
মো:শাহাদাত হোসেন মনু,ঝালকাঠি: সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বিভিন্ন খাল, বিল, নদী ও জলাশয়ে অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল। একই সঙ্গে উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও মাছ ধরার সরঞ্জামের দোকানে গোপনে বিক্রি হচ্ছে এ জাল। সংশ্লিষ্টদের নজরদারির অভাবে অসাধু মৎস্যশিকারিরা নির্বিঘ্নে জাল ব্যবহার করায় দেশীয় মাছের প্রজনন, জলজ জীববৈচিত্র্য। এতে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে নলছিটির খাল-বিল ও জলাশয়ে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সূক্ষ্ম ফাঁসের এ জালে শুধু বড় মাছই নয়, মাছের ডিম, রেণু, ছোট পোনা এবং বিভিন্ন উপকারী জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এতে দেশীয় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশিয় অনেক প্রজাতির মাছ ধীরে ধীরে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে এবং ভোরবেলায় অসাধু জেলেরা দীর্ঘ আকারের চায়না দুয়ারি জাল পেতে মাছ শিকার করছেন। একবার পানিতে স্থাপন করলে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জালটি পানিতেই থাকে। এতে চলাচলকারী প্রায় সব ধরনের মাছ ও জলজ প্রাণী আটকা পড়ে। ফলে জলাশয়ের প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী বেলায়েত হোসেন জানান, “কারেন্ট জালের পর এখন চায়না দুয়ারি জাল দেশীয় মাছের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসন নিয়মিত অভিযান না চালালে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশীয় মাছ দুর্লভ হয়ে পড়বে।”
কলেজ শিক্ষক এস এইচ সাইফুল্লাহ বলেন, “কম দামে সহজে পাওয়া যায় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় বলেই এ জালের ব্যবহার বাড়ছে। এতে মাছের রেণু ও পোনাসহ অসংখ্য জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। দেশীয় মাছ কমে যাওয়ায় বাজারে হাইব্রিড ও চাষের মাছের আধিপত্য বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—উভয়ের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।”
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাছের প্রজনন মৌসুমে এ ধরনের সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহার অব্যাহত থাকলে দেশীয় মাছের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নলছিটি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, “বর্ষা মৌসুমে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার বেড়ে যায়। বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। খুব শিগগিরই উপজেলা জুড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। অভিযানে নিষিদ্ধ জাল জব্দের পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিজভী আহমেদ সবুজ জানান, “চায়না দুয়ারি জাল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মৎস্য বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। যারা এসব নিষিদ্ধ জাল বিক্রি ও ব্যবহারের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সচেতন নাগরিকদের দাবি, মাঝে-মধ্যে অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। দেশীয় মাছ ও জলজ পরিবেশ রক্ষায় নিষিদ্ধ জালের উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর আইন প্রয়োগসহ জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ কেবল বইয়ের পাতায়ই দেখতে পাবে।




