sliderস্থানিয়

রাঙামাটি রাজবন বিহারের কঠিন চীবর দানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার প্রস্তুতি

কামরুল ইসলাম, রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি: পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ও পুণ্যময় ধর্মীয় উৎসব, ৪৯তম শুভ দানোত্তম কঠিন চীবর দান। রাঙ্গামাটি রাজবন বিহারে এই ঐতিহাসিক উৎসবকে ঘিরে এখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে লাখো পুণ্যার্থীর আগমনে মুখরিত হওয়া এই আয়োজনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বুধবার (২২ অক্টোবর) জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত হলো এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই সভায় কঠোর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে কঠিন চীবর দান উদযাপনের লক্ষ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

নিরাপত্তাই মূল লক্ষ্য: পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে সভা
​সভায় সভাপতিত্ব করেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সম্মানিত পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন মহোদয়। এই সময় তিনি রাজবন বিহারে আগত লাখো মানুষের নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।

জানা যায়, কঠিন চীবর দান চলাকালে বিহার প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশের এলাকায় জননিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা পুলিশ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যাতে কোনো ধরনের জনভোগান্তি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও সভায় বিশেষ নজর দেওয়া হয়। মূলত, বিশাখা প্রবর্তিত নিয়মে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চীবর সেলাই ও বুনন এবং তা উৎসর্গ করার পবিত্র প্রক্রিয়া যেন কোনো প্রকার বিঘ্ন ছাড়াই সম্পন্ন হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
​সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) জনাব মো. ইকবাল হোসাইন, পিপিএম। তিনি বলেন, ‘কঠিন চীবর দান শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর এক অনন্য প্রতীক। এই উৎসবের ঐতিহ্য ও ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে পুলিশ বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

​নিরাপত্তা বিষয়ক এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. জসীম উদ্দীন চৌধুরী, পিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপ্তাই সার্কেল) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে (সদর সার্কেল) মো. জাহেদুল ইসলাম, পিপিএম-সেবা, এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার অন্যান্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ।

সূত্রমতে, সভায় কঠিন চীবর দান উৎসবের দুই দিনের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন হবে, কোথায় কোথায় চেকপোস্ট বসানো হবে এবং আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কী প্রস্তুতি রাখা হবে সেসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

​উল্লেখ্য, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় গেরুয়া কাপড় বা ‘চীবর’ দান করাই হলো কঠিন চীবর দান। প্রাচীন রীতি অনুসারে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলা থেকে সুতা কেটে, সেই সুতায় কাপড় বুনে চীবর তৈরি করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দান করা হয় বলেই এই দানকে ‘কঠিন’ বলা হয়।

১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটির লংগদুতে পরিনির্বাপিত সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) এই রীতিতে চীবর দান প্রবর্তন করেন। সেই থেকে প্রতি বছর এই পুণ্যময় দিনে হাজারো পুণ্যার্থীর সমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজবন বিহার প্রাঙ্গণ। এবার ৪৯তম আসরেও লক্ষাধিক মানুষের মিলনমেলা ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পুলিশ প্রশাসনের সময়োপযোগী এই সমন্বিত প্রস্তুতিই আভাস দিচ্ছে যে, পাহাড়ের এই সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব এবারও অনুষ্ঠিত হবে শান্তিময় ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে, যা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতির বার্তাকে আরও একবার বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button