
মো. নজরুল ইসলাম,মানিকগঞ্জ: “থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগতটাকে— কিসের নেশায় ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।”
এই চিরন্তন ভ্রমণস্পৃহাকে ধারণ করেই ১৭ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মানিকগঞ্জ শহরের বেউথা এলাকার আরব ভবন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী, পরিব্রাজক, লেখক ও চিকিৎসক “ডা. বাবর আলী” কে সংবর্ধনা, শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান এবং তাঁর অভিযাত্রার গল্প নিয়ে এক প্রাণবন্ত আড্ডা।
মানিকগঞ্জের ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতিপ্রেমী মো. আজহার উদ্দিন-এর উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে ডা.বাবর আলী তাঁর দীর্ঘ অভিযাত্রার অভিজ্ঞতা,পাহাড় জয়ের চ্যালেঞ্জ,মানসিক দৃঢ়তা, প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং তরুণদের স্বপ্নপূরণের নানা দিক তুলে ধরেন। তাঁর অনুপ্রেরণামূলকr বক্তব্য উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে।
আলোচনা শেষে প্রশ্নোত্তর ও উন্মুক্ত মতবিনিময় পর্বে অংশগ্রহণ করেন অ্যাডভোকেট দীপক কুমার ঘোষ, অহিদুর রহমান, আবু মো.নাহিদ, বিমল চন্দ্র রায়, সাংবাদিক গাজী ওয়াজেদ আলম লাবু,মো. আফজাল হোসেন, সহ উপস্থিত ভ্রমণপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মানিকগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে ডা. বাবর আলীর হাতে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
ডা. বাবর আলী বাংলাদেশের অন্যতম কৃতী পর্বতারোহী। তিনি বিশ্বের ৮,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বতের মধ্যে ৫টি সফলভাবে আরোহণ করেছেন। ২০২৪ সালের ১৯ মে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে তিনি পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮.৮৬ মিটার) জয় করেন এবং ষষ্ঠ বাংলাদেশি হিসেবে এই গৌরব অর্জন করেন।
এর আগে ২০২২ সালে তিনি আমা দাবলাম (Ama Dablam) শৃঙ্গ জয় করে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইতিহাস গড়েন। যদিও শৃঙ্গটির উচ্চতা ৬,৮১২ মিটার, তবুও এটি বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর ও কঠিন পর্বতারোহণের জন্য সুপরিচিত।
পর্বতারোহণের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডেও ডা. বাবর আলীর অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে একবার ব্যবহারযোগ্য (Single-use) প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে তিনি দেশের ৬৪টি জেলা পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করেন। মাত্র ৬৪ দিনে তিনি ২,৭০১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন।
সাইকেল ভ্রমণেও তাঁর রয়েছে অসাধারণ সাফল্য। তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, হালুয়াঘাট থেকে কুয়াকাটা, সুন্দরবন, ভোমরা ও তামাবিল পর্যন্ত সাইকেলে ভ্রমণ করেছেন। এছাড়া ভারতের উত্তর প্রান্ত কাশ্মীর থেকে দক্ষিণ প্রান্ত কন্যাকুমারী পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দুর্গম পথ সাইকেলে অতিক্রম করেছেন।
অভিযাত্রার অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন ‘পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা’, ‘ম্যালরি ও এভারেস্ট’ এবং ‘সাইকেলের সওয়ারি’ গ্রন্থে। দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথচলার ক্লান্তিকে উপেক্ষা করেও প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা তিনি নিয়মিত লিখে গেছেন, যা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক অনন্য দলিল।
অনুষ্ঠিতে বক্তারা বলেন, ডা. বাবর আলীর জীবনসংগ্রাম, অধ্যবসায়, সাহস এবং প্রকৃতিপ্রেম বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করার প্রেরণা জোগাবে।




