sliderস্থানিয়

রাখীপূর্ণিমা

স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোর: রাখী পূর্ণিমা, যা রাখি বন্ধন নামেও পরিচিত, একটি হিন্দু ধর্মীয় উৎসব যা ভাই ও বোনের মধ্যে ভালবাসা ও শ্রদ্ধার বন্ধনকে উদযাপন করে। এই দিনে, বোনেরা তাদের ভাইদের কব্জিতে রাখি (একটি পবিত্র সুতো বা তাবিজ) বেঁধে দেয়, যা তাদের মধ্যেকার সুরক্ষা ও স্নেহের প্রতীক। ভাই তার বোনকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং উপহার দেয়। এই উৎসবটি মূলত শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয়।

প্রতি বছর শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথিতে রাখি বন্ধন পালিত হয়। সেই কারণে শ্রাবণী পূর্ণিমাকে রাখি পূর্ণিমাও বলা হয়ে থাকে।

হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথিতেই রাখী পূর্ণিমা পালিত হয়। এ বছর (২০২৬ সালে) পূর্ণিমা তিথি এবং ভদ্রাকালের কারণে প্রধান উৎসব পালিত হচ্ছে ২৮ আগস্ট, শুক্রবার।পূর্ণিমা তিথি শুরুঃ২৭ আগস্ট, ২০২৬ (সকাল ৯:০৮ মিনিট)।পূর্ণিমা তিথি সমাপ্তিঃ ২৮ আগস্ট, ২০২৬ (সকাল ৯:৪৮ মিনিট)

২৭ আগস্ট সকাল থেকে শুরু হয়ে ২৮ আগস্ট সূর্যোদয়ের আগেই শেষ হয়ে যায় রাখী বাঁধার সেরা শুভ মুহূর্তঃ ২৮ আগস্ট, সকাল ৫:৫৭ মিনিট থেকে সকাল ৯:৪৮ মিনিট পর্যন্ত

শাস্ত্র মতে, ভদ্রা কালে কোনো শুভ কাজ করা নিষেধ। ২৭ আগস্ট সারাদিন ভদ্রার ছায়া থাকায় শুভ কাজের জন্য ২৮ আগস্টের সূর্যোদয়-পরবর্তী সকালের সময়টুকুই রাখী বাঁধার জন্য সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও উপযুক্ত সময়।

সাধারণ মানুষের মনে ধারণা থাকে রাখী পূর্ণিমা মানেই শ্রাবণ মাস। কিন্তু ইংরেজি পঞ্জিকার আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে অনেক সময় বঙ্গাব্দ (বাংলা ক্যালেন্ডার) ও সৌর পঞ্জিকার মাস পরিবর্তিত হয়ে যায়।

চন্দ্র ও সৌর মাসের পার্থক্য: হিন্দু শাস্ত্রে তিথি নির্ধারিত হয় ‘চন্দ্র মাস’ (লুনার পঞ্জিকা) অনুযায়ী, যা পূর্ণিমা দিয়ে চিহ্নিত হয়। কিন্তু বঙ্গাব্দ বা সৌর পঞ্জিকায় মাস নির্ধারিত হয় সূর্যের সংক্রান্তি (সংক্রান্তিতে এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন) অনুযায়ী।
শ্রাবণী পূর্ণিমার ভাদ্র প্রবেশ: ২০২৬ সালে সৌর পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাস শেষ হয়ে ভাদ্র মাস ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী শ্রাবণী পূর্ণিমার তিথিটি পড়েছে আগস্টের ২৭-২৮ তারিখে।
নিয়ম অনুযায়ী উৎসব: রাখীবন্ধন উৎসবকে শাস্ত্রে ‘শ্রাবণী’ বা ‘উপকর্ম’ উৎসবও বলা হয়, কারণ এটি শ্রাবণের শেষ তিথিতে (পূর্ণিমায়) ঘটে। সৌর পঞ্জিকা অনুযায়ী ভাদ্র মাস পেড়িয়ে গেলেও তিথিটি যেহেতু চন্দ্র পঞ্জিকার শ্রাবণ মাসের শেষ পূর্ণিমা, তাই এই দিনেই নিয়ম মেনে রাখী পালিত হচ্ছে।
সহজ কথায়, সৌর মাসের হিসাবে ভাদ্র মাস চললেও চন্দ্র তিথি হিসেবে এটি শ্রাবণী পূর্ণিমারই রূপ, তাই ভাদ্র মাসে পড়া সত্ত্বেও এটিই রাখী পূর্ণিমার সঠিক দিন।

রাখী পূর্ণিমা কেন পালন করা হয়, তার কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো:
ভাই-বোনের সম্পর্ক উদযাপন:এই উৎসব ভাই ও বোনের মধ্যেকার ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও স্নেহের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি:রাখি বন্ধন একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এটি হিন্দু সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
সুরক্ষার প্রতীক:রাখি ভাইদের হাতে বাঁধার মাধ্যমে, বোনেরা তাদের সুরক্ষা ও মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করে। বিনিময়ে ভাইরা তাদের বোনদের রক্ষা করার অঙ্গীকার করে।
সামাজিক বন্ধন:
এই উৎসব শুধুমাত্র ভাই-বোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবার মধ্যে পালিত হতে দেখা যায়। এতে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট:
রাখী বন্ধনের উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী প্রচলিত আছে। এই কাহিনীগুলি এই উৎসবের গুরুত্বকে আরও মহিমান্বিত করে।
রামায়ণ অনুযায়ী, ভগবান রাম সমস্ত বানর সেনাদের ফুল দিয়ে রাখি বেঁধে ছিলেন। এছাড়া, লক্ষ্মী বলিকে ভাই হিসেবে মেনে রাখি পরিয়েছিলেন যাতে সে উপহার স্বরূপ বিষ্ণুকে স্বর্গে তার কাছে ফিরে যেতে বলে।
অন্যদিকে, সুভদ্রা কৃষ্ণের ছোট বোন, কৃষ্ণ সুভদ্রাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তবে আপন বোন না হয়েও দ্রৌপদী ছিলেন কৃষ্ণের অতীব স্নেহভাজন। একদিন সুভদ্রা কিছুটা অভিমান ভরে কৃষ্ণকে প্রশ্ন করেন, এর কারণ কী। উত্তরে কৃষ্ণ জানান, ‘যথা সময়ে এর কারন তুমি বুঝতে ‘এর কিছুদিন পর শ্রীকৃষ্ণের হাত কেটে রক্ত ঝরছিল, তা দেখে সুভদ্রা রক্ত বন্ধ করার জন্য কাপড় খুঁজছিলেন, কিন্তু কোথাও কোনও পাতলা সাধারণ কাপড় পাচ্ছিলেন না, এর মাঝে দ্রৌপদী সেখানে এসে দেখেন কৃষ্ণের হাত থেকে গলগ করে রক্ত পড়ছে। সেই ঘটনা দেখামাত্রই বিন্দুমাত্র দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুল্যবান রেশম শাড়ি ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাত বেধে দেন, কিছুক্ষণ পর রক্তপাত বন্ধ হয়। তখন শ্রীকৃষ্ণ বোন সুভদ্রাকে ডেকে বলেন-‘এখন বুঝতে পেরেছ কেন আমি দ্রৌপদীকে এত স্নেহ করি?’ সুভদ্রা তখন বুঝত পারলেন, ভক্তি ও পবিত্র ভালবাসা, শ্রদ্ধা কী জিনিস! দাদা কৃষ্ণের চেয়ে মুল্যবান বস্ত্র নিজের কাছে বেশি প্রিয়, এটা ভেবে সুভদ্রা দারুণ লজ্জিত হয়ে পড়েন। কোন বোন তার ভাইয়ের কোনও রকম কষ্ট, অমঙ্গল সহ্য করতে পারে না। ভাইয়ের কষ্ট দুর করার জন্য সে সর্বত্তম চেষ্টা করে। অন্যদিকে ভাই ও তার বোনকে পৃথিবীতে সর্বাধিক স্নেহ করে, সারাজীবন তাঁকে রক্ষা করে থাকে, যে রকম শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীকে রাজসভায় চরম কলঙ্ক থেকে রক্ষা করেছিলেন। তাই, এই পবিত্র বন্ধনের দিনে, সকল ভাই-বোনের উচিত এরকম ভক্তিভাব ও ভালবাসা বজায় রাখা। কৃত্রিমতা, যান্ত্রিকতার এই বর্তমান যুগে ভাই-বোনের মাঝে ভালবাসা ও শ্রদ্ধার বড় অভাব। সনাতন ধর্মে বড় বোন বা দিদিকে মাতৃস্থানীয় এবং বড় ভাইকে পিতৃস্থানীয় সম্মান ও ভালবাসা দেওয়ার কথা বলা আছে।

রাখীবন্ধনের দিন গণেশের বোন গণেশের হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। এতে গণেশের দুই ছেলে শুভ ও লাভের হিংসে হয়। তাদের কোনও বোন ছিল না। তারা বাবার কাছে একটা বোনের বায়না ধরে। গণেশ তখন তাঁর দুই ছেলের সন্তোষ বিধানের জন্য দিব্য আগুন থেকে একটি কন্যার জন্ম দেন। এই দেবী হলেন গণেশের মেয়ে সন্তোষী মা। সন্তোষী মা শুভ ও লাভের হাতে রাখি বেঁধে দেন।
অন্য একটি কাহিনি রয়েছে, দৈত্যরাজা বলি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। বিষ্ণু বৈকুণ্ঠ ছেড়ে বালির রাজ্য রক্ষা করতে চলে এসেছিলেন। বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button