
রতন রায়হান, রংপুর: বিভাগীয় শহর রংপুর দ্রুত নগরায়ণের পথে এগিয়ে চললেও নগর ব্যবস্থাপনার একটি পুরোনো সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সেটি হলো বৈদ্যুতিক,ইন্টারনেট, টেলিফোন ও ক্যাবল টিভির ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল। নগরীর প্রধান সড়ক, ফুটপাত, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিস, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে খুঁটির পর খুঁটি জুড়ে ঝুলছে অসংখ্য তার। কোথাও সেগুলো জট বেঁধে বিশাল ঝাঁকের মতো ঝুলছে, কোথাও আবার ছিঁড়ে নেমে এসেছে মানুষের মাথার সমান উচ্চতায়। ফলে প্রতিদিন হাজারো পথচারী, যানবাহন চালক ও সাধারণ মানুষকে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।নগরবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র দেখা গেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে কিছু তার অপসারণ করা হলেও কয়েকদিন পরই আবার নতুন করে ঝুলতে দেখা যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংযোগ লাইন। ফলে নগরীর সৌন্দর্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির আশঙ্কা।
নগরজুড়ে একই চিত্র
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সিও বাজার, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মেডিকেল মোড়, কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকা, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, মাছের বাজার, তাজহাট, মডার্ন মোড়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, মাহিগঞ্জ, সাতমাথা, কামাল কাছনা, রোকেয়া কলেজ, লালবাগ, জাহাজ কোম্পানি মোড়, শাপলা চত্বর, রংপুর রেলওয়ে স্টেশন, প্রেসক্লাব,পায়রা চত্বর, টাউন হল, কাচারি বাজার, আদালত চত্বর, ডিসি মোড়, ব্যাংকের মোড়সহ প্রায় পুরো মহানগর এলাকাজুড়ে একই অবস্থা বিরাজ করছে। অনেক স্থানে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে একাধিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ক্যাবল অপারেটর ও টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের তার এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে মূল বিদ্যুৎ লাইন কোনটি আর যোগাযোগ লাইন কোনটি তা বোঝার উপায় নেই। কোনো কোনো স্থানে পুরোনো অচল তার অপসারণ না করে নতুন তার সংযুক্ত করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফুটপাতের ওপর নেমে আসা তারের কারণে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে মাথা নিচু করে বা হাত দিয়ে তার সরিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে পথচারীদের।
বর্ষায় বাড়ে আতঙ্ক
নগরবাসীর মতে, বর্ষা মৌসুম এলেই ঝুলন্ত তারের সমস্যা নতুন মাত্রা পায়। প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসে তার ছিঁড়ে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। পানি জমে থাকা এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ভয়ও বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জট পাকানো ও অপরিকল্পিত তারের সংযোগ শর্ট সার্কিটের অন্যতম কারণ। এসব সংযোগে ত্রুটি দেখা দিলে মুহূর্তেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ঝুঁকি আরও বেশি।
সৌন্দর্য হারাচ্ছে বিভাগীয় শহর
এক সময় পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে পরিচিত রংপুরের সৌন্দর্য আজ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে ঝুলন্ত তারের জঞ্জালে। সড়কের দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা, সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, আধুনিক স্থাপনা ও বিলবোর্ড—সবকিছুই যেন তারের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, একটি আধুনিক শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সুসংগঠিত ইউটিলিটি অবকাঠামো। উন্নত দেশগুলোতে বহু আগেই বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের তার মাটির নিচে নেওয়া হয়েছে। অথচ রংপুরের মতো বিভাগীয় শহরে এখনও আকাশজুড়ে ঝুলে থাকা তার নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে।
কী বলছে আইন?
সংশ্লিষ্ট আইন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অবৈধ ঝুলন্ত তার অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি রয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী জনউপদ্রব সৃষ্টি, নগরীর সৌন্দর্যহানি এবং অনুমতি ছাড়া অবকাঠামো ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে সিটি কর্পোরেশন। আইনের ৮২ ও ৮৪ ধারায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, জরিমানা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী বিদ্যুতের খুঁটি বা অবকাঠামো অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। একইভাবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ এবং কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬ অনুযায়ীও অনিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদনহীন সংযোগ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
রসিকের বক্তব্য
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান বলেন, “নগরীর সৌন্দর্য রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিটি কর্পোরেশন বদ্ধপরিকর। ঝুলন্ত তার অপসারণে ইতোমধ্যে একাধিকবার মোবাইল কোর্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ক্যাবল অপারেটরদের নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা নির্দেশনা মেনে কাজ করলেও কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ম অমান্য করছে। তিনি আরও বলেন, আমরা শুধু তার অপসারণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছি। নগরীতে ধাপে ধাপে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
নেসকোর বক্তব্য
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর কার্যালয়, রংপুর বিভাগ নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম মন্ডল বলেন, “বিদ্যুতের খুঁটিতে অনুমতি ছাড়া তার সংযোগ দেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিদ্যুতের অবকাঠামো নিরাপদ রাখা আমাদের দায়িত্ব। তাই অবৈধ সংযোগ শনাক্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবং সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্বেগ
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা জানান, নগর এলাকায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের একটি বড় অংশের পেছনে রয়েছে বৈদ্যুতিক ত্রুটি ও শর্ট সার্কিট। অপরিকল্পিতভাবে ঝুলে থাকা তারের জট আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তারা বলেন, ঝুলন্ত তারের সমস্যা শুধু সৌন্দর্যহানির বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তার বিষয়। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
বিটিআরসি ও আইএসপি সংশ্লিষ্টদের মতামত
টেলিযোগাযোগ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশের নীতিমালায় পর্যায়ক্রমে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ব্যয় এবং সমন্বয় ঘাটতির কারণে অনেক জায়গায় এখনও ঝুলন্ত তার ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের মতে, একটি একক ডাক্টিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে একই অবকাঠামো ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেবা দিতে পারবে এবং নগরীর সৌন্দর্যও বজায় থাকবে।
নাগরিকদের প্রশ্ন—স্থায়ী সমাধান কবে?
নগরবাসীর প্রশ্ন, যখন আইন রয়েছে, অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা রয়েছে এবং ঝুঁকির বিষয়টি সবার জানা, তখন বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যা কেন থেকে যাচ্ছে? সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, শুধু মাঝে মধ্যে তার কেটে ফেলা বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। বিদ্যুৎ বিভাগ, রংপুর সিটি কর্পোরেশন, নেসকো, বিটিআরসি, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং ক্যাবল অপারেটরদের সমন্বয়ে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। তাদের মতে, রংপুরকে একটি আধুনিক, নিরাপদ ও নান্দনিক বিভাগীয় শহরে পরিণত করতে হলে আকাশজুড়ে ঝুলে থাকা এই বিশৃঙ্খল তারের জাল অপসারণের বিকল্প নেই।নগরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যাতে রংপুরের আকাশ থেকে ‘তারের জঙ্গল’ সরিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগর পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।




