
ইসলাম উদ্দিন বাবুল : আমার এই লেখার মুল উদ্দেশ্যে হইলো পুরান ঢাকার মানুষের গর্ব, একজন দানবীর, ঢাকা শহর ও ঢাকার পার্শবর্তী অঞ্চলে প্রথম পাবলিক বাস সার্ভিসের প্রতিষ্ঠাতা আ: আজিজ মোমিন কোম্পানির হারিয়ে যাওয়া কিছু ইতিহাসকে আমাদের পুরান ঢাকার বর্তমান প্রজন্মের ঢাকাইয়া ছেলেমেয়ে ও সাধারন মানুষের মাঝে তুলে ধরা। বিশেষ করে আমাদের পুরান ঢাকার ছেলেমেয়েরা এই কীর্তিমান মানুষকে নিয়ে আগামিতে যেনো গর্ব করতে পারে। মোমিন কোম্পানিকে নিয়ে আমাদের ইতিহাস বিদ্বগন বা মিডিয়া তেমন কোন ইতিহাস প্রচার করে নাই এটাই হইলো আমাদের পুরান ঢাকার মানুষের দুর্ভাগ্য। আমি পাকিস্তান আমলে ছোটবেলায় মোমিন কোম্পানিকে খুবকাছ থেকে দেখেছি সৌভাগ্যক্রমে তার সাথে কথা বলার ও ইদের সালামি পাওয়ার সুযোগ হইয়াছিলো। তার সাধারন বেশে চলা তার আচার আচরন তখন আমাকে আকৃষ্ট করতো। তিনি খুবই দয়ালু এবং দানশীল ছিলেন। তিনি লোক দেখানো দানশীল ছিলেন না। তার গোপনভাবে দান করার কিছু ঘটনা আমি দেখেছি আগামিতে লিখবো। তৎকালীন সময় ঢাকার অন্যতম ধনবান হওয়া সত্বেও তিনি খুব সাধারন বেশে চলতেন। তার পরিবারের সদস্যরা দামি বিদেশি গাড়িতে চলাফেরা করলেও তিনি একটি পুরাতন খোলা জীপে চলাচল করতেন। একজন আফগানিস্তানের পাঠানকে তার সাথে সব সময় থাকতে দেখেছি। তিনি সব সময় সাদা লুংগি সাদা পাঞ্জাবি পড়ে চলাফেরা করতেন। এই লুংগি পড়া নিয়ে সেই সময় ঢাকার আন্তর্জাতিক হোটেল শাহবাগে (এখন পিজি হাস্পাতাল) এবং এলিটদের সিনেমা হলে প্রবেশ করা নিয়ে বিশেষ কাহিনী আমি মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি আগামি পর্বে তা লিখবো। মোমিন কোম্পানি এবং তার মুড়ির টিনের তথ্যগুলো লিখতে গিয়ে কারো তেমন কোন সহযোগিতা পাইনাই তেমন কোন ইতিহাসের লেখাও পাইনাই। মনের তাগিদে যতটুকু পেরেছি এই মহান মানুষটির জন্য বিভিন্নভাবে তথ্য, ছবি সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে গিয়ে আমাকে কিছু পরিশ্রম করতে হয়েছে। ব্যাক্তি মোমিন কোম্পানির তেমন কোন তথ্য বা পুর্ন ইতিহাসের কোন বইও পাইনাই। আমি পুরান ঢাকার লালবাগের স্থানীয় সন্তান এবং মোমিন কোম্পানির বাড়ির পাশের এলাকার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে এবং তার সন্মধ্যে ছোটবেলা থেকে মুরুব্বীদের কাছ থেকে যা জেনেছি এবং আমি যা দেখেছি তাই শুধু লিখেছি।
পুরান ঢাকা লালবাগের ২৫ নং হরনাথ ঘোষ রোডের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ তার ডাক নাম মোমিন। উনার পিতার নাম ছিলো আ;রহমান। পিতার নামেই তিনি এই বাড়িটির নামকরন করেন। এই বাড়ির সন্মুখের রাস্তার মোড়টিকে আদিকাল থেকে মোমিন কোম্পানির মোড় বলা হইতো। এই বাড়িতেই উনার প্রথম স্ত্রী বসবাস করতেন। প্রথম স্ত্রীর বাড়ি পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জে ছিলো। তিনি নি;সন্তান ছিলেন তবে তার পালক ছেলেমেয়ে ছিলো। বর্তমান রয়েল হোটেলের একটু সামনে দক্ষিনের তিন রাস্তার মোড়টাই মোমিন কোম্পানির বাড়ির মোড়। মোড়ের এই বাড়ির পাশেই (এখন এপেক্সের অফিস/লাজফার্মা ও ইসলামি ব্যাংক লালবাগ শাখার) যে ভবনটি আছে এইখানেই উনার ২য় স্ত্রী বসবাস করতেন। দ্বিতীয় স্ত্রী পুরান ঢাকার নবাব বাড়ির নবাব বংশের মেয়ে ছিলেন। নবাব বাড়ির মেয়ে বিয়ে করা নিয়েও বেশকিছু কাহিনি আমি জেনেছি। আমার সৌভাগ্য মোমিন সাহেবের ছোট স্ত্রীর একভাই আমার এলাকায় বিয়ে করার সুবাদে দুলাভাই সম্পর্কের কারনে তার সাথে আমি এই বাড়িতে কয়েকবার গিয়েছি এবং মোমিন কোম্পানির ছোট স্ত্রীকে দেখা এবং কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। মোমিন কোম্পানির মোড়ের এই দুইটি বাড়ি ছাড়াও লালবাগ এলাকায় তার বেশ কিছু বাড়ি ছিলো। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পাশেই তার অনেক বড় গাড়ির গ্যারেজ ও ওয়ার্কসশপ ছিলো।
মুড়ির টিন পাবলিক বাসের কাহিনী-🚗 মোমিন কোম্পানির পিতা আব্দুর রহমান একজন আড়তদার ব্যাবশায়ি ছিলেন। কথিত আছে উনাদের আড়ত ব্যাবশার মধ্যে ডিমের ব্যাবশাটাই প্রধান ছিলো। ঢাকার নদীবন্দর জিঞ্জিরাতে উনাদের কয়েকটি আড়ত ছিলো। মোমিন কোম্পানির আপন আরেক ভাই ছিলেন উনার নাম ছিলো আব্দুস সাত্তার। আমি আগেই বলেছি মোমিন কোম্পানি একজন পরিশ্রমি জীবন সংগ্রামি ব্যাক্তি ছিলেন। সেই ইংরেজ আমলের কথা তখন এদেশে ব্রিটিশ রাজত্বকাল চলছিলো। পুরান ঢাকার মানুষ তখন ঘোড়ার গাড়িতে চলাফেরা করতো। ঢাকা তখন অনেক ছোট একটি শহর ছিলো। বেশির ভাগ সাধারন মানুষ হেটেই চলাফেরা করতো। ঢাকায় তখন ইংরেজেরা এবং নবাবেরা কয়েকটি ইঞ্জিন চালিত ব্যাক্তিগত গাড়িতে চলাফেরা করতো। পুরান ঢাকায় ১৮৫৬ সালের দিকে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু করাইয়া ছিলো ঢাকায় বসবাসরত আর্মানিটোলার আর্মেনিয়ানরা। তখন কিন্তু ঢাকার রাস্তায় টাংগা বা আদমগাড়ি ছিলো বলে কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই। তবে এই গাড়ি কোলকাতায় প্রচলন ছিলো। ১৯৩৯ইং থেকে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার সময় ব্রিটিশ মিত্রবাহিনী ভারতবর্ষে তথা ঢাকা শহরেও সৈন্য পরিবহনের জন্য বড়বড় ইঞ্জিঞ্ চালিত ট্রাক ও জীপগাড়ি এনেছিলো। ১৯৪৫ইং সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর এইসব যানবাহন স্বল্পদামে এদেশের কিছু ব্যাক্তির কাছে বিক্রয় করে দেয়া হয়েছিল। সেখান থেকে বেশকিছু ট্রাক মোমিন কোম্পানি ক্রয় করেছিলেন। একসময় কাঠ-টিন দিয়ে ট্রাকের চেচিশের উপর মুড়ির টিনের (কাতি) সাদৃশ্য বা বডি বানিয়ে সেটাকে পাবলিক বাসে Bus রুপান্তর করেন। একসময় পুরান ঢাকার রসিক মানুষেরা এই গাড়ীটির “মুড়ির টিন”নাম করন করিয়া দেয়। (চলবে-)। বাকি অংশ আগামি সপ্তাহে।
তথ্য-ও লেখক-:ইসলাম উদ্দিন বাবুল, পুরান ঢাকার লেখক (পুরান ঢাকার লেখক ও গবেষক ফোরামের নিজস্ব প্রতিবেদন ও সংরক্ষিত)




