sliderরাজনীতিশিরোনাম

স্বৈরশাসন উচ্ছেদে আলাদা অবস্থান করার কোন সুযোগ নেই ।।আ স ম আবদুর রব

পতাকা ডেস্ক : বাংলাদেশ জাসদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল আজ ২৪ সেপ্টেম্বর’২২ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দলের সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি আ স ম আব্দুর রব, গণফোরাম সভাপতি মোস্তফা মহসিন মন্ট, কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কমরেড শাহ আলম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের কমরেড বজলুর রশিদ ফিরোজ। পরিচালনা করেন করিম সিকদার ও মনজুর আহমেদ মঞ্জু। উপস্থিত ছিলেন ইন্দু নন্দন দত্ত, ডাঃ মুশতাক হোসেন, কবি মোহন রায়হান, বাদল খান, আব্দুল কাদের হাওলাদার, নাসিরুল হক নওয়াব, আনোয়ারুল ইসলাম বাবু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহীদুল ইসলাম, রাজাশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সাভাপতি আজিজুর রহমান ছিদ্দিকী আরিফ, আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন এক সময় এই দল করেছেন এখন বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আছেন সেই সমস্ত নেতৃবৃন্দ ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলক জননেতা জনাব আ স ম আবদুর রব বলেন,
আপনাদেরকে জেএসডির পক্ষ থেকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি। জেএসডি এবং বাংলাদেশ জাসদ একই রাজনৈতিক পরিবারের কিন্তু অবস্থান ভিন্ন। বাংলাদেশ জাসদের কাউন্সিলে জেএসডিকে আমন্ত্রণ রাজনৈতিক মৈত্রী স্থাপনের উজ্জ্বল নিদর্শন হতে পারে।
প্রথমেই আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি যাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা। স্মরণ করছি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আদর্শের বেদীতে যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন সেই সিদ্দিক মাস্টার, মোশারফ হোসেন, কর্নেল তাহের, কাজী আরেফ আহমেদ, মারফত আলী, ইয়াকুব সহ অগণিত সাথীদের। স্মরণ করছি মেজর এম এ জলিল, মোহাম্মদ শাহজাহান, নুর আলম জিকু ও শাজাহান সিরাজসহ প্রয়াত নিবেদিত প্রাণ সাথীদের।
আপনারা জানেন, ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আত্ম প্রকাশ করে।
মুক্তি সংগ্রামের পর আমরাই প্রথম চিহ্নিত করতে পেরেছিলাম উপনিবেশিক, আমলাতান্ত্রিক ও গণবিরোধী রাষ্ট্রপ্রশাসন উচ্ছেদ না করে তা অক্ষত রেখে সমাজের চিরাচরিত দৃষ্টিভঙ্গির আশ্রয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
বড় ধরণের কোন আত্মসমালোচনা ছাড়া, দলের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মতাদর্শাগত লড়াই পরিত্যাগ করে দলের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তের প্রশ্নে আমরা দোষারোপ করার নীতি গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদেরকে সুরক্ষা এবং আত্মতৃপ্তির কৌশল গ্রহণ করি।
একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও দার্শনিক ক্ষেত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ স্বাধীনতার স্বপ্ন দ্রষ্টা সিরাজুল আলম খান সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত ও সমাজের প্রগতিশীল অংশের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যেই ‘অংশীদারিত্বের গণতন্ত্রের’ কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। আমরা এ কর্মসূচির অন্যতম উত্তরসূরী।
এ কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য সামাজিক সাম্যের ভিত্তিতে উৎপাদন, বন্টন ও উন্নয়নে জড়িত প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রদান করা, অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় শ্রম, কর্ম ও পেশাজীবী মানুষকে অংশীদার করা। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রমজীবী, কর্মজীবী ও পেশাজীবীদের অংশীদারিত্বের কর্মসূচির মাঝেই বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংস্কার সাধিত হবে।
‘অংশীদারিত্বের গণতন্ত্রই’ বাঙালি জাতির স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের উপযোগী একমাত্র কর্মসূচি যা জাতি এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কার্যকর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে, জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং জাতীয় উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করবে। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয় অংশীজনের ‘অংশীদারিত্ব’ ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাম্য ছাড়া একটা যথার্থ প্রজাতন্ত্র নির্মাণ করা যায় না।
এটাই বিপ্লবী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো এবং জনগণের সরকার গঠন করার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে আমাদের ঘোষিত শোষণ মুক্ত সমাজের পূর্বশর্ত তৈরি করবে।
এই অংশীদারিত্ব মূলক দর্শনে সমাজের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব সমূহ দ্বান্দ্বিক বিকাশের মধ্য দিয়ে জনগণের মাঝে লৌহ কঠিন ঐক্য গড়ে তুলবে। এই ধরণের জাতীয় ঐক্য বিশাল ও ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুরানো রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলবে এবং রাষ্ট্র ও সমাজকে অগ্রসর চিন্তার স্তরে নিয়ে যাবে। এটাই দর্শনের ঐতিহাসিকতা।
উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা বিলোপ না করায়, অংশীদারিত্ব মূলক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন না করায় প্রজাতন্ত্র একদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে অন্যদিকে শোষণ মুক্ত গণতান্ত্রিক ও নৈতিক সমাজ বিনির্মাণের সম্ভাবনা দূরবর্তী হচ্ছে। বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোর মধ্যে গণ আন্দোলন, গণসংগ্রাম, গণবিস্ফোরণ ও গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ রূপান্তরের আকাঙ্খা বাস্তবায়নে কর্তৃতবাদী স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন রচনা করতে হবে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা
তাই এবারের সংগ্রামের মূল লক্ষ্য কতৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী সরকার এবং নিপীড়ন মূলক উপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উচ্ছেদ করে ‘রাষ্ট্র রূপান্তরের’ প্রক্রিয়া শুরু করা। সমগ্র জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় ‘গণঅভ্যুত্থান’ সংঘটিত করে নৈতিক জাগরণের মাধ্যমে জাতিকে ‘বাঙালির তৃতীয় জাগরণ’ সম্পন্ন করতে হবে।
এ লক্ষ্যে সরকার বিরোধী আন্দোলনকারী সকল রাজনৈতিক শক্তিকে একটি সুস্পষ্ট ‘গণসনদ’ বা ‘জাতীয় রূপরেখা’ প্রণয়ন করে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
বিদ্যমান সংকট উত্তরণে ইতোমধ্যে আমরা জেএসডির পক্ষ থেকে ‘জাতীয় সরকার’র কর্মসূচি উত্থাপন করেছি। পরবর্তীতে, ’গণতন্ত্র মঞ্চের’ রুপরেখাসহ অন্যান্য দলের কর্মসূচি সম্পর্কে নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন।
সরকার বিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তি উপনিবেশিক কাঠামো পরিবর্তন, রাষ্ট্র সংস্কার ও মেরামতের প্রশ্নে সুস্পষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে গণঅভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তুলছে। এটার ঐতিহাসিক গুরুত্ব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। দীর্ঘদিন পর আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি দলীয় চৌহদ্দি অতিক্রম করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর গণদাবিতে পরিণত হচ্ছে।
সুতরাং, রাষ্ট্র রূপান্তরের প্রয়োজনে স্বৈরশাসন উচ্ছেদে আলাদা অবস্থান করার কোন সুযোগ নেই। রাজনীতি হচ্ছে সমাজের সমষ্টিগত ইচ্ছার ফলশ্রুতি। তাই গণমানুষের কাতারে দাঁড়াবার উপায় ও কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে।
কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো বলেছেন, ‘সমাজতন্ত্র’ ধারণ করে আমরা সর্বস্বান্ত হবো তবু পরিত্যাগ করবো না।
আমরাও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক গণতান্ত্রিক নৈতিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আন্দোলনে নিপীড়ন কারাগার ও মৃত্যুকে বরণ করবো কিন্তু ঘোষিত রাজনীতিকে আমৃত্যু পরিত্যাগ করবো না।
আসুন, ফ্যাসিবাদী সরকার ও গণবিরোধী শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের লড়াইয়ে লড়াইয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button