মো:আলাউদ্দীন মন্ডল,রাজশাহী: রাজশাহীর মোহনপুরে কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের দোকানঘর বরাদ্দ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ, নৈশআঁধারে দোকান দখল-চুরি এবং বিচার চাইতে গিয়ে থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের হাতে হয়রানির বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে। আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগী ভাড়াটিয়া ব্যবসায়ী মোঃ নজরুল ইসলাম (পিতা—মৃত আবুল হাসেম, গ্রাম—বেলনা, মোহনপুর)।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নজরুল ইসলাম দাবি করেন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় মার্কেটের একাধিক দোকানঘরের বিপরীতে চুক্তিপত্র ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে তিনি মোট ৩১ লাখ টাকা জামানত হিসেবে দেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক মন্দার কারণে গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে জামানতের টাকা ফেরত চেয়ে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের কাছে লিখিত আবেদন জানান। তবে দীর্ঘদিন পার হলেও টাকা ফেরত না দিয়ে নানা চক্রান্ত শুরু করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষকের মৌখিক নির্দেশে মার্কেটের অসমাপ্ত দোকানঘর ও মসজিদের দেয়াল নির্মাণে তিনি নিজ খরচে আরও ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪২০ টাকা ব্যয় করলেও সেই অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার একটি স্ট্যাম্প জোরপূর্বক কেড়ে নেয় প্রধান শিক্ষকের অনুসারী বাহিনী।
ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, তিনি বাবুল নামে এক ব্যক্তির কাছে একটি দোকানঘর সাব-লেট দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম ও বাবুল যোগসাজশ করে জোরপূর্বক দোকানঘরটি দখলের চেষ্টা করেন এবং মালামাল বাইরে ফেলে তা সরিয়ে নেন। এর কিছুদিন পর রাতের আঁধারে দোকানে থাকা কয়েক লাখ টাকার মেশিনারি মালামাল চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া মার্কেটের অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে আন্ডারগ্রাউন্ড দোকানে পানি ঢুকে একাধিক বর্ষা মৌসুমে তাঁর প্রায় ১১ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয় বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের জালিয়াতির বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। তবে প্রধান শিক্ষক পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিলে তাঁর কথায় বিশ্বাস রেখে মামলা আর চালাননি; ফলে আদালত তা খারিজ করে দেয়। মামলা খারিজের পরপরই প্রধান শিক্ষক ওয়াদা ভঙ্গ করেন এবং উল্টো হয়রানি শুরু করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ন্যায্য বিচারের আশায় আমি এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু তারা আমার বিচার না করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে উল্টো আমার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, “আইনি প্রতিকারের আশায় আমি মোহনপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে যাই। কিন্তু মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কোনো আইনি সহায়তা না দিয়ে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। কোনো অপরাধ না করা সত্ত্বেও আমাকে থানায় টানা ৭ ঘণ্টা বেআইনিভাবে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।” চুক্তিপত্রের অনুলিপি চাইতে গেলে তাঁকে প্রকাশ্য মারধর করা হয় দাবি করে তিনি জানান, সেই হামলার ভিডিও ও ছবি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে তাঁর কাছে সংরক্ষিত আছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে নজরুল ইসলাম ৫টি প্রধান দাবি পেশ করেন:
১. জামানতের ৩১ লাখ টাকা এবং সংস্কারকাজে ব্যয়কৃত ৭,৩৬,৪২০ টাকা অবিলম্বে ফেরত প্রদান।
২. নৈশআঁধারে দোকান দখল, চুরি ও মারধরের ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩. থানায় ৭ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগে মোহনপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. আন্ডারগ্রাউন্ড দোকানে পানি প্রবেশ করে ১১ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ প্রদান।
৫. হিসাব নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুলিশি হয়রানি ও জোরপূর্বক দখলচেষ্টা বন্ধে আইনি সুরক্ষা প্রদান।
নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা এবং পাওনা অর্থ উদ্ধারে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
অভিযুক্তের বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, “তিনি দোকান ছেড়ে দিলে আমি জামানত ফেরত দেবো।” এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অন্যান্য অভিযোগগুলো তিনি অস্বীকার করেন। তিনি আরও দাবি করেন, একাধিকবার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে শালিস-বৈঠক করা হলেও নজরুল ইসলাম সেই মীমাংসা মেনে নেননি।