শিরোনাম

‘কাঁনা রাজার সুড়ঙ্গ’: যেন জীবন্ত গুহা

কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা নামক দুর্গম এলাকায় প্রাচীন ঐতিহ্যের রহস্য চাদরে ঢাকা রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আঁধার মানিক। যা স্থানীয়ভাবে কাঁনা রাজার সুড়ঙ্গ হিসেবে পরিচিত। এই কাঁনা রাজার সুড়ঙ্গকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। হাজার বছরের পুরনো এ সুড়ঙ্গ সংস্কার হলে হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কক্সবাজারের ইতিহাস গ্রন্থ ছাড়াও পাকিস্তান আমলে প্রকাশিত ‘পাকিস্তান পর্যটন ডিপার্টমেন্ট টুরিস্ট গাইড’-এ রামুর কাঁনা রাজার সুড়ঙ্গের কথা লিপিবদ্ধ ছিলো। ঐতিহাসিক সূত্রমতে এটিকে রাজা চিন পিয়ান বা কিংবেরিং এর উদ্বাস্তু জীবনের শেষ সময়কালের আশ্রয়স্থল বা দুর্গ বলে ধারণা করা হতো।
কথিত আছে, বর্মী সেনা ও বর্মী অনুগত আরাকানিদের উপর অত্যাচার করার কারণে প্রতিপক্ষের সংঘবদ্ধ আক্রমণে পরাজিত হয়ে চিন পিয়ান বৃহত্তর চট্টগ্রামে পালিয়ে এসে আত্মগোপন করেন। তাকে গ্রেফতার করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তৎকালীন ৫ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। এ পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য চিন পিয়ান পুনরায় আরাকানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেখানেও বর্মীদের পাল্টা প্রতিরোধের কারণে তিনি রামুর পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেন। এখানে থাকাকালীন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাহাড়ের গভীরে খনন করা হয় এই গোপন সুড়ঙ্গ বা দুর্গ।
বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক, কবি এম. সুলতান আহমদ মনিরীর মতে, সেই সময়ের রামুর পূর্বাংশ অনেক ছোট-বড় মগ রাজা-রাজড়ার শাসনাধীন ছিল। রামুর পশ্চিমাংশ বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন চুচা বা খাড়িযুক্ত ছিল। বঙ্গোপসাগর থেকে উমখালী হয়ে শিকলঘাটের ‘সামরাই’ ও রামু মেরংলোয়া সীমান্ত থেকে ‘উত্তর মিঠাছড়ির বিল’ দূর অতীতের তেমনি ছিল বিশাল বিশাল খাড়ি। রামুর রামকুট ছিল প্রাচীনযুগের আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর ও পোতাশ্রয়। রামু হাসপাতাল এলাকাসংলগ্ন উত্তর মিঠাছড়ি এলাকাতেও নিকট অতীতে যাত্রী- মালামাল বোঝাই ছোটবড় সমুদ্রপোত নোঙর করত। সম্ভবত: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার্মা গমনে যাত্রাপথে রামকোট পোতাশ্রয়ে ট্রানজিটকালীন রামুর অপার নৈসর্গিক শোভায় বিমোহিত হয়ে রাজর্ষি উপন্যাসে রামুকে ‘রম্যভূমি’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
বুঝাই যাচ্ছে মনিরঝিল, কাউয়ারখোপ, উখিয়ারঘোনা, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ঈদগড়সহ সন্নিহিত বার্মা সীমান্ত অঞ্চলেও অনেক ছোটবড় মগরাজা- রাজন্যের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল।

মনিরাজার ‘মনিরঝি’ (ঝি থেকে ঝিল), ক্যাউ থেকে কাউয়ার খোপ তেমনি উখ্য থেকে উখিয়ার ঘোনা, পোয়াঙ্গের খিল, থোয়াঙ্গারকাটা ইত্যাদি নামকরণেও সেটা অনুমেয় বটে! নানা উত্থান-পতনে বার্মার অনেক পলায়নপর রাজা-শাসকদের আগমন-নির্গমনের ঐতিহাসিক চিহ্নও এখানে বিরল নয়। যেমন অনতিদূরের ঐতিহাসিক শাহ সুজারোড যা ৪শ’ বছরের পুরনো পত্নচিহ্ন। সেই প্রেক্ষিতে আলোচ্য সুড়ঙ্গও তেমন কোন গোপন আশ্রয়স্থল বা কেল্লা হওয়া বিচিত্র নয়। অনুরূপ প্রেক্ষাপটে ৩৬০ পালংখ্যাত উখিয়াতেও একই বা ভিন্ন নামে গুহা বা সুড়ঙ্গ রয়েছে।
আসলে মানুষের আদিনিবাস ছিলতো গুহাতেই। সভ্যতার আলোর উৎস সেখানেই। তারা যে গুহাবাসেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো এর বড় প্রমাণ তো প্রাচীন ভারতের ইলোরা অজন্তার গুহাচিত্রগুলো। ৫০/৬০ বছর আগেও স্থানীয় অনেকে আলোচ্য আঁধারমানিক গুহায় প্রবেশ করতো, যাদের কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছেন বলে শুনা যায়। তারা ঐ গুহায় সোজা দাঁড়িয়ে অনেক ভেতরে প্রবেশ করে কিছু ছোট বড় কক্ষ ও একটি প্রশস্ত হলের মত দেখেছিলেন। আরো ভেতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলে যেতে প্রবেশকারীরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসে। বর্তমানে ঐ গুহামুখ পাহাড় ধসে আংশিক বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা এ ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গটি ফের উন্মোচন করেছেন রামুর একঝাঁক ছাত্র-যুবক।
গত শুক্রবার ছিলো আঁধার মানিক বা কাঁনা রাজার সুড়ঙ্গ পুনরায় আবিষ্কারের দিন। ইতিহাস-ঐতিহ্যের সন্ধানে সেদিন সেখানে স্থানীয় ছাত্র-তরুণ-যুবকদের সাথে গিয়েছিলেন, রামুর চিত্রশিল্পী, সংবাদকর্মীসহ সৃষ্টিশীল অনেক ব্যক্তিবর্গ। এতে রামুর পর্যটন শিল্প বিকাশে আঁধার মানিক বা কাঁনা রাজার সুড়ঙ্গকে বিকশিত করতে করণীয় নিয়ে কথা বলেন, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী তানভীর সরওয়ার রানা। আঁধার মানিক এর ঐতিহাসিক পটভূমি পাঠ করেন, ছড়াকার কামাল হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন, সাংবাদিক সোয়েব সাঈদ ও আবুল কাসেম সাগর। সুড়ঙ্গ নতুনভাবে উন্মোচন ও আড্ডায় আরো অংশ নেন শিক্ষক তাজ উদ্দিন, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও আবুল কালাম আবু, নজরুল ইসলাম খোকন, সুলতান আহমদ, মোহাম্মদ নোমান, নুওয়াইছির আরাফাত সোহেল, শাহীন আলম, জসিম উদ্দিন, আবদুর রহিম, আবুল কালাম, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, স্থানীয় বাসিন্দা তাতু বড়ুয়া, ফয়সাল, ওবাইদুল হক প্রমুখ। তারা জানান, সেই ছোটকাল থেকে এ সুড়ঙ্গটির কথা লোকমুখে শুনে আসছিলেন। পরে বিভিন্ন পুরনো এবং স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত বইতেও সুড়ঙ্গটির তথ্য জানতে পারেন। কিন্তু অযত্ন-অবহেলা ও প্রচারের অভাবে সুড়ঙ্গটি এলাকার অনেক লোকজনও দেখেনি।

বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনার পর সম্প্রতি সুড়ঙ্গটি দেখতে যান অনেকে। কিন্তু সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখটি তখন পাহাড়ের মাটি ও জঙ্গলে ঢাকা। নিজেরাই সেই মাটি ও জঙ্গল কেটে সুড়ঙ্গ যেন ফের আবিষ্কার করলো সবাই। সুড়ঙ্গের ভিতরে গিয়ে অবাক হতে হয়ে সবাইকে। এ যেন জীবন্ত গুহা। তারা আশা প্রকাশ করে বলেন হাজার বছরের পুরনো এ সুড়ঙ্গ সংস্কার হলে এই আঁধার মানিক বা কাঁনা রাজার সুড়ঙ্গকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
সুত্র: ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button