sliderস্থানিয়

রানু মাসুকের নেতৃতে চলে পাড় ক্কাটা বিলীনের পাথে পর্যটন কেন্দ্র ‘শিমুল বাগান’, নির্মাণাধীন সেতু

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে পর্যটন কেন্দ্র ‘শিমুল বাগান’, নির্মাণাধীন সেতু এবং অন্তত ২২–২৮টি গ্রাম এখন বিলীনের পথে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করায় এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানটি এখন চরম হুমকির মুখে। বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই শিমুল বাগানটি প্রতি বছর বসন্তে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানে যাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে, যার ফলে বাগানটি নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শুধু বাগানই নয়, যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটিও হুমকির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে সেতুর ৫টি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়রা এর জন্য নদীর পাড় কেটে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনকে দায়ী করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রতিদিন গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত পরিবেশবিধ্বংসী ড্রেজার ও সেইভ মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছে। বিশেষ করে গড়কাটি থেকে শুরু করে ঝালরটেক ও ঘাগটিয়া গ্রাম পর্যন্ত নদীর পাড় কেটে কোয়ারি তৈরি করা হয়েছে। এই অপকর্মের নেপথ্যে ঘাগটিয়া গ্রামের রানু মেম্বার, খাসতাল গ্রামের ডেভিল মাসুক আরোপ মাসুক সর্দার ও মানিগাঁও গ্রামের হাসানের নাম উঠে এসেছে। রানু মেম্বার অভিযোগ অস্বীকার করলেও এলাকাবাসীর দাবি, তাদের তাণ্ডবে ইতিমধ্যে ২০-২৫টি গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়েছে এবং অনেক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

যাদুকাটা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল ও নাসির মিয়া জানান, তারা শুরু থেকেই নদীর পাড় কাটার বিরুদ্ধে এবং এখানে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘শিমুল বাগান ও সেতুসহ এই জনপদ রক্ষার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ দরকার। পুলিশ ক্যাম্প ও কোস্টগার্ড নিয়োগের জন্য আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি।’

তাহিরপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুক আলম শান্তনু জানান, প্রশাসন বালু উত্তোলন বন্ধে তৎপর রয়েছে। রানু মেম্বার ও হাসানসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট চালানো হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৬টি মামলা এবং ৭০১ জনকে আসামি করা হয়েছে। রানু মেম্বারের বিরুদ্ধেই ১৯টি মামলা রয়েছে। মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্সের অভিযান ছাড়া এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জানান, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক নিজেও অভিযান পরিচালনা করার কথা জানান।

শিমুল বাগানের বর্তমান মালিক রাখাব উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার বাবার তিল তিল করে গড়ে তোলা এই বাগান বালু খেকোরা ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রশাসনকে বারবার জানানোর পরও বালু সিন্ডিকেট থামছে না।’

ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা রাফিয়া বেগম অভিযোগ করেন, রানু মেম্বার তার বাহিনী নিয়ে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ভেঙে বালু লুট করছে, কেউ বাধা দিলে মারধর ও অগ্নিসংযোগের হুমকি দেওয়া হয়।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী এই শিমুল বাগান ও যাদুকাটা তীরের জনপদ অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button