খেলাশিরোনাম

কেসিয়াস ক্লে থেকে মুহাম্মদ আলী : দুনিয়া বদলের লড়াই

মুহাম্মদ আলী। কথায় যেমন তার সঙ্গে পেরে উঠা দায়, বক্সিং রিং এও তেমনি তার সামনে দাঁড়ানো কঠিন।

বক্সিং রিং এর এই তারকার সেই উক্তি এখন কিংবদন্তী, “আই ফ্লোট লাইক এ বাটারফ্লাই, স্টিং লাইক এ বী।” “আমি প্রজাপতির মত উড়ি, মৌমাছির মতো দংশন করি।”

১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকেই স্বর্ণ জিতলেন, তারপর ১৯৬৪ সালে সনি লিস্টনকে হারিয়ে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন।

কেনটাকির লুইভিলের কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ কেসিয়াস ক্লে এর ইসলামে দীক্ষা নিলেন, নাম পাল্টে রাখলেন মুহাম্মদ আলি। শুধু নাম বদল নয়, এবার বক্সিং এর বাইরের দুনিয়াটাকেও পাল্টে দেয়ার লড়াইয়ে নামলেন তিনি।

বক্সিং রিং এ মুহাম্মদ আলী: "ফ্লাই লাইক এ বাটারফ্লাই, স্টিং লাই এ বী"
বক্সিং রিং এ মুহাম্মদ আলী: “ফ্লাই লাইক এ বাটারফ্লাই, স্টিং লাই এ বী”

১৯৬৭ সালে নিজের শহরের কৃষ্ণাঙ্গরা সমানাধিকার আর আর বাসস্থানের দাবিতে যখন আন্দোলনে নামেন, তখন সামনের কাতারে দেখা গেল মুহাম্মদ আলীকে।

“লুইভিলের মানুষের জন্য স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার আর সাম্যের লড়াইয়ে আমি তাদের সঙ্গে আছি”, বলেছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রর কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের নেতা আল শার্পটনের ভাষায়, আমেরিকার সাংস্কৃতিক জগতে মুহাম্মদ আলী এক বিরাট শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেন, যা পুরো কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করলো।

তার মতে, ষাটের দশকের আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলি যা করেছিলেন, তার তুলনা নেই। এই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গরা তারা যা, তা নিয়ে গর্ব করতে শিখলো:

“আলী ছিলেন এমন একজন, আমরা সবাই যার মতো হতে চাইতাম। তখনকার ছেলেদের কাছে আলী হচ্ছেন আদর্শ। কয়েদির পোশাক করে জেলখানায় মারা যেতে আর কেউ রাজী নয়, সবাই চান মুহাম্মদ আলী হতে। প্রজাপতির মতো উড়বেন, মৌমাছির মতো দংশন করবেন। সবাই চান, আলীর মতো হয়ে উঠতে, মেয়েরা যাকে পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকবে। কিন্তু আলী বলছেন, এত খ্যাতি, এত সন্মান, এসব কিছু ছেড়ে তিনি তার মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে চান।”

তাকে কেন কেবল মুহাম্মদ আলী নামেই ডাকতে বলেন, সাংবাদিকের এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তাঁর নেতা এবং শিক্ষক তাকে সেই নামটাই দিয়েছেন। “মুহাম্মদ নামটাই আমার আসল নাম, আমার প্রকৃত নাম। কেসিয়াস ক্লে হচ্ছে এক কৃষ্ণাঙ্গ দাসের নাম। আমি তো এখন আর দাস নই।”

কেবল কৃষ্ণাঙ্গদের সমানাধিকারের আন্দোলন নয়, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনেও মুহাম্মদ আলী এসে দাঁড়ালেন সামনের কাতারে। ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যাওয়ার ডাক প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। পরিণামে পাঁচ বছরের সাজা হলো তার। কেড়ে নেয়া হলো বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের খেতাব।

কিন্তু তার বিদ্রোহ ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করে তুললো। টনি গিটন ছিলেন সেসময় এক ছাত্র নেতা।

“মুহাম্মদ আলী ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী যে অবস্থান নিলেন, তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও অনেক আফ্রিকান-আমেরিকান যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানালেন। লোকজন তাদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সরকারের কাছ থেকে আসা চিঠি পোড়াতে লাগলো, তারা মিছিলে যোগ দিলো, শ্লোগান দিলো, না, আমরা যুদ্ধে যাব না। তিনি ছিলেন সেরকম এক ব্যক্তিত্ব, যার উদাহারণ অনুসরণ করলেন অনেকে।”

মুহাম্মদ আলী: শেষ বয়সে হুইল চেয়ারে বন্দী
মুহাম্মদ আলী: শেষ বয়সে হুইল চেয়ারে বন্দী

কিন্তু মুহাম্মদ আলী যা করেছিলেন, তার তুলনা আর কারও সঙ্গে চলেনা। বলছেন আল শার্পটন। কারণ তার মতো এতটা ত্যাগ স্বীকার করেনি আর কেউ।

“এই এক লোক, যিনি বলছেন, আমাকে জেলে ভরো, তারপরও আমি যুদ্ধে যাব না। আমি বিশ্ব হেভিয়েট চ্যাম্পিয়ন, আমার বিশ্বের সেরা বক্সার। তুমি আমার সব কিছু কেড়ে নিতে পার। কিন্তু তারপরও আমি যুদ্ধে যাব না। তার এই অবস্থান পুরো আন্দোলনটাকে এমন একটা অবস্থানে তুলে এনেছিল, যা আমরা এর আগে কখনো দেখিনি। এর পরেও দেখিনি।”

ভিয়েতনাম যুদ্ধে না যাওয়ায় যাকে যুক্তরাষ্ট্র সাজা দিয়েছিল, সেই মুহাম্মদ আলীকেই হো্য়াইট হাউসে ডেকে ২০০৫ সালে দেয়া হলো দেশটির সর্বোচ্চ সন্মাননা, তার হাতে স্বাধীনতা পদক তুলে দিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ।

কিন্তু বক্সিং রিং এ কিংবা নিপীড়িত মানুষের অধিকারের সংগ্রামে যিনি ছিলেন অপরাজিত, শেষ পর্যন্ত তাকেও হার মানতে হলো পার্কিন্সসনস রোগের কাছে।

তার ভক্তদের কাছে মুহাম্মদ আলী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এমন এক মানুষ হিসেবে, যিনি বক্সিং এর জগত শুধু নয়, বাইরে জগতটাকেও দারুণভাবে বদলে দিয়েছিলেন।

সুত্র: বিবিসি

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button