
নোয়াখালী প্রতিনিধি: নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিসে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ভুয়া কাগজপত্রে বয়স বাড়িয়ে বাইরের জেলার নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নাজমুল ও তামান্না আক্তার।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বয়স বৃদ্ধি, ভিন্ন জেলার বাসিন্দা হয়ে অন্যত্র ভোটার হওয়া কিংবা ভুয়া এনআইডি তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দণ্ডবিধির ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় জালিয়াতি ও ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন অথবা সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বেগমগঞ্জ নির্বাচন অফিস এখন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এখানে নতুন ভোটার হওয়া, এনআইডি সংশোধন, ভোটার স্থানান্তরসহ প্রায় প্রতিটি সেবার ক্ষেত্রেই ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। টাকা না দিলে সাধারণ মানুষকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।
ইতোমধ্যে অফিসের পিয়ন শহিদের বিরুদ্ধে এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নেওয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যা জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে এনে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করে বেগমগঞ্জে ভোটার করা হচ্ছে। প্রতিটি এনআইডির জন্য ৩০ হাজার টাকা বা তার বেশি ঘুষ নেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী শিহাব হোসেন জানান, তিনি ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন সংগ্রহ করে বেগমগঞ্জে ভোটার হয়েছেন। এ জন্য তিনি অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নাজমুল ও তামান্না আক্তারকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
একইভাবে মোস্তাকির রহমান নিশাতও একই প্রক্রিয়ায় ঘুষ দিয়ে ভোটার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এছাড়া শেখ মোহাম্মদ রাব্বিসহ আরও অনেকে একই কৌশলে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ভোটার হয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ জন ব্যক্তিকে এভাবে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলা থেকে এনে বেগমগঞ্জে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঘুষের বিনিময়ে এনআইডি করে দেয় নাজমুল-তামান্না আক্তার সিন্ডিকেট।
ভুক্তভোগীরা জানান, সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রথমে দর কষাকষির মাধ্যমে ঘুষের পরিমাণ নির্ধারণ করে। পরে সেই টাকা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রক নাজমুল ও তামান্না আক্তারের কাছে জমা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা নির্বাচন অফিসের এক কর্মচারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও চাঁদপুর জেলার বাসিন্দারাও বেগমগঞ্জে ভোটার হচ্ছেন এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হচ্ছে।
তবে অভিযুক্ত ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নাজমুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন এবং বাইরের জেলার লোকজনকে ভোটার করতে সহযোগিতা করেননি।
এদিকে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান বলেন, তার এলাকার অনেক নাগরিক কাগজপত্রের ত্রুটির কারণে সেখানে এনআইডি করতে না পেরে ভুয়া তথ্য দিয়ে বেগমগঞ্জে ভোটার হচ্ছেন। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ বলেন, কিছু ভোটারের পিতা-মাতার ঠিকানা বেগমগঞ্জ দেখিয়ে ভোটার করা হয়েছে, আবার অনেকে অন্য জেলার হয়েও এখানে ভোটার হয়েছেন। তবে এটি কীভাবে হয়েছে তা তিনি নিশ্চিত নন।
ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি। তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




