sliderস্থানিয়

আলফাডাঙ্গায় হত্যাকান্ডের পর প্রতিপক্ষের বাড়িতে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাট, আতঙ্কে জনশূন্য গ্রাম

সরেজমিন প্রতিবেদন

বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি: ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অস্বাভাবিক নীরবতা। গ্রামের সরু পথ ধরে যত ভেতরে যাওয়া যায়, ততই সামনে আসে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। কোথাও দোতলা ভবনের ছাদে হাতুড়ির আঘাতে বড় বড় গর্ত, কোথাও ভেঙে ফেলা হয়েছে দেয়াল। কোনো বাড়ির দরজা-জানালা নেই, কোনো বাড়ির টিনের চাল খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা আলমারি, খাট, টেলিভিশন, চেয়ার-টেবিলসহ গৃহস্থালির নানা সামগ্রী। জানা গেছে, গত ২৬ জুন কলেজছাত্র সুমন শেখ (২৪) হত্যাকান্ডের পর প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও বড়ভাগ গ্রামে এখনও থামেনি প্রতিশোধের নামে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ।

শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা গ্রাম জুড়ে ঘুরে দেখা যায়,অন্তত ৮ থেকে ১০টি পরিবারের বসতবাড়িতে সংঘটিত হয়েছে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ।

তবে স্থানীয় গ্রামবাসীদের দাবি, এসব হামলার বেশিরভাগই ঘটেছে প্রকাশ্য দিবালোকে।  বড়ভাগ গ্রামের বিভিন্ন পাড়া ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বাড়ির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। যেসব বাড়িতে হামলা হয়েছে, সে সব পরিবারের সদস্যরা অনেক আগেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। গ্রামের মানুষের চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। কেউ ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি নন, এমনকি নাম প্রকাশ করতেও ভয় পাচ্ছেন। একজন বৃদ্ধ কথা বলতে শুরু করতেই পাশ থেকে তার স্ত্রী ছুটে এসে বলেন, “চুপ করেন, কিছু বলবেন না। আবার যদি বিপদ হয়?” এরপর আর একটি শব্দও বলেননি ওই বৃদ্ধ। 

সরেজমিনে সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুটি ভবনই কার্যত বসবাসের অনুপযোগী। ঘরের প্রতিটি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, খাট, ফ্রিজ, টিভি ছিল সবকিছুই ভেঙে তছনছ করে ফেলা হয়েছে। দরজা-জানালা খুলে নেওয়া হয়েছে। পাশেই ছেলে হুসাইন শেখের দোতলা ভবনের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ভবনের ছাদে শাবল দিয়ে একাধিক স্থানে বড় বড় গর্ত করা হয়েছে। কয়েকটি কক্ষের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, “চুরি করতে হলে মানুষ দরজা ভাঙে। কিন্তু এখানে তো পুরো বাড়িটাই ভেঙে ফেলেছে। এটা শুধু লুটপাট না, প্রতিশোধের ধ্বংসযজ্ঞ।” গ্রামবাসীর দাবি, প্রথমে হামলাকারীরা মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় এসে শাবল, হাতুড়ি, লোহার রড দিয়ে পুরো বাড়ি ভাঙতে থাকে। অনেক বাড়ির টিনের চাল পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দরজা, জানালা, গ্রিল, কাঠ, বৈদ্যুতিক তার খুলে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, তাই নিয়ে গেছে।

এলাকাবাসীর ভাষ্যনুযায়ী, এটা সাধারণ ভাঙচুর না। পরিকল্পিতভাবে বাড়িগুলোকে বসবাসের অযোগ্য করে দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে যে বাড়িগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা গেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখ, হুসাইন শেখ, উকিল শেখ, এনায়েত শেখ, জনি শেখ, আলিম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, আজগর শেখ, উজ্জ্বল শেখরকিব শেখসহ আরো কয়েকজনের বাড়ি। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একই ধরনের হামলার চিহ্ন। আলিম শেখের স্ত্রী শাপলা বেগম থানার ওসির কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, হামলাকারীরা আলমারি ভেঙে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও প্রায় ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে। এছাড়া ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র ভাঙচুর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগে বলেন, প্রতিবাদ করলে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তবে ওসির দাবি, এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ থানায় জমা দেওয়া হয়নি।  

স্থানীয় ও থানা সূত্রে জানা গেছে, বড়ভাগ গ্রামের দুই পক্ষের বিরোধ নতুন নয়। সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হুসাইন শেখ এবং একই গ্রামের মুরাদ খানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। বছর কয়েক আগে ওই বিরোধে হুসাইন শেখের ডান হাতের কব্জি কেটে ফেলার ঘটনাও ঘটে। সেই মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন। ১৯ জুন হুসাইন শেখের সমর্থক আলিম শেখ ও তার ছেলে হামলার শিকার হন। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর ২৬ জুন সন্ধ্যায় কলেজছাত্র সুমন শেখকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। 
নিহত সুমনের ভাই শামীম শেখ বাদী হয়ে ১৭ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১৭ জন আসামির মধ্যে আজ শনিবার পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  তিনি অভিযোগ করে বলেন,২১ দিনেও পুলিশ মাত্র একজনকে ধরেছে। বাকিরা প্রকাশ্যে ঘুরছে। আমাদের এখনও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যদিও প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমরা কোনো ভাঙচুর করিনি। পুরো গ্রামই তাদের ওপর ক্ষুব্ধ।”

ফরিদপুর পুলিশ জানিয়েছে, নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কয়েক ঘণ্টা গ্রাম ঘুরেও কোনো পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়নি। ওই সময় ঘটনাটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন গ্রামবাসী। একজন বলেন, “যদি পুলিশ পাহারা থাকে, তাহলে দিনের বেলায় এত বড় বড় বাড়ি ভাঙল কারা?” আরেকজনের প্রশ্ন, “ছাদ ভাঙতে তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগে। তখন পুলিশ কোথায় ছিল?”

আলফাডাঙ্গা থানার ওসি ফকির ফাইজুর রহমান এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেন, উপরের নির্দেশ রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলেন।

ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল আজম বলেন, হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় কেউ মামলা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  এদিকে মামলার তদন্তভার ইতোমধ্যে আলফাডাঙ্গা থানা থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সরেজমিনে যা দেখা গেল, বড়ভাগ গ্রামে এখন মানুষের চেয়ে বেশি চোখে পড়ে ভাঙা দেয়াল। যেখানে ছিল বসার ঘর, সেখানে এখন ইট-পাথরের স্তূপ। যেখানে ছিল সংসারের আসবাব, সেখানে পড়ে আছে ভাঙা কাঠ আর কাঁচ। কিছু ঘরে শিশুদের বই-খাতা মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। রান্নাঘরে উল্টে পড়ে আছে হাঁড়ি-পাতিল। অনেক ঘরের সিলিং ভেঙে দেয়া হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button