (ফেজ-২) মাধ্যমে
ভূমির শ্রেণি অনুসারে জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের প্রথম পর্বে উপকূলীয় ১৯টি জেলাসহ ২১টি জেলায় জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই বিষয়ে মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী পাপিয়া সুলতানা জানান, কৃষি জমির যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে কৃষিজমিতে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করে সরকার সম্প্রতি একটি খসড়া আইন তৈরি করেছে। কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার এ আইনে বলা হয়েছে, কৃষিজমি নষ্ট করে বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, ইটখোলা এবং অন্যান্য অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদন্ড অথবা ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা
জরিমানা বা উভয় দন্ডের সুপারিশ করা করা হয়েছে। তবে অপরিহার্য ক্ষেত্রে বসতবাড়ি নির্মাণ করতে চাইলে আইনের বিধান অনুযায়ী ভূমি জোনিং মানচিত্র অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে তা করতে পারবেন।
মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মাজেদুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। মানিকগঞ্জের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশ্ববর্তী তিন ফসলী জমিতে ইট ভাটা, বসত বাড়ি ও শিল্প কারখানা তৈরি হওয়ায় আবাদ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে আইন মানছে না কেউ। এছাড়াও মাটির টপ সয়েল বিক্রির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদন। জেলায় মোট ৯৮৫০ হেক্টর আবাদী জমি রয়েছে, দিন দিন তা চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দশ বছরে আমাদের খাদ্য সমস্যা দেখা দেওয়ার আশংকা রয়েছে।
কৃষিজমি কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে বাড়িঘর তৈরি। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে সারা দেশে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল দুই কোটি সাড়ে ৪৮ লাখ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা তিন কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩০। বিশিষ্টজনের মতে, মানিকগঞ্জে বিগত এক দশকে লক্ষাধিক বসতবাড়ি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ৬০ শতাংশই আবাদী কৃষি জমিতে স্থাপিত হয়েছে। সেই হিসেবে কৃষিজমিতে আনুপাতিক হারে আগামী দশ বছরে অর্থাৎ ২০২১ সালে এর পরিমাণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই সাথে হ্রাস পাবে বিস্তর কৃষিজমি। সঙ্গত কারণেই উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে খাদ্য ঝুঁকির আশংকা বৃদ্ধি পাবে কয়েক গুণ।



