বন্যাদুর্গত এলাকায় রিলিফের গম গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে

এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির ৩ উপজেলার বন্যায় আক্রান্ত লোকজনের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। চাল, চিড়া, মুড়ি, তেল, ডাল, দিয়াশলাইসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রিও ত্রাণ হিসেবে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে বানভাসী মানুষের মাঝে চালের পরিবর্তে গম দেয়া হচ্ছে ত্রাণ হিসেবে। আর এই গম নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছেন বানভাসী মানুষজন। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। গম শুকানোর মতো একটু জায়গা কিংবা রোদ কোনোটিই নেই। ভুক্তভোগীরা তা না ফেলতে পারছেন, না খেতে। সরকারিভাবে বরাদ্দ হিসেবে চালের কথা থাকলেও দেয়া হচ্ছে গম।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুলাউড়া উপজেলার বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য সর্বশেষ ত্রাণ হিসেবে বরাদ্দ মিলেছে ৬৯ মেট্রিক টন গম। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় দুর্গত মানুষের মধ্যে এই গম বিতরণ করা হয়। গত ০১ জুলাই থেকে এই গম ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে।
উপজেলার জয়চ-ী ইউপি’র আবুতালিপুর, মিঠুপুর, বেগমান এলাকার বন্যাকবলিতরা জানান, ৫ কেজি করে পরিবার প্রতি গম দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ৫ কেজি কিন্তু একটি বালতি দিয়ে দ্রুত বিতরণের জন্য কাউকে ৪ কেজি আবার কাউকে সাড়ে ৪ কেজি করে গম দেয়া হয়েছে।
আবুতালিপুর গ্রামের দিলারা বেগম, শামছুল মিয়া, নৃপেন্দ্র নাথ, জিতেন্দ্র দাস, তারেক মিয়া প্রমুখ জানান, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর ত্রাণ হিসেবে দেয়া হলো গম। এই গম শুকাবো কোথায়? ভাঙবো কোথায়? উল্টো খাজনার চেয়ে যেনো বাজনাই বেশি হয়ে গেলো।
ভুকশিমইল ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, তিনি আগে গম বিতরণ করেননি। তবে গত ০৩ জুলাই থেকে বিতরণ করছেন। প্রতি পরিবারে ১৩ কেজি করে গম দেয়া হচ্ছে। তবে গম শুকানো ও ভাঙানো একটা বাড়তি ঝামেলা দুর্গতদের জন্য।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শিমুল আলী জানান, দুর্গত মানুষের জন্য ৬৯ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিতরণ শুরু হয়েছে। গম দেয়াটা সরকারি সিদ্ধান্ত। আমাদের কিছু করার নেই।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মো: গোলাম রাব্বি জানান, প্রতি পরিবারের জন্য ১৩ কেজি করে গম বরাদ্দ দেয়ার নিয়ম রয়েছে। জয়চ-ী ইউনিয়নের বিষয়টি আমি জেনেছি। সেখানে নাকি লোকজন বেশি হওয়ায় সংশ্লিষ্টরা কম করে দিয়েছে। আর গমের পরিবর্তে চাল দেয়া যায় কি-না বিষয়টিা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করবো।
এদিকে বড়লেখা উপজেলার শতাধিক গ্রামের পানিবন্দী হাজার হাজার দুর্গত মানুষের গলার কাঁটা সরকারি রিলিফের গম। ঘরে হাটু কিংবা কোমর পানি। নেই রান্না ও ঘুমানোর জায়গা। হাতে টাকা-পয়সাও নেই। এর মধ্যে সরকারি রিলিফ হিসেবে দেয়া হচ্ছে ১০ কেজি করে গম। দুর্গতরা রিলিফ নিতে ইউনিয়নে গিয়ে যখনই দেখেন গম, তখন অনেকে তা ভাঙানোর ঝক্কি-ঝামেলা ও অর্থসংকটের কারণে না নিয়েই ফিরে যান।
সরেজমিনে উপজেলার দক্ষিণভাগ (দক্ষিণ) ইউনিয়নে দেখা গেছে, রিলিফ নিতে শত শত বন্যাদুর্গত মানুষের ভীড়। ইউপি’র ২নং ওয়ার্ডের রাঙাউটি গ্রামের হরলাল দাস, খোকা লাল দাস, মুফিজ মিয়া, দীপক পাল, ঝলক পাল, আয়শা বেগম প্রমুখ জানান, এলাকার মেম্বার জয়নাল আবেদীন শুনু আমাদের খবর দেয়ায় প্রায় অর্ধ-কিলোমিটার কোমরপানির রাস্তা মাড়িয়ে রিলিফ নিতে ইউনিয়নে যাই। গিয়ে দেখি চালের পরিবর্তে গম দেয়া হচ্ছে। এখন এগুলো কোথায় ভাঙাবো, গত ২-৩ মাস থেকে দিনে একবেলা মুখে খাবার দিতে পারছি না সেখানে গম ভাঙানোর টাকা পাবো কোথায়। আগে জানলে এগুলো নিতেই আসতাম না।
আরেক ত্রাণগ্রহীতা তমাল বিশ্বাস জানান, অনেক দূর থেকে এসেছি যখন নিয়েই যাই। গম ভাঙানোর টাকা না থাকায় কয়েকজন দুঃস্থ নারী গম না নিয়েই ফিরে গেছেন।
ত্রাণ নিতে যাওয়া রুফিয়া বেগম জানান, সরকারি রিলিফের এ গম আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য গলার কাঁটা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের আগে উপজেলার ১০ ইউনিয়নের বন্যাদুর্গত দরিদ্রদের মাঝে ৬১ মেট্রিক টন গম জিআর (সরকারি রিলিফ) বরাদ্দ পাওয়া যায়। ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা ঈদের আগে আংশিক গম বিতরণ করেন। অবশিষ্ট গম গত সোমবার ও মঙ্গলবার বিতরণ করা হয়। উপজেলার প্রত্যেক ইউনিয়নের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হতদরিদ্র লোকজন গম নিয়ে নানা বিড়ম্বনায় পড়েছেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজাদের রহমান জানান, সর্বশেষ গত ৩ জুলাই এ উপজেলায় ৪৫ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বরাদ্দ হিসেবে চাল কিন্তু দেয়া হচ্ছে গম। সরকারি যেভাবে বরাদ্দ আসে সেভাবেই বিতরণ করা হচ্ছে। এতে আমাদের কিছু করার নেই।
সুত্র: নয়া দিগন্ত




