আইন আদালতশিরোনাম

আমিনবাজারে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনের যাবজ্জীবন, কী ঘটেছিল সেই রাতে

পতাকা ডেস্ক : ঢাকার আমিনবাজারে দশ বছর আগে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার মামলার রায়ে প্রধান আসামি মালেকসহ ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ বেলা ১১টার পর ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ইসমত জাহানের আদালত এ রায় দেন। সকাল সাড়ে ৮টায় মামলার ৫৭ আসামির মধ্যে ৪৪ জনকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাদের আদালতে আনা হয়। এরপর তাদের রাখা হয় আদালতের হাজতখানায়।
২০১১ সালে আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যার ওই ঘটনা পুরো দেশকে স্তম্ভিত করে দেয়।
পুলিশের অভিযোগপত্র পেয়ে ২০১৩ সালে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ৬০ আসামির বিচার শুরু করেছিল আদালত। সাক্ষ্য আর যুক্তিতর্ক শেষ করে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসতে লেগে গেছে আট বছর। এই সময়ের মধ্যে মামলার আসামিদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ১৬ জন পলাতক রয়েছেন।
জামিনে থাকা ৪২ আসামির জামিন বাতিল করে ২২ নভেম্বর তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।
এ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর শাকিলা জিয়াসমিন মিতু জানান, আসামিদের সবার সর্বোচ্চ শাস্তির আর্জি জানিয়েছেন তারা।
আসামি যারা: আব্দুল মালেক, সাঈদ মেম্বর, আব্দুর রশিদ, ইসমাইল হোসেন রেফু, নিহর ওরফে জমশের আলী, মীর হোসেন, মজিবর রহমান, কবির হোসেন, আনোয়ার হোসেন, রজুর আলী সোহাগ, আলম, রানা, আ. হালিম, ছাব্বির আহম্মেদ, আলমগীর, আনোয়ার হোসেন আনু, মোবারক হোসেন, অখিল খন্দকার, বশির, রুবেল, নূর ইসলাম, আনিস, সালেহ আহমেদ, শাহাদাত হোসেন রুবেল, টুটুল, অখিল, মাসুদ, নিজামউদ্দিন, মোখলেছ, কালাম, আফজাল, বাদশা মিয়া, তোতন, সাইফুল, রহিম, শাহজাহান, সুলতান, সোহাগ, লেমন, সায়মন, এনায়েত, হায়দার, খালেদ, ইমান আলী, দুলাল , আলম, আসলাম মিয়া, শাহীন আহমেদ, ফরিদ খান, রাজীব হোসেন, হাতকাটা রহিম, মো. ওয়াসিম, সেলিম মোল্লা, সানোয়ার হোসেন, শামসুল হক ওরফে শামচু মেম্বার, রাশেদ, সাইফুল, সাত্তার, সেলিম ও মনির।
২০১১ সালের ১৭ই জুলাই শবে বরাতের রাতে আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামের কেবলার চরে বেড়াতে যান সাত তরুণ। তারা সবাই ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তেন।
স্থানীয় কিছু লোক তাদের ধরে ডাকাত আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করে। তাতে একজন প্রাণে বাঁচলেও ছয়জন মারা যান।
নিহত ছয়জন হলেন ধানমন্ডির ম্যাপললিফ স্কুলের ‘এ’ লেভেলের ছাত্র শামস রহিম শাম্মাম, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ইব্রাহিম খলিল, বাঙলা কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তৌহিদুর রহমান পলাশ, তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের টিপু সুলতান, মিরপুরে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের সিতাব জাবীর মুনিব এবং বাঙলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র কামরুজ্জামান।
হামলায় গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান কেবল আল-আমিন। পরে তার কাছ থেকে সেই রাতের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।

কী ঘটেছিল সেই শবে বরাতের রাতে
২০১১ সালের ১৭ জুলাই। রাতটি ছিল শবে বরাতের। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা যখন আল্লাহর এবাদতে ব্যস্ত ঠিক তখনই সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি গ্রামের কেবলার চরে ঘটে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। সেই রাতে ৭ বন্ধু মিলে বেড়াতে এসেছিলেন বড়দেশি গ্রামের তুরাগ নদীর তীরে কেবলার চরে। রাত সোয়া ১টার দিকে স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী ও দুর্বৃত্তরা স্থানীয় মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত’ বলে ঘোষণা দিয়ে ৬ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করে।
এরপর লাশগুলো চরে ফেলে রাখে। পরদিন সকালে সাভার মডেল থানা পুলিশ ডাকাত পরিচয়েই ৬ ছাত্রের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। তাদের পরিচয় শনাক্তের আগেই বড়দেশি গ্রামের বালু ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বাদি হয়ে সাভার মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় নিহত ৬ ছাত্রকে। কিন্তু ওই রাতের হত্যাকাণ্ড থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আল-আমিনের বক্তব্যে বেরিয়ে আসে হত্যার মূল ঘটনা। বাদি আব্দুল মালেকই তখন হয়ে যান হত্যা মামলার আসামি। এরপর একের পর এক ঘটনা সামনে আসতে থাকে।
সেই রাতের প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই জানান, ৬ ছাত্র নৌকায় নদী পার হয়ে বড়দেশি গ্রামের কেবলার চরে আসা মাত্রই তাদের জিজ্ঞাসা করা হয় তারা কোথায় যাবে। কিন্তু তারা এসব গ্রামের নাম না জানায় তেমন সদুত্তর দিতে পারেনি। এই অপরাধেই তাদের ‘ডাকাত’ বলে চিহ্নিত করে স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী ও দুর্বৃত্তরা। তারা মাইকে ‘ডাকাত’ বলে ঘোষণা দিয়ে ৬ ছাত্রকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে। এ সময় আল আমিন নামের তাদরে এক বন্ধু দৌড়ে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন। পরদিন সকালে পুলিশ ওই ৬ ছাত্রের লাশ উদ্ধার করে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, নিজে বাঁচার জন্য আব্দুল মালেক নিহত ৬ ছাত্রের বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলা করেন। সাক্ষাতকারে সে সময় মালেক জানিয়েছিল, এসব ছেলেরা নাকি নেশা করতে কেবলার চরে এসেছিল। কিন্তু খবরটি গণমাধ্যমে প্রচারের পর দুপুরের দিকে ৬ ছাত্রের পরিচয় শনাক্ত হয়। পাল্টে যায় দৃশ্যপট।
পরে জানা যায় নিহতরা কেউ ডাকাত নয়, তারা সবাই কলেজছাত্র। তারা ছিল ধানমন্ডির ম্যাপললিফ স্কুলের ‘এ’লেভেলের ছাত্র শামস রহিম শাম্মাম, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইব্রাহিম খলিল, বাংলা কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তৌহিদুর রহমান পলাশ, তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র টিপু সুলতান, মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সিতাব জাবীর মুনিব এবং বাংলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র কামরুজ্জামান।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ মামলার মোট আসামি ছিল ৬০ জন। তাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন, পলাতক ১২ জন। রায় ঘোষণা উপলক্ষে কারাগারে থাকা ৪৫ আসামিকে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির করা হয়। এ মামলায় ২০১৩ সালের ৮ জুলাই ৬০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ৫৫ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর।
সচেতন মহলের দাবি, হামলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ লোকই মাদক ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত।
সাভার থানা সূত্রে জানা গেছে, ছয় ছাত্রকে হত্যার অভিযোগে পুলিশ বাদি হয়ে সাভার থানায় একটি মামলা করে। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলাটি র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি র্যাব ৬০ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এতে সাক্ষী করা হয় ৯২ জনকে।
বৃহস্পতিবার ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ইসমত জাহান রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই ঘটনায় ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ইত্তেফাক/ইউবি
বিষয়:
সাভা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button