বিস্ময়কর কিশোর রাব্বির সমুদ্র জয়

উত্তাল সমুদ্র। ঢেউয়ের পরে ঢেউ। ভয়ঙ্কর গর্জন। গা শিউরে ওঠে। এমন পানি সাঁতরে পাড়ি দিতে হবে। টেকনাফ পাড়ে দাঁড়িয়েছেন ৪৩ প্রতিযোগী। সাঁতরে পাড়ি দেবেন সবাই। লক্ষ্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ।
১৬ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলা চ্যানেল। ৪৩ প্রতিযোগীর একজন বগুড়ার রাব্বি রহমান। মাত্র ১৩ বছরের কিশোর। এমন খুদে প্রতিযোগীর উপস্থিতি আয়োজকদের চোখ ছানাবড়া করে তোলে। নামতে নিষেধ করা হয়েছে বারবার। নির্ঘাত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কেউ রাজি না। রাব্বির বাবা আলালুর রহমান তিব্বতকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে ছেলেকে না নামানোর জন্য। নাছোড় বান্দা রাব্বি। সমুদ্রের ঢেউ কিংবা গর্জন কোনোটাই তাকে ভয় দেখাতে পারেনি। সবার বাধা উপেক্ষা করে ৪৩ প্রতিযোগীর সঙ্গে সেও নেমে পড়ে সমুদ্রে। ছোট মানুষ রাব্বি। কেউ তাকে পাত্তাই দেয়নি শুরুতে। সবার ভাবনা ছিল কিছুদূর গেলেই রাব্বির সাধ মিটে যাবে। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন। উত্তাল ঢেউকে উপেক্ষা করে ক্রমশ সামনের দিকে এগুতে থাকে এই খুদে সাঁতারু। রেস্কিউ বোটে থাকা দায়িত্বশীলরা তিক্ষ্ণ নজর রেখেছেন রাব্বির দিকে। সময়ের ব্যবধানে সবাই রাব্বির পিছনে পড়ে যায়। মাত্র ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট সময় নিয়ে রাব্বি বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়ে রেকর্ড গড়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সব চেয়ে কম বয়সী সাঁতারু হিসেবে এই চ্যানেল পাড়ি দেয়ার গৌরব এখন রাব্বি হাতে।
২০১৫ সালে যখন রাব্বির বয়স মাত্র ৮ বছর সে সময় তার সাঁতার প্রশিক্ষণ শুরু। বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী মধ্যপাড়ার পুকুরই রাব্বির জীবনের প্রথম সুইমিংপুল। এই পুকুরেই প্রতিদিন সকালে বাবার তত্ত্বাবধানে কয়েক ঘণ্টা কঠোর অনুশীলন চলতে থাকে রাব্বির। একপর্যায়ে ছেলের মাঝে অসাধারণ প্রতিভার সন্ধান পান বাবা তিব্বত। তিনি ছেলের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য চাচাতো ভাই সাঁতার প্রশিক্ষক মাসুদ রানার শরণাপন্ন হন। বগুড়া পৌরপার্কের পুকুরে চাচা মাসুদ রানার কাছে সাঁতারের অনেক কৌশল শেখে রাব্বি। এভাবেই ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করতে থাকে সে। স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একের পর এক সাফল্য পায় রাব্বি। পুলে নামলেই সাফল্য এসে ধরা দেয় তার। অবশেষে ২০১৯ সালে জাতীয় শিশু একাডেমি আয়োজিত জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে স্বর্ণপদক জয় করে রাব্বি। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ তার গলায় সোনার মেডেল পরিয়ে দেন। জীবনে প্রথমবার সোনা জেতার পর নিজেকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে রাব্বি। অবশেষে স্বপ্নপূরণের সুযোগ এসে হাতছানি দেয় রাব্বিকে।
চলতি বছরের ৩০শে নভেম্বর অনুষ্ঠিত ১৫তম বাংলা চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় রাব্বি। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহ্পরীর দ্বীপ জেটি থেকে শুরু হয় ফরচুন বাংলা চ্যানেল সাঁতার-২০২০। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া ৪২ জন সাঁতারুকে পিছনে ফেলে মাত্র ৩ ঘণ্টা ২০ মিনিটে বাংলা চ্যানেল অতিক্রম করে প্রথম হয় রাব্বি। এর আগে এত কম বয়সে আর কোনো সাঁতারু বাংলা চ্যানেল অতিক্রম করতে পারেনি।
আত্মবিশ্বসী রাব্বি: রাব্বিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল এমন উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিতে ভয় লাগেনি তোমার? উত্তরে সে বলেছে, আমি মনেই করিনি যে সমুদ্রে নেমেছি। সব সময় আমার ভাবনা ছিল আমি লক্ষ্যে পৌঁছাবো। বোটে আমার বাবা ছিলেন তিনি আমাকে সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তিনি আমাকে বুঝতেই দেননি যে, আমি বিপদজনক পথ পাড়ি দিচ্ছি। ফলে আমার ভিতরে কোনো ভয় কাজ করেনি। এক সময় যখন দ্বীপ দেখতে পাই তখন আমার কনফিডেন্ট আরো বেড়ে যায়।
রাব্বির কাছে জানতে চাই সমুদ্রে অনেক ভয়ঙ্কর মাছ থাকে, প্রাণী থাকে এসবের সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয়নি? রাব্বির উত্তর ঠিক এ রকম- হ্যাঁ। অনেক জেলিফিস, সামুদ্রিক মাছসহ অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে অনেকবার ধাক্কা লেগেছে। তাদের আঘাতে আমার শরীর জখম হয়েছে। লাল হয়েছে শরীরের বিভিন্ন অংশ। তখন মনে হচ্ছিল ছেড়ে দেই। কিন্তু আমার মনোযোগ, মনোবল অনেক শক্ত ছিল। আমি থামিনি। সামনের দিকে যেতে থাকি। কতোদিন থেকে সাঁতার শেখো? কীভাবে বাংলা চ্যানেল পর্যন্ত পৌঁছালে? জানতে চাইলে রাব্বি জানায়, সে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে সাঁতার শিখছে। তার বাবার কাছেই হাতেখড়ি। বাড়ির পাশে নান্নু-মতির মাদ্রাসার একটি বড় পুকুরই তার প্রশিক্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ফেসবুকের মাধ্যমে রাব্বি বাংলা চ্যানেল সম্পর্কে অবগত হয়। তারপর থেকেই রাব্বির ইচ্ছা হয় এই চ্যানেল পাড়ি দেয়ার।
সেই ইচ্ছাই তাকে শেষ পর্যন্ত জয়ের মালা এনে দেয়। রংপুর বিভাগীয় ক্রীড়া অফিসার, রাব্বির চাচা সাঁতার প্রশিক্ষক মাসুদ রানা এবং তার বাবা আলালুর রহমানের সহযোগিতায় সে পুকুর থেকে সাগর পর্যন্ত যায়।
রাব্বি এখন নবম শ্রেণির ছাত্র। সাঁতার শিখতে গিয়ে তার পড়ালেখার ক্ষতি হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে রাব্বি বলে, আমি সাঁতার এবং পড়ালেখা দু’টোই মনোযোগ দিয়ে করি। এজন্য কোনোটাই কোনোটার উপর প্রভাব ফেলে না। বড় হয়ে অলিম্পিক, সাব-গেমসে অংশ নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে এই কিশোর সাঁতারু। সেই সাথে ইংলিশ চ্যানেল জয়ের স্বপ্নও বুকের ভেতরে যত্ন করে পুষছে। সাঁতারে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে বসানো এবং দেশের পতাকা বিশ্বের আকাশে ওড়ানোর ইচ্ছায় সামনের দিকে এগুচ্ছে রাব্বি।
বাবা আলালুর রহমান জ্ঞান হারিয়েছিলেন: আলালুর রহমান তিব্বত নিজেও একজন সাঁতারু। তার হাতেও উঠেছে অনেক সাফল্যের পুরস্কার। তার প্রশিক্ষণেই বেড়ে উঠেছে ছেলে রাব্বি। তিনি নিজে বাংলা চ্যানেল জয় করতে না পারলেও ছেলের জয়ে তিনি আত্মহারা। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম সমুদ্রে ছেলেকে ছেড়ে দেয়ার পর কেমন লেগেছে? আলালুর রহমান বলেন, সমুদ্রের মাঝামাঝি গিয়ে বিশাল ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে গিয়েছিল রাব্বী। ছেলেকে দেখতে পাইনি প্রায় ১০ মিনিট। এ সময় আমি রেস্কিউ বোটে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞানফিরে ছেলেকে পানির উপরে ভাসতে দেখে খুশিতে দু’চোখের কোণা পানিতে ভিজে যায়। যখন শেষ পর্যন্ত বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিতে পেরেছে আমার ছেলে। আমার কাছে এর চেয়ে আর বড় পাওয়া কিছু নেই। আমার ছেলেকে যদি কেউ সহযোগিতা না করে তারপরও আমার বাড়ি বিক্রি করে হলেও তাকে একদিন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে চেষ্টা করাবো।
আলালুর রহমান এক সময় জাতীয় পর্যায়ের সাঁতারু ছিলেন। জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্চ পদকও জিতেছিলেন। সাঁতারের নেশায় অর্থ উপার্জনের সবকিছু ত্যাগ করে দিনরাত পড়ে থাকতেন সুইমিংপুলে। বগুড়া জেলা সুইমিংপুলের সাঁতার প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বেশ কিছুদিন। এরপর সুইমিংপুল বন্ধ হয়ে গেলে বেকার হয়ে পড়েন তিনি। দুই মেয়ে, এক ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে স্থানীয় একটি বাস কাউন্টারে চাকরি নেন। পাশাপাশি দিনের শুরুতে বাড়ির পাশে একটি মাদ্রাসার পুকুরে এলাকার ছেলেদের সাঁতার শেখান।
রাব্বির সাফল্যের মূল্যায়ন করা হয়নি: রেকর্ড সৃষ্টিকারী এই বিস্ময়কর কিশোরের এই সাফল্যে এখন পর্যন্ত সেভাবে কেউ এগিয়ে আসেনি। মিডিয়াও তাকে নিয়ে নীরব। কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ভয়েস অফ আমেরিকা এই কিশোরকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করে। তারপর থেকে তাকে নিয়ে ফেসবুকে আলোচনায় আসে। সর্বপ্রথম তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন একটি বাস কাউন্টারের কর্মকর্তারা। সমুদ্র বিজয় শেষে টিআর পরিবহনের বাসে রাব্বি বগুড়ায় নামে। তখন সেই টিআর’র ম্যানেজার তানসেন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন। এরপর ভয়েস অফ আমেরিকায় প্রতিবেদন প্রচারের পর বগুড়ার ফোর আর আধুনিক হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. রেজাউল করিম ঘরোয়া পরিবেশে রাব্বি এবং তার বাবাকে সংবর্ধনা দেন। এ সময় তার পরিবারের আজীবন ফ্রি চিকিৎসার করানোর ঘোষণা দেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।
এরপর রাব্বির এই সাফল্যের খবর বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক গোলাম মো. সিরাজের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি রাব্বি রহমানকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। এ সময় এমপি সিরাজ তার পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত গোলাম রব্বানী ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সাঁতারু রাব্বির সারা জীবনের পড়াশোনার ব্যয় বহনের ঘোষণা দেন এবং রাব্বীর হাতে পড়াশোনার মাসিক খরচের টাকা তুলে দিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এ ছাড়া এমপি সিরাজ রাব্বির বিনা ভাড়ায় গাড়ি যাতায়াতের ঘোষণা দেন। এ সময় তারেক রহমানের শুভেচ্ছা বার্তা রাব্বিকে পৌঁছে দেয়া হয়।
এছাড়া রাব্বির এই জয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থা, সামাজিক সংগঠন অথবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া দূরের কথা একটু খোঁজ পর্যন্তও নেয়া হয়নি। এমন প্রতিভার মূল্যায়ন কেন সংশ্লিষ্টরা করলো না সেই প্রশ্ন অনেকটা অধরাই থেকে গেছে।
বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কিশোর সাঁতারু রাব্বী শুধুমাত্র বগুড়া কিংবা বাংলাদেশের সম্পদ নয়। সে এখন দক্ষিণ এশিয়ার সম্পদ। এই কিশোর সাঁতারুকে ঠিকমতো পরিচর্যা করলে সে একদিন দেশের জন্য অনেক অনেক সম্মান বয়ে আনবে। আজকের কিশোর রাব্বি একদিন অলিম্পিকে সোনা জিতে বাংলাদেশের মর্যাদাকে সারা বিশ্বে সমুন্নত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ তিনি আরো বলেন, রাব্বির পরিবারের পাশে সরকার যদি দাঁড়ায় তাহলে এই কিশোর একদিন বাংলাদেশকে আরো মর্যাদার আসনে নিয়ে যাবে।
সুত্র : মানবজমিন




