sliderস্থানিয়

শতাধিক বছর যাবত পদ্মার ভাঙ্গন অব্যাহত, অচিরেই গোট উপজেলাই একাকার হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা

শফিকুল ইসলাম,চাপাইনবয়াবগঞ্জ: যেখানে নদী আছে, সেখানেই ভাঙ্গন আছে। আছে মানুষের দূর্ভোগ, হতাশা কষ্ট। পদ্মা নদীও তার ব্যতিক্রম নয়। পদ্মা নদী ভারতের গঙ্গা নদী থেকে এর উৎপত্তি। যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সর্বপশ্চিমের মনাকষা ইউনিয়নের শেষ সীমানা দিয়ে গঙ্গা নদী পদ্মা নদী নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পদ্মা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার ও প্রস্থ প্রায় ৯.৬০কিলোমিটার। শিবগঞ্জ উপজেলা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীর পূর্ব তীর ভাঙ্গনের কারণে সরে যাচ্ছে। তবে সময়ের ব্যবধানে প্রস্থ কম বেশী হতে পারে।

তথ্য অনুযায়ী স্বাধীনতা উত্তরকালে প্রতিবছর প্রায় ভাঙ্গনের কবলে পড়ে প্রায় ২৭৩ মিটার করে নদী সরে যাচ্ছে। তবে প্রকৃতপক্ষে আরো বেশী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।চাঁপাইনবাবগঞ্জে কখন থেকে নদী ভাঙ্গন শুরু হয়েছে তা সঠিক ভাবে বলা মুশকিল। তবে তথ্য মতে ১৯১৮ সালে সর্বপ্রথম তৎকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাকমার নারায়নপুর ইউনিয়নে ভাঙ্গন শুরু হয় এবং তখন থেকে নদী তীরবর্তী মানুষগুলো বাড়ি ঘর ভেঙ্গে অন্যত্রে সরতেই আছে। তার পর ১৯৬৫ সালের দিকে মনাকষা ইউনিয়নের রাঘববাটি গ্রাম ও গোপালপুর,রাঘবাটি, রানীনগর সহ কয়েকটি মৌজার হাজার হাজার বিঘা আবাদী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে। ফলে কিছু মানুষ নি:স্ব হয়ে পড়ে। শুরু হয় এ এলাকার হাজার মানুষের দূর্বিসহ হাহাকার জীবনযাপন।
পরে আবার ১৯৭০হতে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত সময়ে আবারো পদ্মা নদীর ভাঙ্গন শুরু হলে রানীনগর,সিংনগর, হাঙ্গামী গ্রামের কয়েকশো পরিবার ভাঙ্গনের কবলে পড়ে বাড়িঘর অন্যত্রে সরিয়ে নেয়। অনেকে দিনাজপুর, চট্রগ্রাম, ভোলাহাট, নাচোল সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং যাযাবার জীবনযাপন করে। এ সময় বিশেষ করে মনাকষা ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ কাজের অভাবে দূর্ভিক্ষের কবলে পড়ে প্রায় ১২/১৩কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে ভারতে গিয়ে সারাদিন শ্রমিকের কাজ করে আবার পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে আসতো। এবাবে দীর্ঘদিন যাবত জীবিকা নির্বাহ করেছে। ১৯৭৩ সালের পর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গন শুরু হয়। যা এখনো বিদ্যামান বিশেষ করে বিগত প্রায় ৬৫ বছর থেকে প্রতিবছরই নদী ভাঙ্গনের কবলে মানুষ নি:স্ব হত্ইে আছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তী আলাতুলি, নারায়নপুর, দেবীনগর, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন ও শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, দূর্লভপুর,পাঁকা ও উজিরপুর ইউনিয়নগুলি সবসময় আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বর্তমানে চলছে নদী ভাঙ্গন। পদ্মানদীতে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়ায় হাজার হাজার মানুষ আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।মাত্র গত এক মাসে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে দুই শতাধিক বাড়ি ও শতাধিক বিঘা আবাদি জমি। গত সপ্তাহেও পাঁকা ইউনিয়েনের গমের চর গ্রামটি গোটাটাই পাঁকা ইউনিয়নের মানচিত্র হতে বিলীন গেলো গেলো। সাম্প্রতিককালে শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর ইউনিয়ন একেবারে শিবগঞ্জের মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। পাঁকা ইউনিয়নের মাত্র দু একটি গ্রাম মানচিত্র থেকে মুছে যেতে বাকী রযেছে। তবে ভীষণঝুুঁকির মধ্যে আছে। দুর্লভপুর ইউনিয়নের আংশিক মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। শিবগঞ্জ উপজেলার দূর্লভপুর,পাঁকা ও উজিরপুর এ তিন ইউনিয়নের প্রায়৫০/৬০ হাজারের মানুষের বসবাস ছিল।

স্থানীয়দের মতে, গত পাঁচ বছরে পদ্মানদীতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ নদীভাঙন হয়েছে। বিলীন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ও ফসলের মাঠ। এর মধ্যে অন্তত ৭”শো” পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তারা অধিকাংশই নাচোল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই শিবগঞ্জ, রানীহাটি, বিনোদপুর, আটরশিয়া ও সদর উপজেলার আমনুরা,বাবুডাইং, সুন্দরপুর সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় এমনকি জেলার বাইরেও বাস করছেন। পদ্মার খরস্রোতে তলিয়ে গেছে দক্ষিণ পাঁকা, তেরো রশিয়া, ডুবাইপাডা, গমের চর, জামাই পাড়া, সরদার পাড়া, হাট পাড়া, মারাঙা পাড়া, হিন্দু পাড়া সহ প্রায় ১৫টি গ্রাম। নদীতে ভেঙে গেছে পাঁকা-নারায়নপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর পাঁকা সরদার পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গমের চর প্রাথমিক বিদ্যালয়, হলদিবোনা হাট, তেলিখাড়ি হাট, গমের চর কবরস্থান, চর পাঁকা ঈদগাহ সহ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, মন্দির প্রভৃতি। এ তিন ইনইউনিয়নের বিলীন হওয়া আবাদি জমি পরিমাণ দুই হাজার হেক্টর। ৫ বছরের অত্র এলাকায় মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩শো কোটি টাকা। বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে প্রায় ৫০টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ৫টি বিজিবি ক্যাম্প, কয়েকটি স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, ৪টি হাট-বাজার, ৩টি কবরস্থান ও কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি।পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর গ্রামের বাসিন্দা মো. একরামুল হক (৬৬) বলেন, “আমার মনে পড়তে কমপক্ষে ২০বার ঘরবাড়ি ভেঙেছে পদ্মার ভাঙ্গনে। দুবছর হলো বাড়ি ভেঙেছে। এবার বর্ষার শুরুতেই নদী ভাঙ্গনও শুরু হয়েছে। আবার বাড়িঘর ভেঙতে হলো। এখনো ঘর-দুয়ার ঠিক করতে পারিনি।”একই এলাকার সরদার পাড়া গ্রামের জোবদুল হক (৬০) জানান, “গত বছরই বাড়ি ভেঙে এসেছি। এবার যেভাবে নদীর ভাঙ্গছে তাতে মনে হয় আবার বাড়ি ভাঙতে হবে। কোথায় বাড়ি করবো সে চিন্তায় আছি।”জামাইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুসলেমা বেগম বলেন, “জন্মস্থান উজিরপুর ইউনিয়নে প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন হারিয়ে পাঁকা ইউনিয়নে আশ্রয় নিয়েছিলাম। দীর্ঘদিন ঐ এলাকায় বাস করতে লেগে সবাইকে আপন করে নিয়েছি। কিন্তু নদীরভাঙনে আবার সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হল। এখন রানীহাটি গুচ্ছগ্রামের পাশে একটি বাগানের বাড়ি করে বাস করছি। আশেপাশে আরো প্রায় ২০ পরিবার চর ছেড়ে এসে বাড়ি করেছ।

“হলদিবোনা হাটের সুপরিচিত দোকানদার মো. ইব্রাহিম হোসেন সম্প্রতি বাড়িঘর স্থানান্তর করে নাচোল উপজেলার ভোলা মোড়ে নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন,” চরে বাড়ি করার মতো জায়গা নাই। কি করবো? আর কতোবার বাড়ি ভাঙব? নিরুপায় হয়ে এলাকা ছড়তে হল।”স্থানীয় বাসিন্দা কবির হোসেন জানান, “বিগত পাঁচ বছরে কয়েকবার ভরপুর বর্ষায় নদীভাঙন মুহুর্তে অস্থায়ী জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হয়েছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে কিন্তু এলাকাবাসীর কোন উপকার হয়নি। আমাদের বহুদিনে প্রত্যাশা নদীভাঙ্গন প্রতিরোধ করা হোক স্থায়ীভাবে।”

সরেজমিনে জানা গেছে, এ অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারই অন্তত ২০ থেকে ২৫ বার নদীভাঙনে বসতভিটে হারিয়েছেন। গত ৫০ বছরে কয়েক হাজার পরিবার জন্ম স্থানের ঠিকানা ছেড়ে বরেন্দ্র অঞ্চল, ভিন্ন জেলা ও উপজেলায় চলে গেছেন। উজিরপুর ইউনিয়ন গত ১০ বছর আগে পুরোপুরি নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। ঐ ইউনিয়নের বাসিন্দারা বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘরবাড়ি করে বসবাস করছে।অন্যদিকে ভারতের গঙ্গা নদী বাংলাদেশের দুর্লভপুর ইউনিয়নের যে স্থানে পদ্মা নাম ধারণ করেছে সেই মোহনা স্থল থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ। ভারি বর্ষায় যখন পাহাড়ি ঢল নেমে আসে তখন ফারাক্কা বাঁধের শতাধিক গেট খুলে দেয়া হয়। তখন পদ্মা আরো বেশি খরস্রোতা হয়ে উঠে। শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। তবে বিগত কয়েকবছরে নদীভাঙনের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে। অতিরিক্ত বর্ষা ও বন্যা ছাড়াও আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত নদীভাঙন অনবরত চলছে। ফলে এলাকাবাসী আতঙ্কিত। আশ্চর্যের বিষয় হলো দীর্ঘকাল যাবত নদী ভাঙ্গন চললে ভাঙ্গন কবলিত জনগনের সুবিধার্থে এ পর্যণÍ কোন পরিকল্পণা গ্রহন করা হয়নি বললেই চলে। নেই কোন আশ্রয় কেন্দ্র, নেই কোন পূর্ণবাসনের ব্যবস্থা, এখনো হয়নি বাস্তবায়ন স্থায়ী বাঁধের। নেই কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা। নেই কোন উপযুক্ত ত্রানের। ভাঙ্গনের সময় শুধু কিছু জিও ব্যাগ ফেলে জনগণকে শান্তনা দেয়া হয়। ভরা বন্যার সময় উপজেলা ও জেলা প্রশাসন স্পিরিট বোর্ডে চড়ে এলাকা পরিদর্শন করেন ও সামান্য কিছু শুকনা খাবার বিতরণ করেন। যা অসহায় পরিবারগুলোর জন্য নানা হয়রানীর পথ প্রশস্ত হয়। স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে শুনা যাচ্ছে যে পদ্মা নদীর ভাঙ্গন রোধে বাম তীর সংরক্ষনে স্থায়ী বাঁধ নির্মান করা হবে। অনেকবা পরিকল্পণা করা হয়েছে । কিন্তু এখন পর্যন্ত বাস্তাবায়নের মুখ দেখেনি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সরকারের এমপি ও মন্ত্রীরা একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়নে মুখ দেখেনি। এভাবে নির্বিঘেœ নদী ভাঙ্গণ অব্যহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিবগঞ্জ উপজলা গোটাটাই ভাঙ্গনের কবলে একাকার হয়ে যাওয়ার সম্ভবনাকে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। স্থানীয়দের ও পর্যবেক্ষকদের অভিমত হলো জরুরী ভিত্তিতে ভাঙ্গন রোধে মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ নির্মান,আশ্রয়ন হীনদের পূর্ণবাসন,ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রকাশ,আশ্রয়ন কেন্দ্র নির্মান, নৌযান এ্যাম্বুলেন্স চালূ করা,ভ্রাম্যমান স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপণ সহ নানাবিদ পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়ে ভাঙ্গন এলাকার মানুষের দূর্ভোগ কিছুটা হলে লাঘব হতে পারে।

চাঁপাইনবাবঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছেন যে খুব শীঘ্রই পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণে প্রায় সাড়ে কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫কিলোমিটার দীর্ঘ স্থায়ী বাঁধ নির্মানের কাজ শুরু করে ভাঙ্গন রোধ করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button