শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদাতা: জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা হাটের দক্ষিণ পাশ দিয়ে প্রায় তিনশ বছর আগে পদ্মা নদীর প্রবাহিকায় সৃষ্টি হওয়া, দেশের সর্ব পশ্চিমের মনাকষা ইউনিয়ন দিয়ে বয়ে আসা এক সময়ের খরশ্রতা চকের নদীর অস্তিত্ব বিলীনের পথে। ঐতিহাসিক সূত্র মতে যার অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে মনাকষা ইউনিয়নের সর্বপশ্চিমে ভারত সীমান্ত থেকে নদীটি মনাকষা বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রায় আটটি মৌজার ওপর দিয়ে বিনোদপুর,মনাকষা ও দূর্লভপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে তর্তিপুর এলাকায় গিয়ে পাগলা নদীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং পরবর্তীতে পদ্মা নদীতে গিয়ে যুক্ত হয়।
একসময় এই খরশ্রতা নদীকে কেন্দ্র করে নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ জনপদ, উত্তর বঙ্গের প্রাচীনতম আদিনা ফজলুল হক কলেজ, দাদনচক হেমায়েত উচ্চবিদ্যালয়, মনাকষা হুমায়ুন রেজা উচ্চ বিদ্যালয়, মনাকষা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সহ প্রায় ১৫টি শিক্ষা প্রত্ষ্ঠিান,চৌকা ও মনাকষা সহ কয়েকটি বিওপি কয়েকটি বড় বড় হাটবাজার, মনাকষা শ্মশান ঘাট,তত্তীপুর শ্মশান ঘাট,মনাকষা নীল কুঠির কারখানা (বর্তমানে বিলুপ্ত) সহ অসংখ্যা ছোট বড় প্রতিষ্ঠান। নদীর পানি ব্যবহার করে সহশ্রাধীক কৃষক কৃষি জমিতে সেচ দিতেন, শত শত জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং বর্ষা মৌসুমে নৌকাই ছিল প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। ৫শ বা হাজার মণি নৌকা যোগেই দেশ বিদেশের বড় বড় বনিকরা ব্যবসা বানিজ্য করতে নদী পথে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতো। নদীটি ছিল এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু কালের বিবর্তনে ভারতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মানের পর পদ্মা নদীয় প্রবাহ অন্যদিকে মোড় নেয়ায় এ নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে হওয়ার সাথে সাথে এক শ্রেণীর ভূমি দস্যু নদীর হাজার হাজার বিঘা জমি নানা কৌশলে দখল করে নিয়েছে।
এ নদীটি স্বাধীনতা উত্তরকালেও ভারতীয় সীমান্ত থেকে তত্তীপুর পর্যন্ত প্রায় ১২/১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও প্রায় ১৫০/২০০মিটার প্রস্থ চকের নদী আজ অস্তিত্বের সংকটে। প্রাণচাঞ্চল্য বিলীনের পথে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর বুক জুড়ে হাজার হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ। এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে এ নদীর বুক জুড়ে বছরে তিনবার বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হয়। তারমধ্যে ধান,পাট,ভুট্টা,সবজি,কলাই,গম,সহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উল্লেখ্যযোগ্য। পলি জমে নদী ভরাট, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হওয়া, নদীর জায়গা দখল করে চাষাবাদ বা বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে সহ নানা কারণে নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি থাকে না ।
মনাকষা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল হালিম, আবু হোসেন, বীর মুক্তি যোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসনে মন্টু,বদিউর রহমান বুদ্ধু সহ অনেক মুরুব্বী বলেন, “একসময় এই নদীতে সারা বছর পানি থাকত। আমরা এখানে গোসল করতাম, মাছ ধরতাম, নৌকায় চলাচল করতাম। বর্তমানে নদীটি মরা খালে পরিণত হওয়ায সব ঐতিহ্যই বিলীণ হয়ে গেছে, একই এলাকার কৃষকরা জানান, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শ্যালোমেশিনের ও মর্টারের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, একটি নদী কেবল পানির উৎসই ছিল না, বরং একটি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। চকের নদীর মতো ছোট নদীগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর। দেশীয় মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবী নদীটি জমি দখল মুক্ত করে খননের ব্যবস্থা করলে জোর দাবী জানান। জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।
সংশিষ্টদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে চকের নদী সম্পূর্ণভাবে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে। তাই নদীটি রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি এলাকাবাসীর। এ নদীর বুক জুড়ে রয়েছে প্রায় পাঁচটি ব্রীজ ও কযেকটি কালভার্ট। যা অধিকাংশই গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগের জন্য নির্মিত নদীটি বিলুপ্তির কারণে পদ্মা নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমে ভরাট হওয়া কৃষি আবাদ করা পানি প্রবাহ কমে যাওয়া অবৈধ দখল,নদীর জমি দখল করে অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ,অবৈধভাবে নদীর জমি দখল করে বসতবাড়ি নির্মান করা, পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক প্রভাবে উজানে পানি কমে যাওয়া (ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব) ফলে ছোট নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে ।
সংরক্ষণে করণীয় নদীর খনন দখলমুক্ত করা প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনঃস্থাপন স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ জনসচেতনতা বৃদ্ধি ।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মাজহারুল ইসলাম জানান, নতুন যোগদান করেছি। নদীটি সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে এখন শুনলাম, জুরুরী ভিত্তিতে পরিদর্শন পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের মাধ্যমে নদীর জমি পুন:রুদ্ধার করে নদীর পুন: জীবন ফিরিয়ে আনা হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবিব বলেন, এ নদীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নদীয় জমি পুন;রুদ্ধার করে খাল খনন প্রকল্পের আওয়াতায় এনে কৃষি কাজ, মাছ চাষ সহ বিভিন্ন ধরনের সুষ্ঠু ও সুন্দর ফিরিয়ে আনতে জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।




