sliderপ্রবাসশিরোনাম

বাংলাদেশি আবদুল মোমেন কোরিয়ায় ইয়াং মো-মিন, দোভাষী হিসেবে আদালতে কর্মরত

বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়া এক দোভাষী এখন দেশটির ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন। তিনি নিজেকে ইয়াং মো-মিন বলে পরিচয় দেন। “মো-মিন” তার বাংলা নাম মোহাম্মদ আবদুল মোমেন থেকে নেয়া হয়েছে। বাংলায় মোমেন এর অর্থ নির্ভরযোগ্য এবং দয়ালু ব্যক্তি।
৪৯ বছর বয়সী মো-মিন ১৯৯৬ সালে কোরিয়া যান এবং কোরিয়ান ভাষা শেখায় মনোনিবেশ করেন। ২০১৩ সালে কোরিয়ান আদালতে তিনি তার প্রথম অনুবাদ পেশ করেছিলেন। ওই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে মো-মিন বলেন, “প্রথমে আমি এতোটাই নার্ভাস ছিলাম যে আমি ভুল করে ফেলতে পারতাম।”
মো-মিন পূর্ণকালীন বিচার বিভাগীয় দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বিচারক এবং পুলিশ কর্তৃক বাংলা ভাষায় কথা বলা আসামি বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিচার এবং তদন্তের ক্ষেত্রে সাহায্য করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় দৈনিক পত্রিকা জংআং ইলবোর ইংরেজি সংস্করণ কোরিয়া জংআং ডেইলি বুধবার মো-মিনের জীবনী নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
মো-মিনের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে পাস করেন। কোরিয়ায় বসবাসকারী এক বন্ধুর মাধ্যমে তিনি ২৩ বছর বয়সে কোরিয়ায় চলে যান
তিনি প্রথমে একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন। ট্রাক চালানো থেকে শুরু করে নথিপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ করা পর্যন্ত সবকিছুই তিনি করতেন। এরপর তিনি ছয় বছর ইংরেজি ভাষাও শিখিয়েছেন। সেসব দিনের কথা মনে করে মো-মিন হাসতে হাসতে বলেন “আমাকে অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
এদিকে, নানান প্রতিকূলতা স্বত্ত্বেও মো-মিন কোরিয়ান ভাষা রপ্ত করতে থাকেন। স্বাভাবিক বন্ধুসুলভ আচরণের কারণে চারপাশের লোকজনের সাথে তার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে।
আদালতে কাজ করা এক পরিচিত ব্যক্তি মো-মিনকে বিচারিক কাজে অনুবাদ করতে উৎসাহিত করেন। মো-মিন এর আগে অনেকবার দোভাষী হিসেবে কাজ করলেও বিচার বিভাগীয় কাজ ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম । কাজটি করতে গিয়ে তিনি ভয় পেয়ে যান, কারণ যদি কোনো দোভাষী বিচারের কাজে ভুল করে, তাহলে তার পরিণতি কেবল আসামিই বুঝতে পারে। তিনি বলেন, “আমি এখনও গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করি কারণ আমি ভয় পাই, যদি কোনো ভুল হয়ে যায়।”
মো-মিন ২০১৫ সালে আদালত প্রশাসনের অফিসে বিচার বিভাগীয় দোভাষী হিসেবে নিবন্ধিত হন। এ বছর তিনি সিউল কেন্দ্রীয় জেলা আদালতে পেশাদার অনুবাদক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০ সালে ১৭২ জন বাংলাদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে (২০১৮ সালের ১০৬ জন থেকে অনেক বেশি)। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই সহিংসতা, যৌন অপরাধ, কোরিয়ায় অবৈধ অবস্থান এবং শরণার্থীর স্বীকৃতি সম্পর্কিত অভিযোগের কারণে অভিযুক্ত।
মো-মিন আইন ও বিচার ব্যবস্থা সহ সংশ্লিষ্ট সমস্ত বিষয় অধ্যয়নে আগ্রহী। তিনি বলেন, “এখানে কতজন মন্ত্রী রয়েছেন এবং কোরিয়ান সরকার ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে তা আপনাকে জানতে হবে। আইনকে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য দেশ কীভাবে পরিচালিত হয় সেটা জানতে হয়।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “মানুষ যা বলে তা ঠিক সেভাবে বলা দরকার এবং দোভাষী কর্তৃক গোপন তথ্য কখনোই ফাঁস করা উচিত নয়।” নিজ কাজের প্রতি গর্ব করে তিনি বলেন, “মানুষ যখন বলে যে তারা বিচারে দাঁড়ানোর জন্য সাহস পায় কারণ তারা আমাকে বিশ্বাস করে, তখন আমি গর্বিত বোধ করি।”
মো-মিন বিদেশি কর্মীদের জন্য কোরিয়া সহায়তা কেন্দ্রে পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। নিজেদের সাথে অন্যায় (যেমনঃ অবৈতনিক মজুরি বা যৌন নির্যাতন) কিছু হয়ে গেলেও কোরিয়ান ভাষা না জানায় যাদের যোগাযোগ করতে সমস্যা হয় সে সমস্ত বাংলাভাষী ভুক্তভোগীদেরও তিনি সাহায্য করেন। তিনি বলেন, “আমি এমন দোভাষী হতে চাই যে, আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো নিয়েও কাজ করবে, বাংলাদেশ ও কোরিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে উঠবে।”
মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button