
বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি: ফরিদপুরের বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার সীমান্তবর্তী ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
গত শুক্রবার থেকে আজ সোমবার পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে হামলা, সংঘর্ষ ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রবিবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা ধরে দুইপক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে গুরুতর তিনজনকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার সকালেও ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় দুইপক্ষের মধ্যে ফের সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় ৮ থেকে ১০টি বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। তবে সোমবারের ঘটনায় কোনো ৫-৬জন ছোটখাটো আহত ছাড়া গুরুতর আহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে ছুটে যান দুই উপজেলার প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এর আগে জিহাদের ওপর হামলার ঘটনায় দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে কয়েক দিনের টানা সংঘর্ষের পরও এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা বিরাজ করায় ফের সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া বাজারটি বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা হলে বাজারটি বোয়ালমারী উপজেলার মধ্যে অপস্থিত। বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের বরখাস্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মাতুব্বর (৭১’র মানবতাবিরোধী মামলার ১ নম্বর স্বাক্ষী) এবং সালথা উপজেলার খাড়দিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদ (কেন্দ্রীয় সাবেক জামায়াত নেতা মানবতাবিরোধী মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চুর ছেলে) এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।
এলাকাবাসীদের ভাষ্যমতে, ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুইপক্ষের বিরোধ আরও তীব্র হয়। ওই সময় আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তাঁর ভাই সিদ্দিক মাতুব্বরের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে জিহাদপন্থিদের বিরুদ্ধে। এরপর মান্নান মাতুব্বরের পক্ষের লোকজন এলাকা ছেড়ে গেলে ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ জিহাদপন্থিদের হাতে চলে যায় বলে স্থানীয়রা জানান। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তাঁর পক্ষের লোকজন এলাকায় ফিরে এলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফের উত্তেজনা দেখা দেয়। এরপর থেকেই দুইপক্ষের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, গত শুক্রবার ময়েনদিয়া দাইপাড়া এলাকায় একটি দোকানে হামলার অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জিহাদের কয়েকজন সমর্থক ওই হামলা চালায়। পরেরদিন শনিবার ময়েনদিয়া বাজারে জিহাদপন্থি যুবদল নেতা সোলায়মান মাতুব্বরের সঙ্গে স্থানীয়দের বাগবিন্ডা হয়। এ সময় এক ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ীর কাছে ৪ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। পরে ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জড়ো হলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে সোলায়মান আহত হন। খবর পেয়ে মুশফিক বিল্লাহ জিহাদ বাজারে গিয়ে সোলায়মানকে উদ্ধার করে একটি ফার্মেসিতে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
জিহাদের অভিযোগ, সেখানেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একদল লোক তাঁর ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জিহাদপন্থি যুবদল নেতা মাহবুব হাসান সজিব দাবি করেন, বাজারে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে এবং শনিবার মান্নান মাতুব্বরের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে জিহাদ ও সোলায়মান আহত হন। অন্যদিকে ময়েনদিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মজিবর রহমান মোল্যার অভিযোগ, জিহাদ লোকজন নিয়ে এলাকায় এসে হামলা চালান এবং সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে মারধর ও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ব্যবসায়ী মাওলানা মাসুদুর রহমানও কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর ও তার পক্ষের সালথার বাসিন্দা তারা মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। শনিবারের হামলার জের ধরে রবিবার বিকেল ৪টার দিকে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় দুইপক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বিকেল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। একপর্যায়ে সংঘর্ষ আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সালথার খাড়দিয়া গ্রামের জিহাদপন্থী হুমায়ন খাঁ, রফিক মোল্যা ও ইলিয়াস কাজীর নেতৃত্বে একপক্ষের লোকজনের সঙ্গে বোয়ালমারীর ময়েনদিয়ার আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের পক্ষের লোকজনের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০-৩৫জন জন আহত হন। আহতদের বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর আহত কবির মোল্যা, কামরুল মোল্যা ও লোকমান মোল্যাকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওইদিন কর্মরত বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইজাজ আহমেদ শাওন বলেন, রবিবার সন্ধ্যার পর বেশ কয়েকজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। গুরুতর তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এদিকে রবিবার রাতের সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ধুলজোড়া ব্রিজ এলাকায় আবারও দুইপক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সালথার খাড়দিয়া গ্রামের লোকজন সেখানে হামলা চালালে নতুন করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সময় ধুলজোড়া ও উজিরপুর এলাকায় আব্দুল মান্নান মাতুব্বরের পক্ষের লোকজনের কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ৮ থেকে ১০টি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে সোমবারের ঘটনায় কোনো মারাত্মক হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। খবর পেয়ে বেলা ১২টার দিকে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন, বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান, সালথা থানার ওসি বাবলুর রহমান ও বোয়ালমারী থানার ওসি মো. মোস্তাফিজুর রহমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে তাঁরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। টানা কয়েক দিনের হামলা, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় ময়েনদিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য নিয়ে দুইপক্ষের বিরোধের কারণে তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যেকোনো সময় আবারও সংঘর্ষ শুরু হতে পারে-এমন আশঙ্কায় অনেকে দোকানপাট খোলা নিয়েও উদ্বিগ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও বাজার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধটি এখন শুধু দুইপক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজনও এতে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে পরিস্থিতি আরো বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আজ সোমবার বিকেলে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযোগ পাওয়ার পর দুইজনকে আটক করা হয়েছে। পরে দুইপক্ষের সংঘর্ষের খবর পেয়ে দুই উপজেলার প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঘটনাস্থল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।




