slider

করোনাকালীন ঘরে বাইরে নারী নির্যাতন ও ক্ষমতায়ন চিত্র

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম: ‘ বৈশি^ক মহামারি করোনাকাল মানবজাতির সংকটকাল ’ ইমিউনিটি শক্তি বৃদ্ধি করি,কোভিডকে না বলি’ এই ধরনের প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক সিংগাইর অঞ্চলে নারীবান্ধব সমাজের জন্য বহুত্ববাদি সাংস্কৃতিক চর্চা ও উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে গত (মে-জুন) ২০২০ করোনাকালীন সময়ে ঘরে বাইরে নারী নির্যাতন ও ক্ষমতায়নের মাত্রা নিরুপনে কমিউনিটি পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির সাথে প্রশ্নমালার আলোকে সাক্ষাতকার ভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম করা হয়। বারসিক আঞ্চলিক সমন্বয়কারি বিমল রায় এর নির্দেশনায় মাঠ পর্যায়ে থেকে গবেষণা কার্যক্রমে সহায়ক ছিলেন প্রকল্প কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম, প্রকল্প সহায়ক আছিয়া আক্তার ও রিনা আক্তার। গত জুলাই ২০২০ থেকে গবেষণা পদ্ধতি ও প্রতিবেদন তৈরীতে আমাকে সহায়তা করেন বারসিক সমন্বয়কারি মো.জাহাঙ্গীর আলম।
করোনাকালের সংগ্রামে নারীবান্ধব বহুত্ববাদি সাংস্কৃতিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমাদের দায় ও দায়িত্ব শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে আমরা “নারীর প্রতি সামাজিক সহিংসতা বন্ধ করি, নারীবান্ধব সাংস্কৃতিক সমাজ গড়ি” এই ¯েøাগানকে ধারন করে গবেষণা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়। নারীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠায় বৈশি^ক মহামারী করোনাকালে পারিবারিক নির্যাতন ও সামাজিক সহিংসতার হার/মাত্রা নিরুপনে সুশীল সমাজ ও প্রান্তিক পর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক সিংগাইর রিসোর্স সেন্টার এর মাধ্যমে গবেষণার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস উদাহরন হয়ে থাকবে।
গবেষণা কার্যক্রমের যৌক্তিকতার দিক থেকে বলতে হয় যে বৈশি^ক মহামারী করোনা মানব সভ্যতা, প্রাণ-প্রকৃতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে ভিন্ন মাত্রায় একেবারেই উলট-পালট করে দিয়েছে। এহেন অবস্থায় উচ্চ বিত্ত,মধ্যবিত্ত,নি¤œ মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের পারিবারিক সামাজিক জীবন তথা করোনাকালের প্রেক্ষিতে বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতন,সামাজিক সহিংসতাসহ ঘরে বাইরে নারীর অবস্থা ও অবস্থান বিশ্লেষনের মাধ্যমে নারীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠায় করনীয় বিষয়ে সম্যক ধারনা পাব বলে আমরা মনে করি।
সমস্যা নিরুপনের আলোকে বলতে হয়-বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, খুন, ধর্ষন, ইভটিজিং, পরোকিয়া, প্রযুক্তি আসক্তিসহ সামাজিক সহিংসতার মত অসংখ্য সমস্যা সমাজে বিদ্যমান। এই সকল সমস্যার মধ্য বা অন্য আরো সমস্যা আছে কিনা সেটিও নিরুপন করতে চেষ্টা করব। আমরা এই ধরনের সামাজিক গবেষণার মাধ্যমে ব্যক্তিক, পরিবার ও সমাজের সমস্যাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় নিরুপন করার চেষ্টা করব। আমরা কেবলমাত্র দেশের মধ্যঞ্চল বলে খ্যাত মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর উপজেলাধীন বায়রা ইউনিয়নের বায়রা, চারাভাঙ্গা, পাছপাড়া, স্বরুপপুর, বাইমাইল মোল্লা পাড়া, বাইমাইল ঋষি পাড়া, সানাইল, আলীনগর, বাড্ডা, গারাদিয়া,বলধারা ইউনিয়নের কালিয়াকোর,নবগ্রাম ও সিংগাইর পৌরসভার আঙ্গারিয়া, মধ্য সিংগাইর, বিনোদপুর, বকচর ঋষিপাড়া, আজিমপুর, গোলড়া আবাসন, নিলটেক, কাংশা, নয়াডাঙ্গী গ্রামের বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে অধিক প্রাধান্য দিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থেকেও করোনাকালীন প্রদত্ত গ্রামগুলোতে বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতনসহ ঘরে বাইরে নারীর অবস্থা ও অবস্থান বিশ্লেষনের প্রেক্ষিতে আমরা প্রান্তিক পর্যায়ে জনগোষ্ঠী ছাড়াও সুশীল সমাজ তথা সচেতন মহলের মধ্যে উপজেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সিংগাইর সরকারি কলেজ ও বায়রা কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, সিংগাইর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, সিংগাইর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বাইমাইল কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়, জি জি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, বায়রা উচ্চ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সাথে সাক্ষাতকারের মাধ্যমে আলোকপাত করেছি। এছাড়াও কমিউনিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সর্বোচ্চ বিচরন মাথায় রেখে সিংগাইর পৌরসভা,বায়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যদের সাথে গবেষণাপত্র নিয়ে সাক্ষাতকার নিয়েছি। এছাড়াও সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও সিংগাইর থানার অফিসার্স ইনচার্জ ও কয়েকজন তদন্ত কর্মকর্তার সাথে প্রস্তাবিত গবেষণাপত্রের আলোকে সাক্ষাতকার গ্রহন করেছি।
গবেষণার পরিধি ও ব্যাপ্তির আলোকে আমাদের রয়েছে অনেক সীমাবন্ধতা। আমরা কেবল ঢাকার নিকটবর্তী জেলার একটি উপজেলা সিংগাইরের ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে কেবল ১টি ইউনিয়ন বায়রাতে ৮টি গ্রাম ও ১টি পৌরসভা সিংগাইর পৌরসভার ৮ টি গ্রামের বারসিক এর কাজের সাথে সম্পৃক্ত পারিবারিক তথ্যের আলোকে কয়েকটি পরিবারের নির্দিষ্ট কিছু নারী-পুরুষের কাছে প্রবেশ করতে পেরেছি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুটি কয়েক শিক্ষার্থী- শিক্ষক ও প্রধানদের সাথে স্বল্প পরিসরের এই সাক্ষাতকারের মাধ্যমে বাল্য বিবাহ ও নারী নির্যাতনে করোনাকালে সমাজে এর ব্যাপকতা হ্রাস/বৃদ্ধি বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় বরং আরো ব্যাপক ও গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
গবেষণাটির উদ্দেশ্য/অভিলক্ষের: দিক থেকে বলতে পারি- নারীবান্ধব বহুত্ববাদি সাংস্কৃতিক সমাজ তথা পরিবার সমাজ ও রাষ্টের সকল স্তরে যেন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় যেন নারীর অংশগ্রহন তথা সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধাসহ প্রবেশাধিকারের হার বৃদ্ধি পায়। বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানী, ইভটিজিং, পরোকিয়া, বিবাহ বিচ্ছেদ, শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষন এবং শারিরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ যে কোন ধরনের সামাজিক সহিংসতার হার যেন হ্রাস পায়। কমিউনিটিতে নারীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠায় কিশোর-কিশোরীদেরকে সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোকে কিভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্যকে প্রসারিত করা ও তারা যেন সমাজের অনুঘটকের মতো সমাজ পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে সমাজে শান্তি ও সম্প্রতি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারে। গবেষণার আসল উদ্দেশ্য হলো বহুত্ববাদি সমাজ প্রতিষ্ঠায় সমাজে সাংস্কৃতিক চর্চাগুলো অব্যাহত রাখা এবং সমাজের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও মঙ্গলজনক সহঅবস্থান ভিত্তিক সামাজিক ন্যায্যতার সমাজ বিনির্মান করা।
গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত পারিভাষিক শব্দ: শব্দগুলোকে সাধারনভাবে সংজ্ঞায়িত না করে আমরা এভাবে বিশ্লেষণ ও ব্যাখা করতে পারি-
ক.বাল্য বিবাহ: বাল্য বিবাহ ও শিশু বিবাহ বলতে আমরা বুঝতে পারি যে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে- মেয়ের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বিবাহ। আমরা জানি আইনগতভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়স ১৮ বছর আবার শারিরিকভাবে যোগ্য হয়ে উঠলে বিশেষ কোন পরিস্থিতি দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে বিবাহ দেয়া যাবে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর তবে ছেলেদের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতি গ্রহনযোগ্য নয়। আমাদের মত উন্নয়ণশীল দেশের দরিদ্র পরিবারে সংখ্যা বেশি বলা হলেও উচ্চবিত্ত পরিবারেও কম নয়। বাল্য বিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি ইহা ছেলে ও মেয়ে উভয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব পরে। সাধারনত মেয়েরাই বাল্য বিবাহের শিকার বেশি হয়। তার অন্যতম কারন হলো- দারিদ্র্যতা,যৌতুক,সামাজিক প্রথা, ধর্মীয় কুসংস্কার, নিরক্ষরতা, বিবাহ না হওয়ার সঙ্কা, মেয়ে সন্তানকে পরিবারের বোঝা মনে করা, দেশের প্রচলিত আইনের ফাক-ফোকর ইত্যাদি।
খ. নারী নির্যাতন: ঘরে বাইরে নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিকতা রয়েছে। ইহা সার্বজনিন ও আন্তর্জাতিক বিষয়। পিতৃতন্ত্র মূলকথা পুরুষের আধিপাত্য ও নারীর অধীনতা,নির্যাতন চালিয়ে এবং নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে পুরুষ নারীকে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে এবং পুরুষের বশ্যতা শিকার করতে বাধ্য করে। পিতৃতন্ত্র তথা
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারী তার অধীনতা না মানলে শারিরিক বা মানসিক ভিন্ন ভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়।
গ. যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা তথা সামাজিক সহিংসতা: সহিংস বা হিং¯্র অপরাধগুলো প্রধানত নারী বা বালিকাদের উপরই করা হয়। এরকম সহিংসতাকে প্রায়ই ঘৃণাপূর্বক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। যা নারী বা বালিকাদের উপর করা হয়। কেননা তাদেরকে অবলা নারী বলা হয়। নারীর প্রতি সামাজিক সহিংসতা দীর্ঘকালের ইতিহাস। সময়ের আবর্তনে নির্যাতনের মাত্রায় ভিন্নতা পেয়েছে। এখন শারিরিক নির্যাতনের পাশাপশি উচ্চবিত্ত পরিবারে মানসিক নির্যাতনের পরিমানও কম নয়। শিশু নির্যাতন,যৌন হয়রানি,ধর্ষন,হত্যা এইসকল কাজ একজন সুস্থ বিবেকবান মানুষ করতে পারে না। মানসিক ভারসাম্যহীন বা বিকারগ্রস্থ মানুষই এইসকল কাজ করতে পারে। এখন এটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিনত হয়েছে।
নারীর প্রতি সামাজিক সহিংসতাকে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এগুলোর মধ্যে ব্যক্তির দ্বারা ও রাষ্ট্রের দ্বারা হইতে পারে। আরো অন্যভাবে হইতে পারে- ব্যক্তির দ্বারা ঘটে যায়-ধর্ষন,হত্যা,গৃহ নির্যাতন, যৌন হয়রানি,প্রজননগত জোর যবরদস্তি, কন্যা শিশু হত্যা,লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালিন সহিংসতা,যৌতুক সহিংসতা বা পণ মৃত্যু, নারী খৎনা,অপহরনমূলক বা জোরপূর্বক বিবাহ ইত্যাদি।
সাহিত্য পর্যালোচনায় বলতে হয়- প্রেম বিদ্রোহ-সাম্য ও নারী জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর অমর বাণী দিয়েই শুরু করতে চাই-’গাহি সাম্যের গান, আমার চোক্ষে পুরুষ রমণী নাই কোন ভেদাভেদ’ এ বিশে^ যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যানকর অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর’। মানিকগঞ্জের সিংগাইর অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্নভাবে রয়েছে জেন্ডার বৈচিত্র্যতা, মানুষ প্রাণ-প্রকৃতি প্রতিবেশের মধ্যে আন্ত:সর্ম্পক ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। শিক্ষা সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যে রয়েছে বিশাল ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এসবকে ছাপিয়ে ধর্মতান্ত্রিক কুসংস্কার,পূজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে সাথে রেখেই চলছে খুন,ধর্ষণ,হত্যা,ইভটিজিং,পরোকিয়া ও বিাবহ বিচ্ছেদসহ নারীর উপর সামাজিক সহিংসতা। সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও গণমাধ্যমের সুবাদে গত কয়েক বছরের নারী নির্যাতন ও বাল্য বিবাহের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা আরো অনেক বিষয় জানতে পারবো। যেমন- গত ১১-১৮ জুলাই ২০০৯ সালের মানিকগঞ্জের বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক ’আলোর বাণী’র প্রতিবেদনে দেখা যায়- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহিলা গার্মেন্ট কর্মীকে ধর্ষণের দায়ে সিরাজুল ইসলাম নামক এক যুবককে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত। ঘটনা ২০০৭ সালের ১৯ মে সিংগাইর উপজেলার বিনোদপুর গ্রামে ঐ দিন রাত ৮ ঘটিকায় মেয়ের বাবার বাড়িতে ধর্ষনের স্বীকার হন স্বমী পরিত্যক্তা গার্মেন্ট কর্মী (২৩), একই উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের যুবক সিরাজুল ইসলাম(৩০) তাকে ধর্ষণ করে। বাদীপক্ষ পরে আদলতে মামলা দায়ের করে এবং সাক্ষপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নারী এবং শিশু নির্যাতন বিশেষ আদালত আসামী সিরাজুল ইসলামকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদন্ডের আদেশ দেন।অন্যদিকে মানিকগঞ্জের বহুল প্রচারিত ’সাপ্তাহিক গণচেতনা’র ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১২ বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়- সিংগাইরে স্ত্রীকে খুন করে স্বামী পারি জমিয়েছে ইরাকে শিরোনামের নিউজে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জামশা গ্রামের দুলাল মিয়া নিজ স্ত্রী সালমা খাতুনকে হত্যা করে বিদেশে পারি জমিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার বিবরনমতে জানা যায়- ৩ পুত্র সন্তানের জননী সিংগাইর উপজেলার দক্ষিণ জামশা গ্রামের সালমা খুন হয় গত বছরের ১৩ জানুয়ারী রাত ১০ টায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো বলেন পুলিশের নিরব ভূমিকায় আমরা হতাশ এবং খুনিরা এখনো ধরাছোয়ার বাইরে বিদেশে গিয়েও তারা অপরাধে যুক্ত হইতে পারে। মানিকগঞ্জের নিয়মিত প্রকাশিত সাপ্তাহিক ’কড়চা’র গত ৯ নভেম্বর ২০০৯ সালে বিশেষ প্রতিবেদনের প্রধান শিরোনাম ’১১ মাস নির্মম নির্যাতনের শিকার জর্ডানে আটক থাকা এক নারী শ্রমিকের দেশে প্রত্যাবর্তন’। ১১ মাস জর্ডানে আটক থাকা নারী শ্রমিক শুক্কুরী বেগম গত মুঙ্গলবার জর্ডানের আম্মান থেকে স্বামী গৃহে ফিরেছেন মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার চরমস্তুল গ্রামের এই নারী শ্রমিক। ১৫ মে ২০১৭ সালে প্রকাশিত মানিকগঞ্জের নিয়মিত প্রকাশিত ‘দৈনিক আল আযান’ পত্রিকার শিরোনামে দেখা যায়- ‘কোট ম্যারিজের নামে বাল্য বিবাহ বন্ধে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা’ মানিকগঞ্জের প্রায় প্রতিটি গ্রামে গঞ্জে প্রতিদিন বিভিন্ন অযুহাতে কোট ম্যারিজের নামে প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে রেজিষ্টশেন করে অসংখ্য নাবালক নারীকে শিশু বিবাহ বা বাল্য বিবাহ দেয়া হচ্ছে। এলাকায় নাবালক মেয়েদের বিবাহ ঠিক হলেই কিছু গ্রাম্য দালাল,মহুরী, আইনজীবি এবং শিক্ষানবিশ আইনজীবিদের মাধ্যমে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে এসে, মাতা কিংবা পিতার হলফনামায় মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে বিবাহ পড়ানোর ঘোষনা দিয়ে দেন। তারপর গ্রাম-গঞ্জে গিয়ে তাদের আত্মীয় স্বজনকে ডেকে দাওয়াতের দিন তারিখ ধার্য্য করে ধুম ধাম করে প্রতিবাদকারি বা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে গ্রাম্য মোল্লা ডেকে কিংবা কাজী এনে কাবিন করে বিবাহ সম্পন্ন করেন। তখন প্রশাসন দেখেও না দে-খার ভান করে থাকে। আবার কেউ কেউ নোটারি পাবলিক অফিসে গিয়ে কোট ম্যারিজের ঘোষনা দিয়ে কাজী ডেকে এনে তাৎক্ষনিক উকিল এবং কাজীর যোগসাজশে ঝট পট কাবিন করে বিবাহ পড়িয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় বলে জানা যায়। খোজ খবর নিয়ে জানা যায় মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার পৌরসভার সকল ওযার্ডের কাজী বা আশেপাশের উপজেলা ও ইউনিয়নের কাজীরা উকিলদের সাথে যোগসাজস করে কোটেপাড়াতে তথা বার লাইব্রেরীতে হরমাশোই এরকম ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তারা বাড়ীতে এসে দিন তারিখ করে গ্রাম্য মোল্লা দিয়ে বিবাহ পড়িয়ে থাকে। যে সকল ক্ষেত্রে বর কনে বার লাইব্রেরীতে আসতে অপারগতা প্রকাশ করে সেই সকল ক্ষেত্রে বর কনের দুটি ছবি ও টিপসহি/দস্তখত টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যম্পে স্বাক্ষর নিয়ে দালালরা নোটারি পাবলিক করিয়ে কোট ম্যারিজের ঘোষনা দিয়ে বাড়িতে গিয়ে ইমাম ডেকে অতি আনন্দে বিবাহ পড়িয়ে দিচ্ছেন। সুতরাং নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে কোট ম্যারিজের নামে বিবাহের সাথে বর কনে,অবিভাবক,কোটপাড়ার দালাল বাটপারসহ জড়িত কাজী ও অসাধু মোল্লাদের দোষী সাবস্থ করে আজ পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক কোন শাস্তি দেয়া হয়নি বলেই হরহামেশাই এগুলো ঘটছে। আবার ক্ষেত্র বিশেষ স্থানীয় চেয়ারম্যানদের দেওয়া জন্ম রেজিষ্টেশন কার্ডের বয়স স্ক্যানের মাধ্যমে নাবালক মেয়েদের বয়স বাড়িয়ে কিংবা পরিবর্তন করে অবাধে অবৈধভাবে বিবাহ রেজিষ্টি করা হচ্ছে বলে জানা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিছু বিজ্ঞ আইনজীবিরা জানান যে-কাজীদের বিবাহ রেজিষ্টশন বই থাকে দুটি। একটি হলো আসল আরএকটি হলো নকল বা দুই নম্বর। আসলে যাদের বয়স ১৮ বছরের উপরে তাদের রেজিষ্টশন ১ নম্বর বইতে আর যাদের বয়স ১৮ বা তারও কম তাদের রেজিষ্টশন হয় ২ নম্বর বইতে। কাজীদের কাছে কোন সময় এই কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ নিয়ে অভিযোগ এলে কাজীরা ঐ ২ নম্বর বই প্রদর্শন করে না। সাম্প্রতিকালে জান্না গ্রামের সপ্তম শ্রেণীতে পড়–য়া আজগর আলীর মেয়ে তানিয়া বেগমের বিবাহ মানিকগঞ্জ নোটারি পাবলিকে গিয়ে কোট ম্যারিজের মাধ্যমে ঘোষনা দিয়ে গ্রামে এসে বিবাহের দিন তারিখ করে ধুম ধামের সহিত হইতে লাগছিলো এমন সময় থানা পুলিশ গোপন খবর পেয়ে অনুষ্ঠানে এসে বিাবহ ভেঙ্গে দিয়ে নোটারি পাবলিকে দেয়া কাগজপত্র নিয়ে যায় এবং এগুলো জব্দ করা হয। বর ও কনের অবিভাবকদের শাস্তি হলেও সহযোগীরা ধরাছোয়ার বাইরেই রয়ে গেলো।
অন্যদিকে গত ১ আগষ্ট ২০১১ মানিকগঞ্জের বহুল প্রচারিত সাপ্তাহিক গণচেতণায় প্রকাশিত সংবাদ শিরোনাম- ’স্কুল ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে কলেজ শিক্ষক এর ৩ মাসের জেল জরিমানা’ গত ২৬ জুলাই ১১ মানিকগঞ্জে স্কুল ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিয়োগে এক কলেজ শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে অভিভাবক ও এলাকাবাসী। বেলা ১০ টার দিকে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার ৮৮ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীকে বেগম জরিনা কলেজর শিক্ষক গোলাম মোস্তফা স্কুলের ছাদে নিয়ে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। এসময় ঐ ছাত্রীর চিৎকারে শিক্ষক ও অভিভাবকরা এগিয়ে এসে ঐ কলেজর শিক্ষককে আটক করে পুলিশে সোর্পদ করেন। এ খবর এলাকায়
ছড়িয়ে পড়লে অভি-ভাবকসহ এলাকাবাসী অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচারের দাবিতে শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও স্থানীয় প্রেসক্লাব চত্ত¡রে সমাবেশ করেন।
গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত তাত্তি¡কতার আলোকে বলতে হয়- পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের মধ্যে জেন্ডার সংবেদশীলতা,জেন্ডার ধারনায়ন জেন্ডার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? নারী-পুরুষে চলমান বৈষম্য দূরকরনে জেন্ডার সাম্যতা,সমতা ও ন্যায্যতা আন্দোলনে যুব সমাজ কি ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজে সকল স্তরে সাংস্কৃতিক চর্চা ও নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে কি ধরনের সম্প্রীতি বিরাজ করে অন্যদিকে এগুলো না থাকলে কি ধরনের অসহিঞ্চতা ও সামাজিক সহিংসতা দেখা দিতে পারে। এই ধারনাগুলো যাছাই বাছাই করে আমরা তাত্তি¡ক ও ব্যবহারিক দিক থেকে একটি নারীবান্ধব সমাজের রুপকল্প নিতে চাই।
গবেষণাটির তাত্তি¡ক ব্যাবহারিক ও ধারনাগত নকশার আলোকে গবেষণাটির মাধ্যমে বারসিক জেন্ডার অসাম্যতার মূল কারণ তথা সমাজে সংস্কৃতি ও চর্চা অভাবের কারণে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বহুত্ববাদী সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলো অভাবের কারণে সমাজে জেন্ডার বৈষম্যের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে-এই সমস্যাগুলো সমাধানে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে মূলত জোর দেওয়া হবে সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে জেন্ডার সাম্যতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি ও শিক্ষা দেওয়া। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যুবশক্তি বা তরুণ ও অন্যান্য সামাজিক শক্তিগুলোকে সম্পৃক্ত করে সমাজ, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীদের অবদানগুলোকে আলোকপাত করে এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে জেন্ডার সম্পর্ক, জেন্ডার বৈষম্যের মূল কারণসমূহ, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং নারী ক্ষমতায়নের অন্য বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে যেখানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করবে। এভাবে এই প্রকল্পটি জেন্ডার সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনয়নে ভূমিকা রাখবে। কারণ এই প্রকল্পে যুব বা তরুণরা (ছেলে ও মেয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা) সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজে নারী সদস্যদের গুরুত্ব ও তাদের অবদানগুলো অনুবাধন করতে সমর্থ হবে। এই প্রকল্পে অংশ-গ্রহণের মাধ্যমে তারা আরো জানতে সমর্থ্য হবে যে, শারীরিক কিছু পার্থক্য ছাড়া নারী ও পুরুষের মধ্যে দৃশত কোন পার্থক্য নেই। নারী ও পুরুষের মধ্যকার কোন পার্থক্য নেই এবং সমাজে নারীদের গুরুত্ব ও অবদান অনুধাবন করে তরুণ বা যুব সম্প্রদায় তাদের প্রত্যাহিক জীবনে নারীকে সম্মান ও গুরুত্ব দিতে শিখবে। সমাজের বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যাতে নারীরা তাদের মতামত প্রদান করতে পারেন সেই সুযোগটা তৈরি করতে তরুণরা সচেষ্ট হবে। এই প্রকল্পে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তরুণরা যা শিখবে তাদের কাজ ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সেই শিক্ষাটা তারা তাদের মতো করে অন্য তরুণ ও মানুষের সাথে সহভাগিতা করবে। অন্যদিকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারী ও যুব বা তরুণ ছাড়াও সমাজের অন্যান্য শ্রেণী ও বয়সের মানুষের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই সব মানুষকে জেন্ডার সমতা, বহুত্ববাদী সমাজ, জেন্ডার ভূমিকা, জেন্ডার বৈষম্য, নারীদের অবদানসহ অন্যান্য বিষয়ে ধারণা দেওয়া হবে। এভাবে সমাজে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে একটি ইতিবাচক ভূমিকা তৈরি হবে। বারসিক বিশ^াস করে সমাজে যদি সাংস্কৃৃতিক চর্চা বিরাজিত হয় এবং বহুত্ববাদী সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলোর চর্চা করা হয় তাহলে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাগুলো এত ব্যাপক হারে সংঘটিত হবে না। তাই এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারী, পুরুষ, যুব এবং সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সমন্বয়ে একটি সক্রিয় ‘পরিবর্তন এজেন্ট’ তৈরি করা হবে। এই ‘পরিবর্তন এজেন্টরা’ সমাজে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও চর্চা বিরাজ করানোর জন্য কাজ করবে। তাদের এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা হ্রাস পাবে। এই গবেষণার মাধ্যমে কর্মএলাকা তথা কমিউনিটি থেকে বাছাই করে ১০০ জন পরিবর্তনকারি অনুঘটকদের সাক্ষাতকার গ্রহন করা হয়েছে। আমরা বিশ^াস করি যে কর্মএলাকায় নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন সংক্রান্ত উদ্যোগ গুলোতে নারীদের পরিস্থিতি ও অবস্থান বিশ্লে¬ষণ করা হবে এবং এই গবেষণাটির মাধ্যমেই কর্ম এলাকায় প্রাণবৈচিত্র্যভিত্তিক জীবিকায়ন প্রক্রিয়ার মান উন্নয়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে, যা অবশেষে জেন্ডার সুবিচার নিশ্চিতকরণে ভূমিকা পালন করবে।
গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত পদ্ধতিগত কৌশলের আলোকে আমরা কেবলমাত্র প্রকল্প এলাকায় থেকে নির্বাচিত ১০০ জন উত্তরদাতার মধ্যে কমিউনিটিতে প্রান্তিক পর্যায়ের নারী নেত্রী ৩০ জন, কিশোর-কিশারি ৩০ জন,সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ২০ জন প্রবীণ ১০ জন। সরকারি প্রতিনিধি ৫ জন, সিংগাইর পৌরসভা ও বায়রা ইউনিয়নের বাইরে থেকে আরো ৫ জন। এই ১০০ জন উত্তরদাতার মধ্যে নারী ৬০ জন ও পুরুষ ৪০ জন কে নিয়ে আমরা নারী-বান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠায় বৈশি^ক মহামারী করোনাকালে পারিবারিক নির্যাতন ও সামাজিক সহিংসতার হার/মাত্রা নিরুপনে সুশীল সমাজ ও প্রান্তিক পর্যাযে নির্ধারিত ১০০টি পরিবারের সাথে গবেষণাধর্মী ১৩ টি প্রশ্নমালার আলোকে সাক্ষাতকার ভিত্তিতে গবেষণা কার্যক্রমটি সম্পন্ন করা হয়।
৪.২. গবেষণা সরঞ্জাম/প্রশ্নমালা প্রণয়ণ মানিকগঞ্জ সিংগাইর উপজেলাধীন বায়রা ইউপি ও সিংগাইর পৌরসভায় বারসিক এর কর্মএলাকার নির্ধারিত ১০০ পরিবারের মধ্যে গবেষণাপত্রটি পুরন করা হয়েছে। প্রশ্নমালাগুলো নি¤œরুপ:
১. (পরিচয় পর্বেই কুশল বিনিময়ে জানতে চাওয়া) মহামারী করোনা সমন্ধে আপনার ধারনা কি?
২. আপনার জীবনে এর আগে কোন মহামারী দেখেছেন? দেখলে তার সমন্ধ্যে কিছু বলুন এবং পার্থক্য নির্নয় করুন।
৩. করোনা ছোয়াছে রোগ বিধায় স্বাস্থ্যবিধিমতে সামাজিক/শারিরিক দূরত্ব বজায় রাখার অনুরোধ করছে। আপনি স্বাস্থ্যবিধি মানেন। মানলে তার ধরন কি এবং কতভাগ মানেন?
৪. আপনার পরিবারে সদস্য কতজন এবং আয়ের উৎস কি? আয় করেন কতজন এবং নির্ভরশীল সদস্য কয়জন?
৫. আপনারা কি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই রোজগার করেন? যদি করেন তাহলে সংসারে ব্যায় প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহনে কার কতটুক স্বাধীনতা এবং করোনাকালে কারো আয়ের উৎস বন্ধ বা বেকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি?
৬. করোনায় আয়ের উৎস চলমান না বিপর্যস্থ্য? যদি আয়ের উৎস বন্ধ বা বেকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে আপনার সংসারে কি ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে?
৭. স্বমী- স্ত্রীর মধ্যে যে কেউ প্রবাস/দূরে চাকরি/ঘরে থেকেও ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি/ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে স্ব-স্ব কাজ থাকতেই পারে? করোনার লকডাউনে অনাঙ্কিতভাবে উভয়ের ঘরমুখী জীবন কেমন কাটছে?
৮. করোনার আগে স্ত্রী-পুত্রকে শতভাগ সময় দিতে পারতেন? না পারলে এখন কি দিতে পারছেন? আপনার স্ত্রী-পুত্র আপনার প্রতি করোনা আগে ও করোনাকালীন সময়ে সন্তুষ্ঠির হার বলুন?
৯. করোনার আগে মাসে কতবার পারিবারিক ঝগড়া,কথাকাটাকাটি,হাতাহাতি কতবার হয়েছে? যদি হয়ে থাকে তাহলে করোনাকালীন সময়ে এর মাত্রা হ্রাস পেয়েছে না বৃদ্ব্যি পেয়েছে।
১০. করোনার আগে আপনার পারিবারিক ও আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক,সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য কেমন ছিল? এবং করোনাকালীন সময়ে এই সম্পর্কের উন্নতি না অবনতি হয়েছে?
১১. আপনি কি মনে করেন নারীরা সাধারনত সংসারী ও সঞ্চয়ী হয় ? আপনি কি পারিবারিক সঞ্চয় করেছেন? করলে দুর্যোগকালীন সময়ে সঞ্চিত অর্থ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয় কি? হলে কতবার হয়েছে এবং তার ধরন কি?
১২. আপনি কি মনে করেন সামাজিক সহিংসতা যেমন- হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বিবাহ বিচ্ছেদ, বাল্য বিবাহ,যৌতুক, ইফটিজিং ইত্যাদি আগের চেয়ে করোনাকালে বৃদ্ব্যি/ হ্রাস পেয়েছে?
১৩. সামাজিক সহিংসতার হার করোনাকালে হ্রাস/বৃদ্ব্যি পেলে কেন হচ্ছে? সহিংসতা সমাধানে আপনার যৌক্তিক প্রস্তাবনা তুলে ধরুন?
উত্তরদাতা ও নমুনায়ণ পদ্ধতিসমুহ পর্যাক্রমিক প্রশ্নের আলোকে সংক্ষেপে নি¤েœ ব্যাখা করা হলো ১ নং প্রশ্নের আলোকে-সিংগাইর সদর ইউনিয়নের গোবিন্দল গ্রামের হাফেজ মাওলানা শহিদুল ইসলাম বলেন- করোনা আছে সত্য ঘটনা। কত মানুষ মারা যাচ্ছে,সর্দি ,কাশি স্বাসকষ্ট,হাপানি জ¦র ইত্যাদি দিয়ে লক্ষণ নিয়ে শুরু হয় এই করোনা ভাইরাস। এখনো কার্যকরি কোন ভ্যাকসিন বের হয়নি। তাই সচেতনতাই একমাত্র পথ বা উপায়। বায়রা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাজমিন আক্তার বলেন সর্দি-কাশি, শাসকষ্ট ও জ¦রই হচ্ছে করোনা। এই করোনার কোন ওষুধ বের হয়নি। করোনা থেকে বাঁচতে হলে সাবান দিয়ে হাত ধুইতে হবে। মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।সকলকে সচেতন থাকতে হবে। পারভিন আক্তার এর মতে – সর্দি, কাশি, ঠান্ডা, জ¦র বৃদ্ধি পাওয়াই হচ্ছে করোনার প্রধান লক্ষন। লক্ষনগুলো যাতে আমাদের শরিরে না দেখা দেয় সে জন্য সচেতন থাকতে হবে। আবার এই ভাইরাস নাকি নাক, মুখ, হাত,বা চুলের ভেতর দিয়েও প্রবেশ করে তাই বাইরে গেলে মাস্ক পরতে হবে। ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুইতে হবে। সাথী আক্তার বলেন-সর্দি,কাশি হলো এসব হলো করোনার রোগের লক্ষন,সাথে জ¦রও রয়েছে আস্তে আস্তে জ¦র বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৪ দিন গলায় আটকে থাকে এই ভাইরাস। এ সময় যদি গলা থেকেই জীবানু দমন করা যায় তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তি বেঁচে যাবে। পরে যদি ফুসফুসে চলে যায় তাহলে মৃত্যু ঝুঁিক বেড়ে যায়। বয়স্করা আক্রান্ত হচ্ছে এ ভাইরাস। তবে এই ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। শহিদ রফিক যুব সেচ্ছাসেবক টিমের সদস্য মো.মাসুদ রানা বলেন- সর্দি,কাশি,জ¦র,গলাব্যাথা এসব থেকে শুরু হচ্ছে করোনা। করোনা ভাইরাসের কোন কার্যকরি ভ্যাকসিন বের হয়নি। করোনার আরেক নাম কোভিড-১৯। করোনার কারনে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। সারা বিশ^ আজ আতংকিত এই করোনা ভাইরাস নিয়ে। তবে আমাদের দেশে করোনায় মৃত্যু তুলনামুলকভাবে কম। করোনার যেহেতু কার্যকরি ভ্যাকসিন বের হয়নি তাই সকলকে সাবধানতা অবলম্ভব করতে হবে। সামাজিক/শাররিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। কোন কিছু ধরার আগে বা পরে সাবান অথবা স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। গৃহিনী জাবেদা বেগম বলেন-সর্দি,কাশি,জ¦র,শ^াস কষ্ট থেকেই নাকি করোনা হচ্ছে। এর জন্য আমাদের ঘরে থাকতে হবে। আলীনগর নারী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি ফুলজান বেগম বলেন-করোনা তো বেড়েই চলেছে থামছে না,আর কবে যে কমবে বুঝতে পারছি না। টিভি খুললেই মরার খবর,এমন মরার মিছিলের খবর আর কখনো শুনিনী। বিধাতা যেন এমন মৃত্যু কাউকে আর না দেয়। করোনায় সবদিকেই আমাদের মাইরা গেলো। মানুষে মানুষে দুরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে এটা আর জোড়া লাগবো কিনা জানিনা। সমাজের মানুষও বেশি বাইরা গেছে তাই এটি বিধাতার গজব কইলেও ভুল হবেনা। ধলেশ^রী যুব সংঘের সদস্য সাকিব খান বলেন- করোনা একটি ছোয়াছে ভাইরাস,হাতের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। এই ভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। এর কোন ভ্যাকসিন বের হয়নি এবং কবে বের হবে কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। সর্দি-কাশি, শাসকষ্ট দিয়ে শুরু হয় নিউমোনিয়া নিয়ে মারা যায়। স্কুল শিক্ষার্থী সাথী আক্তার এর মতে সর্দি-কাশি,জ¦র,শ^াসকষ্ট হলে নাকি করোনা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, আবার নাকি করোনায় স্ট্রোকও করছে। করোনায় বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের মৃত্যু ঝুঁকিও বেশি কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। করোনা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের অধিক সচেতন হইতে হবে।
২নং প্রশ্নের আলোকে উত্তরদাতাদের মধ্যে ইউপি সদস্য নাছরিন আক্তার বলেন আমার এক আত্মীয় বড় কাকা দেবেন্দ্র কলেজে পড়াশুনা করত। তার কলেরা হয় এবং ছোট ভাই কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তিনি আরো বলেন তার বান্ধবীর মা-বাবা দুজনই কলেরায় আক্রান্ত হয়, মা মারা যাওয়ার ২ ঘন্টা পর বাবাও কলেরায় মারা যায়। আমার নিজের শ্বাশুড়ী অন্ত:স্বত্তা অবস্থায় কলেরায় মারা যান। এছাড়াও তিনি জলবসন্ত, ৮৮ বন্যা,৯৮ বন্যা প্রভৃতি দেখেছেন,কলেরা মুলত খোলা পায়খানা, অপরিস্কার পানি ব্যবহার ও খাওয়ার মাধ্যমে ছড়িয়েছে এবং বন্যায় অনেক মানুষ না খেয়ে মারা গেছে। পাছপাড়ার রোকেয়া বেগম(৮০) বলেন, আমি কলেরা রোগের সময় বিয়ে হয়ে এখানে আসি,পাশের এলাকা নয়াবাড়ির একপরিবারের সবাই মারা যায় এই কলেরায়, তারমতে কলেরার চাইতে করোনা বেশি ভয়ংকর । অধ্যাপক বেনীমাধব সরকার বলেন কলেরা হতো কার্তিক মাসে যখন বন্যার পানি নেমে যেত। এটি ছিল একটি পানিবাহিত রোগ। ্এটি এলাকাভিত্তিক রোগ ছিল,কিন্তু করোনা হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি যা হাচিঁ-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, প্রতি ১০০ বছর পর পর মহামারী হয়। নিলটেক গ্রামের আম্বিয়া বেগম বলেন কলোরা, বসন্ত করোনার মত নয় এটি ছোয়াছে না। সিকান্দার সিকদার বলেন কলেরা-বসন্ত দেখেছি কিন্তু এগুলো করোনার মতে নয়।
৩নং প্রশ্নের আলোকে: করোনা একটি ছোয়াচে রোগ, এগুলো হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, সংক্রামকমূলক ব্যাধি, হাঁচি-কাশির সময় রুমাল বা হাতের কুনই ব্যবহার করি। কোথাও গেলে মাস্ক ও হ্যান্ডগøাভস ব্যবহার করি। নাকে-মুখে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকি। বার বার সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে জীবানু মুক্ত করি। করোনার জন্য কোথাও বের হই না। ৩ মাস যাবত কোন আতœীয় বাড়ি যাই না,রাস্তায় বের হই না। বাইরে গেলে বোরখা পড়ে বের হই,বাড়িতে কাজ করার আগে-পরে সাবান দিয়ে হাত ধুই। পাড়ায় যাইনা গল্প করতে,বাড়ির কাউকে পাড়ায় যেতে দেই না। বেশি বেশি গরম পানি খাই,কোন জিনিস ধরার আগে-পরে সাবান ব্যবহার করি। ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করি। গরু- ছাগল, হাঁস-মুরগী স্পর্শ করলে যত দ্রæত সম্ভব সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেই। যতটা পারি সামাজিক ও শারীরিক দুরত্ব মেনে চলছি। ছোট বাচ্চাদের বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়াচ্ছি। যানবাহনে যাতায়াতের পর বাড়িতে এসে যতদ্রুত সম্ভব গোসল করে নিচ্ছি। পরিহিত জামা কাপড় ডেটল, স্যাভলন দিয়ে ভাল করে পরিস্কার করছি।আদা,লবঙ্গ, লেবু দিয়ে চা ও গরম পানি বেশি করে খাচ্ছি। ৮০ বছর বয়সী রোকেয়া বেগম বলেন নাতনীরা বাড়ির বাইরে বের হতে দেয় না, খালি কয় বুড়ো মানুষের বেশি করোনা হইতেছে। গোলড়া আশ্রায়ন প্রকল্পের সাজেদা বেগম(৫২) বলেন আমরা বেশি বেশি শাক-সবজি খাই. পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করি,৩ ফুট দুরূত্ব বজায় রাখি। অন্যরা বলেন প্রায় ২০ সেকেন্ড সময় ধরে হাত ধুই, ভিটামিনযুক্ত দেশীয় ফল খাই যেমন, পেয়ারা-আমড়া যাতে করে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। অধ্যাপক বেনীমাধব সরকার( বাংলা বিভাগ) বলেন উপরোক্ত সবকিছু করার পাশাপাশি বাড়ির উঠান আশ-পাশে বিøচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করি।।আঙ্গারিয়া গ্রামের সবিতা রানী সরকার বলেন বাড়ির চাষকৃত শাক-সবজি বেশি খাই।যাদের বাড়িতে বিদেশ থেকে লোক আসছে সেই বাড়িতে যাই না। আজিমপুর গ্রামের রাশেদা বেগম বলেন শরীরে রোদ লাগায় বেশি করে। রোদে ভিটামিন “ডি” বেশি থাকে। বক্তাদের বক্তব্যের আলোকে তারা প্রায় ৭০% স্বাস্থ্যবিধি মানার চেষ্টা করেন।
৪ নং প্রশ্নের আলোকে ১০০ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৮৮ জনই একক পরিবার এবং মাত্র ১২ জন যৌথ পরিবারের সদস্য। এর মধ্যে ২৬ জন প্রবাসে, ৮ জন সরকারি চাকরিজীবি, ১৪ জন গার্মেন্টস কর্মী, বাকিগুলো গৃহকর্মী। অর্থাৎ কেউ বসে নেই ঘরে বাইরে পরিবারের উন্নয়নে স্বামী স্ত্রী নিরলসভাবে কাজ করলেও বেশিরভাগ ছেলেমেয়েরা বেকার ও নির্ভরশীল নাগরিক।
৫নং প্রশ্নের আলোকে উত্তরদাতদের মধ্যে বাইমাইল গ্রামের শুভা আক্তার বলেন তার স্বামীই আয় করেন, তাই টাকা-পয়সা খরচের ক্ষেত্রে ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে আমার কোন স¦াধীনতা নেই, এমনকি খাবারও স্বামীর পছন্দ অনুযায়ী খেতে হয়। অন্যান্য বক্তারা বলেন,তাদের স্বামী সংসারে আয় করেন তাদের যতটুকু প্রয়োজন তা দেন,খরচ করার হলে তার অনুমতি নিয়ে তারপর করতে হয়। আমাদের হাতে কোন টাকা-পয়সা থাকে না, যে আয় করে সেই মতামত ও সিদ্ধান্ত নেয়,তার কথাই মানতে হয়। পাঁছপাড়া গ্রামের শাহজাহান মিয়া বলেন আমি নিজে আয় করি এবং আমার স্ত্রী আমার মতামত অনুযায়ী চলেন। আবার অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে সুজন রানা,নাজমুন নাহার,মমতাজ বেগম,মনেকা বেগম, সিকান্দার সিকদার,রেখারানী দাস প্রমুখ বলেন আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলেই সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেই। টাকা-পয়সা খরচের ক্ষেত্রে আমরা একসাথেই সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। বক্তাদের বক্তব্যের আলোকে ৬০% দুজনই মতামত ও সিদ্ধান্ত নেয় , ৩০% স্বামীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খরচ করে এবং বাকি ১০% নিজেদের খরচ করার স্বাধীনতা রয়েছে।
৬ নং প্রশ্নের আলোকে আলীনগর গ্রামের পারভীন আক্তার এবং বাইমাইল গ্রামের শুভা আক্তার বলেন আমার স্বামী বিদেশ থাকেন। করোনার কারণে বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতে না পারায় তিন মাস যাবৎ জমানো টাকা খরচ করছি। এভাবে আর কয় দিন চলবো। বিদেশে তার অবস্থাও ভালো না। যখন থেকে করোনা শুরু তখন থেকে বেতন বন্ধ। বেকা হওয়া আরো প্রবাসীর পরিবার বলেন। কোম্পানি থেকে অনেককেই দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে । সেই সাথে অনেকের দীর্ঘদিন বেতন বন্ধ থাকায় বাড়িতে চলে আসছেন। যুব সংগঠনের মাসুদ রানা বলেন আমাদের ৮০ হাজার টাকা করে যাবে সে রকম ৫ টি গরুর নায্য দাম পাইনি,গরু প্রতি ১০ হাজার করে কম পেয়েছি। প্রতি বছর সাংসারিক যে আয় হয় তা থেকে পিছিয়ে গেলাম ৫ বৎসর। চারাভাঙ্গা গ্রামের সুন্দরী বেগম ও হাওয়া আক্তার বলেন ব্যবসায়ের টাকা দিয়ে আমাদের সংসার চলে কিন্তু করোনার জন্য আমাদের ব্যবসাও বন্ধ আছে, আমাদের একেক পরিবারে ১০-১২ জন করে লোক আছে । বক্তাদের অনেকেই বলেন করোনায় তাদের স্বামী-সন্তান চাকুরি হারিয়ে বেকারত্বের শিকার হয়েছেন। তখন এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য তাদের জমানো টাকা খরচ কওে, ধার-দেনা করে, ত্রাণ সহায়তাও কুড়িয়েছেন। করোনার ফলে পরিবারে কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে যেমন,ঝগড়া-বিবাদ, খাবার-দাবারে অসুবিধা,থাকার জায়গার অসুবিধা, আর্থিক সংকট প্রভৃতি ।
৭ নং প্রশ্নের আলোকে : আঙ্গারিয়া গ্রামের তাপসী সরকার ও বিনোদপুর গ্রামের হালিমা বেগম বলেন স্বামী ব্যবসা করেন ঢাকায় কিন্তু করোনার জন্য তিনি বাড়িতে চলে আসেন, এতে করে কিছুটা ভাল লাগলেও যেহেতু পুরুষ মানুষের শক্তি হচ্ছে টাকা, তাই টাকা না থাকায় পারিবারিকভাবে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। অন্যান্য বক্তারা বলেন অনেকের স্বামী বাড়ি থেকেই কাজ করছে কিন্তু আগে কাজ করতো বিধায় সবসময় বাড়ি থাকতে পারতো না। এখন পরিবারকে সময় দিতে পারলেও টাকার অভাবে সংসার কি করে চলবে এই ভাবনায় থাকে সবসময়। নিলটেক গ্রামের নাছিমা বেগম বলেন আমার স্বামী আগে সৌদি ছিল কিন্তু করোনার সময় বেতন না পাওয়ায় বাড়িতে চলে আসেন। আগে দেশের বাহিরে ছিল বিধায় ফোনে কথা হতো কিন্তু বাড়িতে আসার পর ছোট-খাট বিষয় নিয়ে নানান সময় ঝগড়া হচ্ছে। বায়রা কলেজের অধ্যাপিকা নাজমুন নাহার বলেন আগে আমি এবং আমার স্বামী বাইরে কাজ করতাম পরিবারকে সময় দিতে পারতাম না কিন্তু করোনা লকডাউনে আমরা সবাই একসাথে আছি ,একে অপরকে সময় দিতে পারছি ,সময় ভালই কাটছে আমাদের। উপরোক্ত বক্তাদের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে করোনায় সবাইকে ঘরমুখী করলেও আর্থিক সংকটে ভুগছে প্রায় মানুষ।
৮ নং প্রশ্নের আলোকে-শহীদ রফিক যুব স্বেচ্ছাসেবক টিমের সদস্য মাসুদ রানা ও বায়রা গ্রামের মায়দা জেরিন রুনা বলেন করোনায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালই আছি। এক সাথে আছি তবে এই ভাল থাকাটা পরিপূর্ন না,করোনা আমাদের সবাইকে ঘরবন্ধি করে দিয়েছে এটা আসলে কোন সন্তুষ্টি না। গোলড়া আশ্রায়ন প্রকল্পের শাজেদা বেগম,করিমন বেগম ,আজিমপুর গ্রামের হালিমা বেগম বলেন আগে স্বামী বাইরে কাজ করতো কিন্তু করোনার লকডাউনে কাজ হারিয়ে বাড়িতেই রয়েছে, বাচ্চাদের সময় দিতে পারলেও কারোর মনেই শান্তি নেই। সকাল হলে খাবো কি? এই ভাবনা সবসময়। আজিমপুর গ্রামের হামিদা বেগম বলেন স্বামী আগে গাড়ি চালাতো বাচ্চাদের এতো সময় দিতে পারতো না , কিন্তু লকডাউনে কাজ বন্ধ থাকায় সন্তানদের সময় দিতে পারলেও আর্থিক সংকটটা রয়েছে। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে ৫৫% লোক সন্তুষ্টিতে থাকলেও আর্থিক সংকট রয়েছে, বাকি ৩৫% সন্তুষ্টি রয়েছে এবং বাকি ১৫% এর সন্তুষ্টির হার আগের মতই।
৯ নং প্রশ্নের আলোকে গোলড়া আশ্রায়ন প্রকল্পের সুলতানা বেগম ও নিরটেক গ্রামের রেজিয়া বেগম বলেন পুরুষ মানুষের শক্তিই হচ্ছে টাকা, তাই মাঝে মাঝে ঝগড়া-বিবাদ হয় কিন্তু হাতাহাতি কখনও হয় না। আঙ্গারিয়া গ্রামের বন্যা মন্ডল বলেন আগে ঝগড়া হলেও গায়ে হাত তুলতো না কিন্তু এখন ঝগড়ার সাথে সাথে হাতাহাতি হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে প্রায় পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ বেড়েছে কিন্তু হাতাহাতি তুলনামুলকভাবে কম। বিভিন্ন সময় নানান ছোট-খাট বিষয় নিয়ে ঝগড়ার সৃষ্টি হচ্ছে, সন্দেহ বেড়েছে।উপরোক্ত বক্তাদের আলোচনার প্রেক্ষিতে দেখা যায় ৬৫% ঝগড়া-বিবাদ হয়েছে কিন্তু হাতাহাতি হয়নি, ১৫% ঝগড়ার সাথে সাথে শারীরিক নিযার্তন হয়েছে,বাকি ২০% মতামত নেই।
১০ নং প্রশ্নের আলোকে উত্তরদাতাদের মধ্যে প্রায় ৯৭% লোক বলেন করোনার পূর্ববর্তী সময়ে আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্ক ভালই ছিল। একে-অপরের বাড়িতে যাওয়া হতো ,আড্ডা দেওয়া হতো,বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। কিন্তু করোনার কারনে আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে ,একে-অপরের বাড়িতে আসা-যাওয়ার বন্ধ করা হয়েছে। আগে মোবাইল ফোনে খবরাখবর নিলেও শারীরিক ভাবে যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন শুধুমাত্র মোবাইলে কথা হয়। এতে করে আত্মীয়-স্বজনদের সাথে ক্রমেই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।
১১ নং প্রশ্নের আলোকে উত্তর প্রদানকারী নারী-পুরুষ প্রায় সকলেই বলেন নারীরা সাধারানত সঞ্চয়ী হয়, কিন্তু এই টাকা খরচে নারীদের পূর্ন স্বাধীনতা থাকে না। বিনোদপুর গ্রামের নাজমা বেগম,ঋষিপাড়া গ্রামের রিনা মনিদাস,সুনীতা রানী দাস বলেন আমাদের সঞ্চিত অর্থ করোনাকালীন সময়ে স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হয়েছে। সঞ্চয় ভাঙ্গার পরও সেই অর্থ নিজের জন্য ব্যয় করতে পারি না। কারো কারোর মতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই সঞ্চয় করেন কিন্তু খরচ করার সর্ম্পূণ ভুমিকা স্বামীর হাতেই।
১২নং প্রশ্নের আলোকে উত্তরদাতাদের মতে করোনাকালীন সময়ে বাল্যবিবাহ,বিবাহ বিচ্ছেদ, পরকীয়া ,হত্যা,ধর্ষণ বেড়েছে। করোনার কারণে এসব প্রকাশ পাচ্ছে না। বাল্য বিবাহ গুলো হচ্ছে গোপনে গোপনে। সব মিলিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে।
১৩ নং প্রশ্নের আলোকে মুলত টাকার অভাব। টাকার অভাবের কারণেই সব চাইতে বেশি অশান্তি হচ্ছে,তাই আমার মতে যারা বেকার তাদের কাজের ব্যাবস্থা করা দরকার। আবার কেউ কেউ বলেন কাজ নাই সারা দিন কি করবে,এই জন্য বউয়ের সাথে ঝগড়া হয়। অলস ব্রেইন শয়তানের কারখানা। করোনার কারণে কোন কাজ নাই তাই এমন হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মিলে মিশে কোন না কোন কাজ করলেও ছেলেমেয়েরা বেকার ও লেখাপড়ায় মনযোগী নেই বললেই চলে।
গবেষণা প্রতিবেদনের সম্পাদনা ও মূল্যায়নে আমরা আরো দেখতে পাই – করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর বারসিক মানিকগঞ্জ রিসোর্স সেন্টার এর উদ্যোগে করোনার বহুমাত্রিক প্রভাব নিয়ে মানিকগঞ্জে
সিংগাইর উপজেলায় সিংগাইর পৌরসভা ও বায়রা ইউনিয়ন ১৬টি গ্রামে মূলত মোট ৯০ জন মানুষের কাছ থেকে প্রশ্নমালার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই উত্তর দাতার মধ্যে ১৫জন পুরুষ ্এবং ৭৫জন নারী। এদের মধ্যে শিক্ষকতা পেশায় ৩ জন জনপ্রতিনিধি ৪জন,সরকারি প্রতিনিধি ২জন,ইমাম ও পুরোহিত ২জন, ৩১ জন শিক্ষার্থী,সাংস্কৃতিক কর্মী ২জন, গৃহিনী ৪৬ জন। তাছাড়া পরিদর্শণ, এফজিডি, কেস স্টাডি, পত্রিকার তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরী করো হয়েছে। গবেষণার উদ্দেশ্য হলো করোনা কালীন সংকটের বহুমাত্রিক সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা বিশেষ করে পরিবার ও সমাজে নারী ও পুরুষের অবস্থা এবং অবস্থান বিশ্লেষণ করাই এই গবেষণার উদ্দেশ্য।
উত্তরদাতাদের কাছে জানতে চওয়া হয়েছিল করোনা মহাদুর্যোগের মতো তার জীবনে অন্য কোন দুর্যোগ তারা দেখেছেন কিনা। উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগ উত্তরদাতা হ্যা সুচক জবাব দিয়েছেন এবং বাকী ৬০ ভাগ উত্তর দাতা না সুচক উত্তর দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা এর আগে অন্য কোন দুর্যোগ দেখেননি। অনুরুপ ভাবে যারা এর আগে দুর্যোগ দেখেছেন তাদের মধ্যে সর্বোচ্ছ ৩৬ জন উত্তরদাতা বন্যাকে দুর্যোগ হিসেবে বলেছেন এবং সর্বনি¤œ ৬ জন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আরো দেখানো হয়েছে বিগত সময়ের দুর্যোগের সময়ে সর্বোচ্ছ ৩৬ ভাগ মানুষের আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। ৩০ ভাগ নারী নির্যাতিত হয়েছিল, মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিল ২৭ ভাগ মানুষ, সর্ব নি¤œ গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল ১৩ ভাগ মানুষ। করোনা ছোয়াছে রোগ বিধায় স্বাস্থ্যবিধিমতে সামাজিক/শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষত্রে উত্তরদাতারা বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রদান করেছেন। তাদের মধ্যে শতভাগ উত্তরদাতা হ্যা সূচক উত্তর দিয়েছেন অর্থাৎ করোনা শুরুর প্রথম থেকেই সবাই স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে মাস্ক পরেছেন সর্বোচ্ছ ৯০ জন, দুরত্ব মেনে চলেছেন ৭৪ জন, সাবান দিয়ে ঘনঘন হাত ধুয়েছেন ৮৭ জন,সাবান ও মাস্ক উভয়ই ব্যবহার করেছেন ৭৯ জন, কোন জায়গায় বের হননি বা আত্মীয়দের বাড়িতে যাননি ৭২ জন, চোখ নাখ, মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত ছিলেন ২৭ জন, একত্রিত হয়ে গল্প করা কমেছে বলে মন্তব্য করেছেন ২১ জন, গরম পানি খেয়েছেন ৬৯ জন, স্যানিটাইজার ব্যবহার করেছেন ২৩ জন,পশু-পাখির স্পর্শ করা থেকে বিরত ছিলেন ১৩ জন, বাহির থেকে বাড়িতে আসলে সাথে সাথে গোসল করেছেন ৪৯ জন, হ্যান্ড গøাভ ব্যবহার করেছেন ১০ জন, হাঁচি-কাশির সময় রুমাল ব্যবহার করেছেন ৪৫ জন, হাঁচি-কাশির সময় হাতের কণুই ব্যবহার করেছেন ২৪ জন, প্রচুর পরিমান শাক-সবজি খেয়েছেন ৩৩ জন, পরিস্কার পরিছন্ন ছিলেন ৩২ জন। অর্থাৎ প্রায় সকল উত্তরদাতা গ্রামে বসবাস করলেও সবাই সরকারী স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেছেন যা অত্যান্ত শুভ লক্ষন বা সচেতনতা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।করোনা কালীন সংকটের সময় সংসারের ব্যয় নির্বাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সর্বোচ্ছ ৬৩ ভাগ উত্তর দাতা বলেছেন স্বামী সকল ব্যয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সর্বনি¤œ ৪ ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন স্ত্রী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং উভয়ে মিলে সংসারের ব্যয় সিন্ধান্ত নেন ৩৩ ভাগ মানুষ। করোনার কারণে কাজ হারিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে হ্যা সূচক জবাব দিয়েছে ৮৬ ভাগ মানুষ এবং না সুচক উত্তর দিয়েছেন ১৩ ভাগ মানুষ এবং বাকী ১৯ ভাগ মানুষ কোন মতামত দেন নাই।
করোনার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আয় কমে গেছে বলেছেন ৬২ জন মানুষের,কম খাদ্য গ্রহণ করতে হচ্ছে ৩০ জন মানুষের,নারী মতামত দেওয়ার ক্ষমতা কমে গেছে বলেছেন ২৯ জন, নারী নির্যাতন বেড়ে গেছে বলেছেন ২৫ জন উত্তরদাতা,বাল্য বিবাহ বেড়ে যাবে বলেছেন ৯ জন উত্তর দাতা, সংসার ভেঙ্গে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে বলেছেন ৮ জন উত্তরদাতা, বেশী সন্তান জন্ম নিতে পারে বলেছেন ৭ জন উত্তরদাতা, পারস্পারিক অবিশ^াসের সৃষ্টি হতে পারে বলেছেন ৭ জন উত্তরদাতা এবং তেমন কিছুই হবে না বলেছেন ২ জন উত্তরদাতা। করোনাকালে সংসারের সদস্যদের দীর্ঘসময় একত্রিত থাকায় সবাই খুশী কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে শতকরা ৪৭ ভাগ মানুষ খুশী বলে মতামত দিয়েছেন। খুশি না হওয়া মানুষের সংখ্যা শতকরা ৩৮ ভাগ এবং ১৫ ভাগ মানুষ কোন প্রকার উত্তর দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।
করোনার মহা নিদানকালে নারী নির্যাতনের হার করোনার আগের মাসে কতবার পারিবারিক ঝগড়া,কথাকাটাকাটি,হাতাহাতি কতবার হয়েছে? যদি হয়ে থাকে তাহলে করোনাকালীন সময়ে এর মাত্রা হ্রাস পেয়েছে না বৃদ্ব্যি পেয়েছে। এই প্রশ্নে উত্তরে উত্তরদাতারা বিভিন্ন জন বিভিন্ন ধরণের উত্তর দিয়েছেন। উত্তরদাতাদের ৩৮ ভাগ বলেছেন করোনা কালীন সময়ে নারী নির্যাতন বেড়েছে এবং ৩৪ ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন নারী নির্যাতন কমেছে এবং এই বিষয়ে পারিবারিক কারণে কোন মতামত দেন নাই ২৮ ভাগ মানুষ। আমাদের গ্রামীন সমাজে নারীরা সাধারনত সংসারী ও সঞ্চয়ী হয়। তারা পরিবারের যে কোন দুর্দিনের জন্য সঞ্চয় করেন। করোনা কালীন সময়ে নারীরা সঞ্চয় করেন কিনা, প্রশ্নমালা জরিপের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হলে ২৮ ভাগ উত্তর দাতা হ্যা সূচক উত্তর দেন, না সূচক উত্তর দেন ৩১ ভাগ মানুষ। আবার সঞ্চয় করেন নাই ১৮ ভাগ মানুষ এবং সঞ্চয় বিষয়ে মতামত দেন নাই ২৩ ভাগ মানুষ। করোনাকালে হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বিবাহ বিচ্ছেদ, বাল্য বিবাহ,যৌতুক, ইফটিজিং বৃদ্ধি পেয়েছে কিনা জানতে চাওয়া হলে ৭৮ জন উত্তরদাতা হ্যাঁ সুচক উত্তর দেন। করোনাকলো নারী নির্যাতনের বিষয়ে না সূচক উত্তর দেন ২১ ভাগ মানুষ এবং কোন ধরনের উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন ১ ভাগ মানুষ।
করোনা কালে নারী নির্যাতনসহ সামাজিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় করোনা কালে নারী নির্যাতনসহ সামাজিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে উত্তরদাতার বিভিন্ন ধরণের মতামত দিয়েছেন। এদের মধ্যে ৫৬ জন উত্তরদাতা বলেছেন পরিবারে নারীর অবস্থান দুর্বল হওয়ার কারণে নারীরা পরিবারে এবং সমাজে নির্যাতিত হন। ৬৩ জন উত্তর দাতা বলেছেন নারীরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে তারা নির্যাতিত হন। ৫৬ ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন এই সমাজ এখনও পুরুষ শাষিত হওয়ার জন্য নারীরা এখন ভাল অবস্থায় নেই। সমাজ ও পরিবারে মূল্যবোধের অভাবের কথা বলেছেন ৪ জন উত্তর দাতা,বেকারত্ব বাড়ার কথা বলেছেন ৪৮ ভাগ মানুষ এবং প্রযুক্তিগত আসক্তি ৪৮ ভাগ মানুষের কারণে নারী নির্যাতিত হন।
করোনাকালে পারিবারিক এবং সামাজিক সহিংসতা কমানোর জন্য যা করা উচিত বলে উত্তরদাতারা মনে করেন: করোনা কালে সামাজিক সহিংসতা কমানোর জন্য অনেক কিছু করা উচিত বলে উত্তরদাতারা মনে করেন। তাদের মধ্যে ৫৮ জন উত্তরদাতা বলেছেন পরিবারের নারী ও পুরুষদের আরো সচেতন হতে হবে, ৫১ জন উত্তরদাতা বলেছেন নারী ও পুরুষের কাজকে সমান ভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, মোট ৬৫ জন উত্তরদাতা বলেছেন নারী নির্যাতন বন্ধ করার জন্য কঠিন আইন তৈরী করতে হবে। সরকারী-বেসরকারী ভাবে আরো সচেতনামূলক কাজ করতে হবে এই মতামত দিয়েছেন ৪১ জন উত্তরদাতা। আবার নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা বলেছেন ৬৮ জন উত্তরদাতা, আউট সোর্সিং আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরীর জন্য মতামত দিয়েছেন ৮ জন উত্তরদাতা। নারী নির্যাতন কমানোর জন্য পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকার কথা বলেছেন অনেকেই।এর মধ্যে ৩ জন উত্তরদাতা বলেছেন পরিবার যদি মেয়েদেরকে পরিবারে বোঝা মনে না করেন তবে নারী নির্যাতন অনেক কমে যাবে।
অন্যদিকে করোনাকালীন সময়ে মানিকগঞ্জ সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব রুনা লায়লা বলেন- বাল্য বিবাহসহ নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের আলাদা বিভাগ ও অধিদপ্তর রয়েছে, জনস্বার্থে ১০৯ টোল ফি করা হয়েছে। এছারাও আমাদের সহযোগী হিসেবে এনজিও প্রতিষ্ঠানসহ সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো নারীবান্ধব সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করছে। শত বাধা পেরিয়ে দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে। আমরা বিশ^াস করি আঁধার ঘুচিয়ে নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসেই সমাজকে আলোকিত হবে। সিংগাইর থানার নারী ও শিশু বিষয়ক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো.মনিরুজ্জামান বলেন- করোনাকালীন ভয়ের মধ্যেও আমরা বাল্য বিবাহ,নারী ও শিশু নির্যাতনের খবর পেয়েছি। আমরা আসলে অবিভাবকসহ সবাইকে সোজা মনে হয়,তারপর সবাই আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আমাদে দেশে পুলিশী পাহারায় অপরাধ হ্রাস করা যায় গেলেও দূর করা সম্ভব নয়। তাই সবাই মিলে অপরাধের বিরুদ্ধে ও অধিকারের পক্ষে সোচ্চার ভ‚মিকা ও প্রচারন-ার কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button