sliderস্থানিয়

দেশীয় ফল গাব আজ বিলুপ্তির পথে

মোঃ আব্দুর রব মনসুর,কাজিপুর প্রতিনিধি: বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা দেশি ফল গাব এখন বিলুপ্তির পথে। বিদেশি ফলের প্রতিযোগিতা, বনভূমি উজাড় ও অযত্নে একসময়ের পরিচিত এই ফলটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

গাব বাংলাদেশের একটি দেশীয় ফল, যার বৈজ্ঞানিক নাম Diospyros malabarica। এটি মূলত জলাভূমি ও আর্দ্র পরিবেশে ভালো জন্মে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও নদী-খালবেষ্টিত এলাকায় একসময় প্রচুর গাবগাছ দেখা যেত। গাছটি আকারে বড় এবং দীর্ঘজীবী। বছরের অধিকাংশ সময় সবুজ পাতায় ভরপুর থাকে এই গাছ। বর্ষাকালে ফল ধরতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তা পরিপক্ব হয়।
স্থানীয়রা বলছেন,বিদেশি ফলের প্রতিযোগিতা,বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমে যাওয়ায়, বনভূমি উজাড়, অযত্ন, পুরনো গাছের বংশবৃদ্ধি না হওয়া, কৃষিজমির সংকোচনের ফলে দেশীয় এই ফলটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম জনপদ থেক।

সরজমিনে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি উজাড়, নতুন গাছের চারা রোপণ বা বংশবৃদ্ধি না হওয়া, মানুষের অবহেলা এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন না থাকায় আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী দেশীয় ফল গাব হারিয়ে যাচ্ছে।গাব ফল বিলুপ্তির প্রধান কারণসমূহবনভূমি উজাড়: অপরিকল্পিত নগরায়ন ও গাছপালা কাটার ফলে গাব গাছের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।বাণিজ্যিক চাষের অভাব: বাজারে এর কোনো বাণিজ্যিক চাহিদা বা বড় পরিসরে উৎপাদন নেই।নতুন চারা রোপণ না করা: মানুষ শখ করেও গাব গাছের চারা রোপণ বা পরিচর্যা করছে না।অযত্ন ও অবহেলা: গাছগুলোর কোনো যত্ন নেওয়া হয় না এবং পুরনো গাছের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।জলবায়ু পরিবর্তন: প্রকৃতির পালাবদল ও জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবেও এই গাছ টিকতে পারছে না। একসময় এখানকার ঝোপঝাড়, বনজঙ্গল, খালপাড় কিংবা বাড়ির আঙিনায় এক সময় সহজেই গাবগাছ দেখা যেত। বর্ষা এলে ডালে ডালে ঝুলে থাকা গোলাকার সবুজ ফল- পাকার পর হলুদাভ বা কালচে রঙ ধারণ করত। শিশু-কিশোররা গাছ থেকে পেড়ে বা নিচে পড়ে থাকা ফল কুড়িয়ে খেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। আধুনিক ফলের বাজারে স্থান হারিয়ে গাব যেন নিঃশব্দে বিদায় নিচ্ছে এখানকার প্রকৃতি থেকে।

গাব শুধু সুস্বাদু ফলই নয়, এর রয়েছে নানা ওষুধি গুণও। লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে গাবের ফল, ছাল ও পাতা ব্যবহার হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মতে, গাবের কাঁচা ফল আমাশয় ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এর ছালে ট্যানিনজাতীয় উপাদান রয়েছে, যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। অনেক এলাকায় গাবের ছালের নির্যাস ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ফলটিতে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। যদিও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে, তবু গ্রামীণ সমাজে গাবের ওষুধি ব্যবহার এখনো প্রচলিত।

গাবগাছের গুরুত্ব শুধু ফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর কাঠ শক্ত ও টেকসই হওয়ায় গ্রামীণ এলাকায় বিভিন্ন আসবাবপত্র ও কৃষিকাজের সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। একসময় গাবগাছের আঠা বিশেষভাবে মূল্যবান ছিল। এই আঠা নৌকার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে ব্যবহৃত হতো। নদীবিধৌত বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে কাঠের নৌকা নির্মাণে গাবের আঠা ছিল অপরিহার্য উপাদান। এছাড়া মাছ ধরার জাল ও দড়ি সংরক্ষণেও গাবের আঠার ব্যবহার ছিল। ফলে গাবগাছ স্থানীয় অর্থনীতি ও ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

মাথাইচাপড় গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘বাজারে কিনে খাওয়ার চেয়ে গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ার আনন্দই ছিল বেশি। আম, কাঁঠাল ও জামের পাশাপাশি গাবও ছিল শিশুদের প্রিয় ফলের তালিকায়। বিশেষ করে বিদ্যালয় ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে গাব কুড়ানোর স্মৃতি আজও অনেকের মনে রয়ে গেছে।

পরিবেশগত দিক থেকেও গাবগাছ গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকারের এই গাছ ছায়া দেয়, পাখিদের আশ্রয়স্থল তৈরি করে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অবদান রাখে। নদী ও খালপাড়ে জন্মানো গাবগাছ মাটির ক্ষয়রোধেও সহায়তা করে। ফলে গাবগাছ হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি ফলের বিলুপ্তি নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া।

দেশীয় ফল সংরক্ষণের আলোচনায় গাবকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গাবের চারা উৎপাদন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে এর অন্তর্ভুক্তি এবং স্কুল পর্যায়ে দেশীয় ফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে এর পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তুলে ধরা দরকার।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button