
আহমেদ জহুর : স্বপ্নের পদ্মাসেতু। দেশের সবচে’ দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে অনেকের অনেক অবদান রয়েছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রয়াত মাসুদ নিজামীর অবদানও স্মরণযোগ্য। মৃত্যুর অবধি তিনি ছিলেন পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন আন্দোলনের সভাপতি। ৩০ জানুয়ারি নিজামী ভাইয়ের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। মহান স্রষ্টা যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।
অগ্রজ সাংবাদিক মাসুদ নিজামী ছিলেন সদালাপী, বন্ধুবৎসল, নিরহঙ্কারি। চমৎকার নেতৃত্বের গুণাবলী ছিল তার কাজে ও মননে। তার সাথে পেশাগত কিছু স্মৃতি আমার রয়েছে, যা স্মৃতিকথায় লিপিবদ্ধ করব।
নিজামী ভাই ১৯৪৮ সালের পয়লা জানুয়ারি বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জের গোয়ালভাওর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এসএম ওবায়েদ উল্লাহ ছিলেন স্কুল-শিক্ষক। মাতা মরিয়ম জোহরা ছিলেন গৃহিনী। স্ত্রী আফজালা বেগম লুলু ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক। চারভাই দুইবোনের মধ্যে মাসুদ নিজামী ছিলেন সবার বড়। তিনি ১৯৬২ সালে এসএসসি, ১৯৬৭ সালে এইচএসসি ও ১৯৭৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ পাস করেন। তার মেজভাই একেএম আনোয়ারুল কাদের একজন কৃষিবিদ ও ব্যাংকার। সেজ ভাই এটিএমএ লতিফ (প্রয়াত) ছিলেন চিকিৎসক ও ছোটভাই একেএম জহিরুল হক রানা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এর একজন সিনিয়র সাংবাদিক।
মাসুদ নিজামীর কর্মজীবন শুরু ১৯৬৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাক-এ সাব-এডিটর হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। পরে দৈনিক আজাদ হয়ে দৈনিক সংগ্রাম-এ সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন। এখানে দীর্ঘদিন চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮০ সালে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধের কারণে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এরপর তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক কিষাণ-এ বিশেষ সংবাদদাতা হিসাবে এবং রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তা’র ঢাকা ব্যুরোতে কাজ করেন। পরে ‘দৈনিক জনতা’য়ও কিছুদিন কাজ করেন। দীর্ঘ বেকারত্বের পর ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে প্রকাশিত দৈনিক মিল্লাত-এ বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
এরপর তিনি দৈনিক ইনকিলাব-এ প্রথমে বিশেষ সংবাদদাতা এবং পরে নগর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিক ইউনিয়নের কার্যক্রম জোরদার করতে গিয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে ১৯৯৮ সালে ইনকিলাবও ছেড়ে যান। এরপর তিনি ইংরেজি দৈনিক গুড মর্নিং-এ যোগদান করলেও মূলত তার সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক পল্লীবাংলা নিয়ে তিনি ব্যস্ত থাকেন। তবে অর্থাভাবে এই কাগজটিও নিয়মিত প্রকাশ করতে পারেননি। এ সময় তিনি বরিশাল বিভাগ সাংবাদিক সমিতি ঢাকার সভাপতি, বাংলাদেশ জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন আন্দোলনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আমৃত্যু এই তিনটি সংগঠনের সভাপতি ছিলেন।
মাসুদ নিজামী কেবল একজন দক্ষ সংবাদকমী ছিলেন না, ছিলেন একজন সুদক্ষ ইউনিয়নকর্মী ও অসাধারণ সংগঠক। সাংবাদিকতায় আসার আগে তিনি সুনামের সঙ্গে স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। পড়াশোনার ফাঁকে শিক্ষকতা করে পরিবার ও ছোট ভাই-বোনদের তিনি লেখাপড়ায় সহায়তা করেছেন। নানা সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার নিজের লেখাপড়া যেমন বিঘ্নিত হয়েছে, তেমনি সময়মত সংসারও শুরু করতে পারেননি। স্কুলশিক্ষকতা করার সময় ১৯৬৮-৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নে একজন বড় মাপের নেতা ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহসভাপতি ও সহকারী মহাসচিব এবং ডিইউজের সহসভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সাংবাদিক সমাজের সঠিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। তা ছাড়া তিনি বাংলাদেশ উপকূলীয় কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শ্রমিক মুক্তি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকাস্থ বরিশাল বিভাগ সমিতি এবং মেহেন্দিগঞ্জ সমিতিরও নেতা ছিলেন। এর বাইরে তিনি অনেক সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
ইনকিলাবের চাকরি ছাড়ার পর মাসুদ নিজামীর মন ভেঙে যায়। কার্যত তিনি বেকার হয়ে পড়েন। এরপর নয় বছর বেঁচে ছিলেন। অবশ্য শেষ দুই বছর তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। দীর্ঘ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তাকে নিদারুণ পীড়া দিলেও তিনি কখনো দমে যাননি বা অসততার সাথে আপোস করেননি। অত্যন্ত বিনয়ী, সৎ ও সাহসী এই মানুষটি ২০০৫ সালে কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরে গেলেও কিছুদিনের মধ্যে তাকে আবার হাসপাতালে যেতে হয়। শেষ বছরটা তিনি বেঁচে ছিলেন হিমোডায়ালাইসিসের মাধ্যমে। এ সময় সাংবাদিক নেতা, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় তার এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চলে। সারা জীবন অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া মানুষটি শেষ জীবনে অন্যের সহযোগিতা নেয়ার প্রয়োজন হওয়ায় মন খারাপ করতেন, হতাশা ব্যক্ত করতেন। কারণ, তিনি যে দিতে পছন্দ করতেন, নিতে নয়। ২০০৭ সালের ৩০ জানুয়ারি ৫৯ বছর বয়সে রাজধানীর মিলেনিয়াম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজামী ভাইয়ের বেহেস্ত কামনা করছি।
® আহমেদ জহুর, কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক




