সৌদি আরব, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় সঙ্কট

সৌদি বাদশাহ সালমান গত ২১ জুন মুহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ (ক্রাউন প্রিন্স) পদে নিয়োগ করেছেন। এখন প্রিন্স মুহাম্মদ হচ্ছেন সৌদি আরবের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রথম ব্যক্তি। সৌদি আরব সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন, তারা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রিন্স মুহাম্মদের ভূমিকা ও তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে অনুমান করেছিলেন। দেশের সংস্কার এবং আধুনিকায়নের ব্যাপারে প্রিন্স মুহাম্মদের মতামত ও বক্তব্য থেকেও কেউ কেউ এটা ধারণা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যে, প্রভাবশালী আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সবচেয়ে মারাত্মক কূটনৈতিক সঙ্কট এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সাথে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তার এই নিয়োগ বিস্ময়কর। সৌদি আরবের নতুন যুবরাজকে যারা অভিনন্দন জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানও রয়েছেন।
টেলিফোনে আলাপ করার সময় ‘দুই নেতা দু’দেশের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং কাতারের সাথে বিরোধের কারণে ওই অঞ্চলে সৃষ্ট উত্তেজনার অবসান ঘটানোর জন্য প্রচেষ্টা জোরদার করতে সম্মত হন। এরদোগান এবং বাদশাহ সালমানের মধ্যকার ফোনালাপের সময় উভয় নেতা আগামী মাসে জার্মানিতে অনুষ্ঠিতব্য জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন।
তুরস্কের পদস্থ কূটনীতিক মেভলুত কাভোসুগ্লু সম্প্রতি সৌদি আরব সফর করেছেন। সেখানে তিনি কাতার সঙ্কট নিয়ে বাদশাহ সালমানের সাথে কথা বলেন। কিন্তু তাদের মধ্যকার বৈঠকের পর কোনো বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। এই সঙ্কটে আংকারা কাতারের প্রতি সমর্থন দিয়েছে এবং এই ছোট্ট দেশটিকে একঘরে করে রাখার অপতৎপরতার সময় দেশটিকে ছেড়ে যাবেন না বলে এরদোগান অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তুরস্ক কাতারে খাদ্য ও ওষুধ পাঠিয়েছে। ২২ জুন তুর্কি মিডিয়ার খবরে বলা হয়, ২৫ জন তুর্কি সৈন্যের একটি কন্টিনজেন্ট দোহার উদ্দেশে যাত্রা করবে। সেখানে তারা ইতোমধ্যে মোতায়েনকৃত ৯০ জন তুর্কি সৈন্যের সাথে যোগ দেবে।
২০১৪ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির অংশ হিসেবে আংকারা কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। তুরস্ক নিজেদের আঞ্চলিক অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে কাতারের সাথে তাদের সম্পর্ক অপরিহার্য বলে মনে করে। কিন্তু উপসাগরীয় অন্যান্য দেশকে অবমূল্যায়ন বা তাদের মর্যাদাহানি করে তুরস্ক এই সমর্থন দিচ্ছে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সঙ্কট সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন।
নতুন যুবরাজ নিয়োগ দেয়ার পর এটা তুর্কি-সৌদি সম্পর্কের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে, সে ব্যাপারে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। রাজপরিবারের নতুন উত্তরাধিকারী নিয়োগ করার পর ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক কেমন হবে, সে ব্যাপারে এত দ্রুত ইঙ্গিত দেয়া কঠিন। তবে নতুন ব্যক্তি মানে, নতুন উন্নয়ন- এ কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। মিসরের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসির নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০১৩ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর রিয়াদ ও তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্ক কিছু দিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু বাদশাহ সালমানের অধীনে সম্পর্ক পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে এবং আবার সম্পর্কোন্নয়ন হয়। কোনো পক্ষই নতুন করে সম্পর্কোন্নয়নের এই ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায় না।
আংকারা উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্ককে একটি পৃথক ইস্যু বলে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। একে অপরের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা প্রভাব ফেলবে না। সঙ্কটের শুরু থেকে আংকারা একটি নিয়ন্ত্রিত নীতিতে আস্থা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য মধ্যস্থতা করছে। আঞ্চলিক গোষ্ঠীতন্ত্রের মধ্যে এবং সঙ্কটের কোনো সমাধান বেরিয়ে না আসার মতো পরিস্থিতিতে পক্ষাবলম্বন করে কোনো ফায়দা হাসিল করা যায় না।
ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) বর্তমান চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকার কারণে তুরস্ক এই সঙ্কটের একটি সমাধানের প্রস্তাব দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকে সংলাপে নিয়োজিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে তুরস্ক নিজে নিরপেক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সঙ্কটের ব্যাপারে সর্বব্যাপী সংলাপের চ্যানেল খুলে দেয়া। কোনো দেশের স্বার্থেই সঙ্কট বৃদ্ধি করা উচিত হবে না। কারণ এতে কেবল তিক্ততা ও আঞ্চলিক অশান্তিই সৃষ্টি হবে।
লেখক : তুর্কি রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক নিয়ে লিখে থাকেন।
আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার। সুত্র : নয়া দিগন্ত



