জমি নেই এক টুকরা, তবুও চোখে সোনা ঝড়া হাসি

গত বছর যখন পাকা ফসল চোখের সামনে আগাম বন্যায় তলিয়ে যায়, তখন সাবিত্রী দাসের চোখে ছিল টলমলে পানি। আবার এ বছর যখন সোনালী ধানে ভরে গেছে হাওর তার মুখেও দেখা দিয়েছে সোনা ঝড়া হাসি। মনে হবে অনেক বেশি জমির মালিক সাবিত্রী দাস। কিন্তু হাওরের এই বিশাল ধানের জমিতে তার নেই এক টুকুরো জমি। তারপরও সাবিত্রী দাসের এই হাসি-কান্নার পিছনে রয়েছে তার পাওয়া-না পাওয়ার আনন্দ-বেদনা। কারণ হাওরের ধান কুড়িয়ে তিনি তার অন্ন জোটান। শুধু তাই নয়, তার সন্তানদের লেখাপড়ার অনেকাংশ নির্ভরশীল এই ফসলের উপর।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার আতুকুড়া গ্রামের মতিলাল দাসের স্ত্রী সাবিত্রী দাস। ১৪ বছর আগেই মারা যান কৃষি শ্রমিক তার স্বামী। পরিবারে ২ ছেলে ও ১ মেয়ে। সহায়-সম্বলহীন এই পরিবার কিভাবে চলবে তার, এ নিয়ে চিন্তায় অস্থির সাবিত্রী দাস। নিরূপায় হয়ে সাবিত্রী দাস নেমে যান মাঠে। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি সন্তানদের গড়ে তোলেন।
সাবিত্রী জানান, হাওরে যদি ভালো ফসল হয়, তখন তিনি ধান কুড়িয়ে তা সংগ্রহ করেন। পরে এই ধান দিয়ে তার ঘরের অন্নের সংস্থান হয়। অন্য সময় তিনি মাটি কাটাসহ বিভিন্ন কাজ করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন। বৈশাখ মাস আসলে তিনি প্রতিদিন ভোরবেলা বেড়িয়ে যান হাওরে। সাথে নেন দুপুরের খাবার। হাতে থাকে কাঁধে ব্যাগ আর ঝুড়ি। শ্রমিকের ফেলে যাওয়া ধানের শীষ একটি একটি করে সংগ্রহ করেরাকেন ঝুড়িতে । গোধূলী লগ্নে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন তখন তার ঝুড়িতে সংগ্রহ হয় ২০ থেকে ২৫ কেজি ধান। পুরো মাসজুড়ে তিনি হাওর থেকে ধান কুড়ান। পরে সেগুলো দিয়ে খাওয়া চলে যায় বছরের অধিকাংশ সময়।
তিনি আরো জানান, তার সাথে আরো অনেক লোকজন এই ধান কুড়ানো কাজে অংশ নেন। এমনকি স্কুলে লেখাপড়া করা দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরাও পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সেখানে যায়। তবে তার মতো বয়স্কা কোনো মহিলা এই কাজে যান না। ধান কুড়ানোর কাজে সবচেয়ে বয়স্ক নারী তিনিই। যিনি বজ্রপাত আর ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করেন হাওরে। কোনো উপায় না থাকায় সংসারকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন সাবিত্রী। হাওরে ধান হলে তাদের মনে অনেক আনন্দ আর যদি ফসল বিনষ্ট হয় তাহলে সাবিত্রীদের মনে জমে থাকে কষ্ট। হাওরই তাদের প্রাণ। বর্ষাকালে এই হাওর থেকে তারা সংগ্রহ করেন মাছ।
তিনি মনে করেন শুধু যারা ফসল ফলায় তারাই হাওরের উপকারভোগী নয়, এই ফসলের সাথে সাবিত্রীর মত ভূমিহীন অনেক মানুষের ভাগ্য জড়িত রয়েছে ।
সাবিত্রী জানান, বড় ছেলে ধান কাটার শ্রমিক হিসাবে নিয়োজিত। আর ছোট ছেলে এবার এসএসসি পাস করেছে এবং মেয়েটা আগামীতে এসএসসি দেবে। বড় ছেলে এবং মায়ের আয় দিয়েই চলে দুইজনের লেখাপড়ার খরচসহ সংসার।
খান বাহাদুর এহিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া সাবিত্রী দাসের ছেলে ভীম দাস মায়ের এই কষ্টের কথা উল্লেখ করে জানান, সে ভবিষ্যতে লেখাপড়া করে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে চায়। মেয়ে শোভা দাসও একই আশাবাদ ব্যক্ত করে।
সাবিত্রী দাসের বড় ছেলে মঙ্গল দাস, এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করে দারিদ্র্যের জন্য আর লেখাপড়া করতে পারেনি। তবে সে চায় তার ছোট ভাই-বোনেরা যেন তার মতো ঝরে না যায়। এর জন্য সে দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। বাসস




