শিরোনামসাময়িকি

স্বাধীন মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার এবং একুশ বিষয়ক প্রথম সাহিত্য ম্যাগাজিন

আমাদের বাড়ির দেয়াল ঘেঁষা এই শহীদ মিনারটি স্বাধীন মানিকগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারিতে এটি উদ্বোধন করা হয়েছিল । উদ্বোধন করেছিলেন আমাদের পাড়ার শহীদ বুদ্ধিজীবী,যশোরেরর মাইকেল মধুসূদন দত্ত কলেজের অধ্যাপক সিরাজ উদ্দীন আহমেদের পিতা নৈমুদ্দিন আহমেদ।
সদ্যস্বাধীন দেশে স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত আমাদের পাড়ার তরুণ আর বড় ভাইদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এই শহীদ মিনার।
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে এটি নির্মিত হয়। মানিকগঞ্জে এমন আদলের অনেক শহীদ মিনার এখন নির্মিত হয়েছে। কিন্তু এটিই ছিল মানিকগঞ্জে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে গড়া প্রথম শহীদ মিনার।
আমাদের পাড়াটি ছিল ছোট্ট ছিমছাম দশটি পরিবারে সমন্বয়ে গড়া ।
১৯৭২ সনের জানুয়ারিতে পাড়ার প্রতিবেশী বড়ভাই ফজলুল হক ভানু,আমার আপন বড়ভাই শফি উদ্দীন আহমদের ( বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় “শহীদ কাশেম স্মৃতি সংসদ”।
সংসদের সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী পাড়ার মাঝামাঝি অবস্থিত ছোট্ট খোলা যায়গায় একটি শহীদ মিনার নির্মানের। শুরু হল চাঁদা তোলা। আমরা যারা ছোট তারা দল বেঁধে পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে রশিদ দিয়ে চাঁদা তুলতাম। পাশাপাশি রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদর ধরে পথচারীদের কাছ থেকেও চাঁদা তুলতাম। মানুষ খুশি হয়ে সিকি আধুলি,একটাকা,দশ পয়সা চাঁদা দিয়েছেন। দিন শেষে সেই চাঁদার টাকা তুলে দিতাম বড় ভাইদের হাতে। কোন দিন ৫০টাকা.কোন দিন ১০০ টাকার মত। এই টাকা দিয়ে ইট,বালু,রড কেনা হল, রাজমিস্ত্রির পারিশ্রমিক পরিশোধ চললো।
সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো শহীদ মিনারের পিলার নির্মান। নিখুঁত ডিজাইনে পিলার নির্মান নিয়ে। অদক্ষ রাজ মিস্ত্রির পক্ষে সেটি করার বিড়ম্বনা নিয়ে যখন সবাই চিন্তাগ্রস্থ তখন এক রাতে এর সমাধান করে ফেললেন কাশেম স্মৃতি সংসদের স্কুল পড়ুয়া দুরন্ত তিন তরুণ,আমার সেজ ভাই,মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি গোলাম ছারোয়ার ছানু,এককালের বিশিষ্ট ফুটবলার মহিদ,ফটো সাংবাদিক নূরুন্নবী রবি। তারা বড়দের কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে ঠেলাগাড়ি নিয়ে চলে গেলেন মানিকগঞ্জ মাইক্রোওয়েভ স্টেশনে। মাইক্রোওয়েব স্টেশনে কাঁটা তারের সীমানা বেষ্টনী দেবার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে আনা মাথা বাঁকানো পিলারের স্তুপের কাছে। চুপিসারে পটাপট তিনটি পিলার ভ্যানে তুলে নিয়ে আসলেন। সেই পিলারই এই শহীদ মিনারের মূলস্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হল। একে একে গড়ে উঠলো বেদী,চারপাশে পোঁতা হল শহীদ মিনারের সিমানা পিলার। প্রবেশপথ খোলা রেখে পিলার থেকে পিলারের মাথায়,মাঝামাঝি মোটা লোহার শিকলে ঘিরে দেয়া হল। রঙ করা হল।
উদ্বোধনের দিন সকালে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে শুরু হল আমাদের স্মৃতির মিনারের যাত্রা। বিকেলে এই শহীদ মিনারচত্তরে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় আয়োজন করা হল মিলাদ মাহফিলের। আমার বাবাসহ পাড়ার সব মুরুব্বী এসেছিলেন মিলাদে।
সেদিনের কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে,ভোর থেকে সন্ধ্যা অবধি আমাদের পুরো পাড়ায় ছিল উৎসবের আমেজ।
শুধু শহীদ মিনারই নয় একই সময়ে শহীদ কাশেম স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় স্বাধীন মানিকগঞ্জের প্রথম সাহিত্য বিষয়ক ম্যাগাজিন “বর্ণমালা”।
৮৮ পৃষ্ঠার এই ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন ফজলুল হক ভানু,কার্যকরী সম্পাদক ছিলেন শফিউদ্দিন আহমদ। গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ,দেশ বরেণ্য লেখকদের লেখার সংকলনসহ যতদূর মনে পড়ে ৩৮টি লেখা তাতে ছাপা হয়েছিল। এই ৩৮টি লেখার মধ্যে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল আমার জীবনের প্রথম কবিতা।
শহীদ মিনার নির্মান এবং বর্ণমালা প্রকাশের জন্য দিনভর শ্রম মেধা দিয়েছেন আমাদের বড় ভাইয়েরা। তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম মনে আছে,তাঁরা হলেন- ফরিদ ভাই,কামাল ভাই,আফরোজা আপা,জাহাঙ্গীর ভাই,দেলোয়ার ভাই,দুলাল ভাই,মুজিবুর ভাই,মানু ভাই,মাসুদ ভাই,জাফর ভাই,ফারুক ভাই,খোকন ভাই, শহীদ ভাই,অহিদ ভাই,চঞ্চল,মহিদ,ছানু,রবি,পাখি, খসবু,ফরহাদ,মজিদ,সিরাজ,মট্টু,মুছা,বাহার,রাজু,ইছাক,আসাদ,সেলিম, বিল্টু,রহমান,আমি এবং সবার কাছে প্রিয় শাজাহান ভাই।
এঁদের প্রায় প্রত্যেকেই আজ নিজ নিজ ব্যক্তিজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব।
[ ছবি পরিচিতি:
01.আমাদের শহীদ মিনারের বর্তমান রুপ
02.শহীদ আবুল কাশেম
03.বর্ণমালায় ছাপা হওয়া আমাদের শহীদ মিনারের তৎকালের ছবি।
04. ‘বর্ণমালা’য় প্রকাশিত কবি সুকান্তের কবিতা
05.একুশের রাতে আমাদের শহীদ মিনার। ]
——-
বিঃ দ্রঃ বর্ণমালার কোন একটি সংখ্যা মানিকগঞ্জের কারও কাছে যদি সংরক্ষিত থাকে আমাকে জানাবেন, ফটোকপি করে নেব। আমার অকাঙক্ষা বর্ণমালাকে একই রূপে পুনর্মুদ্রনের ।
.

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button