
সুরুজ খান, মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কর্মজীবন কেবল সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের কথা বলা, অন্যায় তুলে ধরা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকে তাঁরা সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন। সাংবাদিক জালাল আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
আজ ১৮ আগস্ট ২০২৬—তাঁর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৪ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন এবং পেশার প্রতি নিষ্ঠার স্মৃতি আজও মানিকগঞ্জের সাংবাদিকতার অঙ্গনে স্মরণীয়।
জালাল আহমেদের জন্ম ১ মে ১৯৪৪। ছাত্রজীবন থেকেই সমাজ ও মানুষের নানা অসঙ্গতি তাঁকে ভাবাত। সেই ভাবনা থেকেই সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তান-এর মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাদার সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা।
এরপর তিনি ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি (এনা)-এর মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি, দৈনিক বাংলার মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি ও পরে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মানিকগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে ঢাকার সাংবাদিকতার অঙ্গনেও তিনি পরিচিতি তৈরি করেন।
তাঁর সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পকে গুরুত্ব দেওয়া। দুর্নীতি, অনিয়ম, শিক্ষা ও পরীক্ষার অসঙ্গতি, সড়ক দুর্ঘটনা, পরিবেশ, সামাজিক বৈষম্য, কিশোর অপরাধ কিংবা মানুষের ব্যতিক্রমী জীবনকাহিনি—বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে তাঁর প্রতিবেদনে।
শুধু সংবাদকর্মী হিসেবে নয়, সাংবাদিকদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি সাভার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, বাংলাদেশ টেলিভিশন সংবাদদাতা সমিতি, ঢাকা রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৬০-এর দশকে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সামাজিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের কথা তুলে ধরার চেষ্টা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল সমাজমুখী।
জালাল আহমেদের সাংবাদিকতা ছিল ঝুঁকিমুক্ত কোনো পেশা নয়। সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি পিছিয়ে যাননি। তাঁর লেখা ও প্রতিবেদনের বড় শক্তি ছিল তথ্য অনুসন্ধান, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ঘটনাকে পাঠকের সামনে জীবন্ত করে তোলার ক্ষমতা।
তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে নির্বাচিত কিছু লেখা পরবর্তীতে সংকলিতও হয়েছে। এসব লেখার মধ্য দিয়ে শুধু একজন সাংবাদিকের কর্মদক্ষতাই নয়, একটি সময়ের মানিকগঞ্জ ও বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতারও ছবি পাওয়া যায়।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জালাল আহমেদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। সংবাদপত্রের পাতায় যাঁরা সত্য ও মানুষের কথা লিখে গেছেন, তাঁদের অবদান সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না।
১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিক জালাল আহমেদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য হয়ে থাকুক সততা, সাহস ও দায়িত্ববোধের অনুপ্রেরণা।
জন্ম: ১ মে ১৯৪৪
মৃত্যু: ১৮ আগস্ট ২০১৪
পরিচয়: প্রবীণ সাংবাদিক, সংগঠক ও লেখক
বিশেষ পরিচয়: মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি



