মোঃ আব্দুর রব মনসুর,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা আর অন্ধকারের বুক চিরে যমুনা নদীর বুকে জেগে উঠছে এক চিলতে রূপালী আলো। সেই আলোর রেশ ধরেই সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার যমুনা তীরবর্তী মেঘাই, ঢেকুরিয়া ও বাঐখোলা গ্রামে শুরু হয় এক অন্যরকম উৎসব। এটি কোনো সাধারণ উৎসব নয়, এ যেন যমুনার রূপালী শস্যের এক প্রাণবন্ত মেলা। দীর্ঘ তিন যুগ ধরে, অর্থাৎ প্রায় ৩৬ বছর ধরে এই তিন গ্রামে ঐতিহ্যের সুতোয় বাঁধা পড়েছে যমুনার দেশি মাছের এই অনন্য বাজার।
প্রতিদিন উষালগ্নে যখন প্রকৃতি জেগে ওঠে, তখনই যমুনার বুকে একের পর এক ঢেউ তুলে ঘাটে এসে ভিড়তে থাকে জেলেদের নৌকা। নৌকা থেকে নামানো হয় ঝুড়ি আর ডালাভর্তি টাটকা, জীবন্ত সব মাছ। আর তখনই স্তব্ধতা ভেঙে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। শুরু হয় নিলামদারদের উচ্চকণ্ঠের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের কাঙ্ক্ষিত দরের আকুতি। সকাল ৬টা থেকে ৮টা—মাত্র দুই ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সময়েই যমুনার তীরে রচিত হয় লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যিক মহাকাব্য।
এই ঘাটের মূল আকর্ষণই হলো নদী থেকে সদ্য ধরা পড়া রাসায়নিকমুক্ত টাটকা মাছ। ইলিশের রূপালী ঝিলিক, বোয়ালের রাজকীয় উপস্থিতি, রুই-কাতলার চপলতা, আর চিতল, আইড়, ট্যাংরা, গুলশা, চিংড়ি, বাতাসি, বাঘাইড়, কিংবা কাজলি, শিং, মাগুর, পাঙ্গাশ ও বাইনসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছের সমারোহে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই রূপালী সম্পদের টানে স্থানীয় জেলেদের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পাইকাররা। এখান থেকে সংগৃহীত তাজা মাছের স্বাদ পৌঁছে যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোজনরসিকদের পাতে।
তবে এই অপার সম্ভাবনা ও ঐতিহ্যের সমান্তরালে রয়েছে কিছু ধূসর বাস্তবতার গল্পও। তিন যুগের পুরনো এই বাজারে আজও লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব আর মাছ সংরক্ষণের জন্য কোনো আধুনিক হিমাগার না থাকায় মলিন হয়ে পড়ে জেলেদের মুখের হাসি। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কাদা-পানির দুর্ভোগে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ভোগান্তি রূপ নেয় চরম সংকটে।
যমুনার এই ঐতিহ্যবাহী মাছের বাজারটি শুধু অর্থনীতিকেই সচল রাখেনি, বাঁচিয়ে রেখেছে নদীপাড়ের মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনসংগ্রামকে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটু আধুনিকায়নের ছোঁয়া পেলে কাজীপুরের এই তিন মাছের ঘাট দেশের মৎস্য অর্থনীতিতে আরও বড় ও গৌরবময় অবদান রাখতে পারবে।
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা আর অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে শান্ত যমুনার বুকে একে একে ভিড়তে শুরু করেছে জেলেদের নৌকা। জলতরঙ্গ পেরিয়ে ঘাটে এসে থামছে রূপালী ইলিশ, চিতল, বোয়াল আর দেশীয় নানা প্রজাতির ছোট-বড় মাছের সম্ভার। সঙ্গে সঙ্গেই নিস্তব্ধ নদীপাড় মুখরিত হয়ে উঠছে ক্রেতা-বিক্রেতার চঞ্চল হাঁকডাকে। যমুনা নদীর তীরবর্তী মেঘাই, ঢেকুরিয়া ও বাঐখোলা গ্রামের এই দৃশ্য নতুন নয়; দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে যমুনার ঢেউ আর মানুষের নিরলস পরিশ্রমে টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী এই মাছের বাজার, যা আজ পুরো এলাকার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
নদীতে সুনির্দিষ্ট কোনো মৎস্য আড়ত না থাকায় যমুনার এই মুক্ত পাড়ই হয়ে উঠেছে জেলে ও পাইকারদের মিলনমেলা। প্রতিদিন ভোর হতেই নদীপাড়ের এই অস্থায়ী বাজারগুলোতে রূপ নেয় এক কর্মমুখর উৎসবের। মেঘাই মৎস্য আড়তদার রুবেল আহমেদ জানান, ভোরের আলো ফুটতেই নদীর চর এলাকা থেকে মাছ ভর্তি নৌকা নিয়ে জেলেরা এসে হাজির হন। প্রতিদিন গড়ে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। নিলামের সমাপ্তি ঘটতেই পাইকাররা সেই তরতাজা মাছ নিয়ে ছুটে যান শহরের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারে। সব সীমাবদ্ধতা পেরিয়েও এই যমুনাপাড়ের বাজারে প্রতিদিন লেনদেন হয় লাখ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যমুনা নদীতে মাছের প্রাচুর্য স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রান্তিক জেলেদের জীবিকায় এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। তবে এই প্রাচুর্য ও উৎপাদনকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে সরকারি সহায়তা, উন্নত আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং সঠিক নজরদারি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মৎস্যজীবীরা। তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এখান থেকেই আরও বড় পরিসরে মাছের বাণিজ্যের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
কাজীপুর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান, এ উপজেলায় বর্তমানে ২ হাজার ৬শ’ ৯৩ জন তালিকাভুক্ত জেলে রয়েছেন। যমুনা নদীর বুক থেকে ধরা পড়া দেশি মাছের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন ভোরে এই ঘাটগুলোতেই এসে জড়ো হয়। জেলেরা রাতভর যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাছ ধরেন, তার সুফল মেলে এই ভোরের বাজারে।
যমুনার উত্তাল হাওয়া আর জেলেদের ঘামে ভেজা এই ঐতিহ্যবাহী মৎস্য বাজারটি আজ শুধু জীবিকার উৎসই নয়, বরং কাজীপুরের এক গৌরবময় লোক-ঐতিহ্যের প্রতীক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই রূপালী সম্পদ কাজীপুরের অর্থনীতিকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।