পুলিশ আমাদের মানসিক টর্চার করছে : মিন্নির বাবা
সাদা পোশাকের পুলিশ সার্বক্ষণিক ‘ছায়ার মতো’ অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি হওয়া আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। তিনি অভিযোগ করেছেন, ‘সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো আমার ও আমার পরিবারের পেছনে ওরা লেগে আছে। পুলিশ এভাবে আমাদের মানসিক টর্চার করছে।’
নিজ বাড়িতে বসে বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) এমন অভিযোগ তুলে বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর মামলাটির পুনঃতদন্তের মাধ্যমে মূল রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেন। তিনি প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা কামনা করেন।
মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘আমার নির্দোষ মেয়েটি ৪৮ দিন পর অতিকষ্টে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। রাতে ঘুমের ঘোরে মেয়েটি ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। মানসিক ও শারীরিকভাবে সে অসুস্থ। তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে রাখা হয়েছে। তার দুই হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা।’
গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা না বলা এবং বাবার জিম্মায় থাকার শর্তে মিন্নিকে জামিন দেয় হাইকোর্ট। পরে গত মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) বরগুনা কারাগার থেকে মুক্তি পান আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় মুক্তির পর কারাফটকে সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি কোনো কথা বলেননি। সেখান থেকে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সরাসরি শহরের মইঠা এলাকায় বাবার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
মোজাম্মেল হোসেন কিশোর আরো বলেন, ‘আমি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। আমার নির্দোষ মেয়েটি দেড় মাস অতিকষ্টে জেলে ছিল। অথচ আমার মেয়ে ছিল এ মামলার সাক্ষী। মিন্নি তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেদিন সন্ত্রাসীদের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।’
একটি প্রভাবশালী মহলের কারণে তার মেয়েকে আসামি করা হয়েছে ও বিনা দোষে দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন কিশোর। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো সাদা পোশাকধারী পুলিশ আতঙ্কে আছি। ওরা সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো আমার ও আমার পরিবারের পেছনে লেগে আছে। বাড়ির আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। আমি কোথায় যাই, কী করছি সব খোঁজখবর নিচ্ছে ছদ্মবেশে।’
‘আমার মেয়ে স্বামীহারা হয়েছে। আর পুলিশ আমাদের কেন মানসিক টর্চার করছে?’ এমন প্রশ্নও ছুড়ে দেন তিনি।
এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন ধরেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা থানার ওসি (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির। আর বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবীর মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছুই জানা নেই।’
মিন্নির উন্নত চিকিৎসার পর সুস্থ হলে আবার সে পড়াশোনা শুরু করবে বলে আশা করছেন মিন্নির বাবা। আলোচিত এ হত্যা মামলাটির অধিকতর, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তে আবারও পিবিআইকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
মোজাম্মেল হক কিশোর জানান, গত ১৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জননিরাপত্তা বিভাগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ও আইজিপি বরাবরে করা আবেদনে উল্লেখ করেন, ‘রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি প্রধান সাক্ষী ছিল। হত্যাকাণ্ডের ১৯ দিন পর মামলার প্রধান সাক্ষী আমার মেয়েকে হঠাৎ করে মামলার বাদী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন। একটি প্রভাবশালী মহল ও পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা রিফাত শরীফের বাবা অর্থাৎ বাদীকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে আমার মেয়েকে হত্যার সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে আমার মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে বাধ্য করে। যা আমার মেয়ের ঐচ্ছিক জবানবন্দি নয়। আমি রিফাত শরীফ হত্যা মামলার অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অথবা সিআইডিতে হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছি।’
গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর পরের দিন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন, তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছিল শরীফের স্ত্রী মিন্নিকে। পরে তিনি তার ছেলেকে হত্যায় পুত্রবধূর জড়িত থাকার অভিযোগ করে সংবাদ সম্মেলন করলে ঘটনা নতুন দিকে মোড় নেয়।
এদিকে এ হত্যা মামলার অভিযুক্ত ২৪ নম্বর আসামি আরিয়ান হোসেন শ্রাবণকে মিডিয়ার সঙ্গে কথা না বলার শর্তে জামিন দেওয়া হয়েছে। বুধবার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান আরিয়ানের জামিনের এ আদেশ দেন।




