
আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিভক্তি ও তার প্রভাব :
১৯৫৮ সালে অক্টোবর মাসে সামরিক শাসন জারি হলো। সামরিক শাসন জারির পর পার্টির যশোর জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দের দুই একজন বাদে বাকিরা বড়েন্দার গ্রামে জেলা কমিটির সভায় উপস্থিত হলেন। আলোচনার মধ্য দিয়ে সভায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে একমত হলেন হয় গ্রেফতার নাহলে আত্মগোপনে যেতে হবে। তখনকার পার্টির পরিস্থিতি এমনই ছিল কমরেড হেমন্ত সরকার ছাড়া সকলেই গ্রেফতার হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই বলে মতামত ব্যক্ত করলেন। গ্রেফতার এড়াতে গেলে যে ধরনের গোপন আশ্রয়স্থল থাকা প্রয়োজন তা একেবারেই ছিল না। কমরেড অমল সেন বড়েন্দার থেকে এগারোখান এসে তাঁর আস্তানা কমরেড রসিকলাল ঘোষের বাড়িতে উঠলেন। তারপর দিনই গ্রেফতার হলেন। কমরেড হেমন্ত সরকার আত্মগোপনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তাঁরও কোনো আশ্রয়স্থল বলতে ছিল না। যশোর জেলা কমিটির প্রায় সকলেই গ্রেফতার হয়ে গেলেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি বিংশতিতম কংগ্রেসে শান্তিপূর্ণ উত্তরণ, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার দক্ষিণপন্থী লাইন যখন গ্রহণ করে তখন কমরেড অমল সেন কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকলেও বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই মহাবিতর্ক প্রসঙ্গে কমরেড অমল সেনের রয়েছে নিজস্ব মতামত। ১৯৫৮ সালে ১২ পার্টির সম্মেলন বিশেষ করে ১৯৬০ সালে ৮১ পার্টির সম্মেলনের সমঝোতাকে কমরেড অমল সেন যথার্থ মনে করেছিলেন।
“৮১ পার্টির সম্মেলনে সমঝোতা হয়েছিল ৮১ পার্টির দলিলে বর্ণিত বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির মূল্যায়নকে সোভিয়েত ও চীনা পার্টি উভয়েই সমর্থন করেন। আমরাও ঐ মূল্যায়ন আজও সঠিক রয়েছে বলে মনে করি। মূল্যায়নে এক প্রসঙ্গে বলা হয় যে এই যুগ সমাজতন্ত্রের বিজয়ের যুগ এবং বর্তমান বিশ্বে চারটি মৌলিক দ্ব›দ্বকে চিহ্নিত করা হয়। (ক) সমাজতন্ত্র বনাম সা¤্রাজ্যবাদ; (খ) জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম বনাম সা¤্রাজ্যবাদ; (গ) মজুরী এবং পুঁজির দ্ব›দ্ব (ঘ) সা¤্রাজ্যবাদের পরস্পরের মধ্যকার দ্ব›দ্ব।”
(সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের বিকল্প শক্তি , কমরেড অমল সেনের, পৃষ্ঠা-২৭)
কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরের মতৈক্য থেকে পরবর্তীতে মতবিরোধে রূপ নিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টি একপেশে মূল্যায়ন করলো। চীনা কমিউনিস্ট পার্টিও পূর্বেকার অবস্থান থেকে সরে গেল।
প্রথম দিকে কমরেড অমল সেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির লাইন ও বিশেষ করে ১৯৬৩ সালে ১৪ জুনের চিঠিকে মূলতঃ সঠিক বললেও পরবর্তীকালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বাম বিচ্যুতির দিকে গেল। কমরেড অমল সেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির লাইনকেও বাম হঠকারী লাইন হিসাবে মূল্যায়ন করেন।
“সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের বিকল্প শক্তি” বইয়ে কমরেড অমল সেনের মূল্যায়নকে আমরা দেখতে পাই। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির লাইনকে যেমন দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী লাইন বলেছেন ঠিক তেমনিভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির লাইনকে বাম হঠকারী লাইন হিসাবে মূল্যায়ন করেছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির বিতর্ককে তিনি “সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সমস্যা ও জনগণের বিকল্প শক্তি” বইয়ে যেভাবে উল্লেখ করেছেন তার গুরুত্বপূর্র্ণ অংশের কিছু উল্লেখ করছি।
উল্লেখ্য, কমিউনিস্ট আন্দোলনে আদর্শগত মহাবিতর্কের আগে ও পরে এহেন গুরুত্বপূর্র্ণ ইস্যু নেই যেখানে কমরেড অমল সেন তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত মতামতকে তুলে ধরেননি। আমি এখানে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে মতাদর্শগত বিতর্ক প্রসঙ্গে কমরেড অমল সেনের মতামতও লিখেছি। আগেই বলতে চাই কমরেড অমল সেনের বক্তব্যের সাথে যেমন আমার মিল রয়েছে তেমনি কিছু পার্থক্যও আছে। যেহেতু আমার মতামত আমার বই “যা দেখেছি যা করেছি”Ñতে উল্লেখ করেছি তাই এখানে আমার মতামতের কোনো বিস্তারিত বক্তব্যে যাচ্ছি না।
১৯৬৬ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে যায়। কমরেড অমল সেনের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্র্ণ ও যথার্থ দিক হলো তথাকথিত পিকিংপন্থীরা মস্কোপন্থীদের সংশোধনবাদী ও বিপ্লববিরোধী হিসাবে ঘোষণা করলো কিন্তু কোথায় কোথায় সংশোধনবাদের নির্দিষ্ট প্রকাশ রয়েছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ভাবে সংগ্রামের কোনো কৌশল নেওয়া হয়নি। নেওয়ার সেই যোগ্যতা আমাদের তৎকালীন পার্টি নেতৃত্বের কোনো পর্যায়েই ছিল না বলেই লক্ষ্য করা গেছে। সেই যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারলে দক্ষিণপন্থী বিচ্যুতিকে লড়াই করতে গিয়ে ভয়ঙ্কর ভাবে বাম হঠকারিতার গাড্ডায় পড়তে হতো না। তাই কমরেড অমল সেন যথার্থ ভাবে বলেছেন মতাদর্শগত রাজনৈতিক সংগ্রাম যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ ভাবে হয়নি। পার্টিকে ভেঙ্গে ফেলার কাজটিকেও যথাযথ হয়েছে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঠিক নয়। অন্যদিকে মস্কোপন্থীরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলেন পার্টির অভ্যন্তরে যদি কোনো একটি পক্ষ অন্যদেরকে সংশোধনবাদী ও বিপ্লববিরোধী হিসাবে মূল্যায়ন করে তাহলে তাদের জন্য গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতিমালা সেভাবে প্রযোজ্য হয় না। সেদিনকার পার্টির ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতম অংশ তারা প্রকৃত সমস্যাকে যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করে সংগ্রাম করতেও ব্যর্থ হয়েছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মনে করেছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই সবকিছু। সংখ্যাগরিষ্ঠ কমরেডরাও সমস্যার গভীরে গিয়ে উপলব্ধির ভিত্তিতে সংখ্যালঘুদের ভ্রান্ত পথকে সংগ্রাম করতে পারেননি বলে মনে হওয়ার সংগত কারণ রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙ্গে যাওয়ার পর কারাগার থেকে বেরিয়ে কমরেড অমল সেন, কমরেড সত্যমৈত্র কমরেড মণি সিংহের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। আত্মগোপনে থাকা কমরেড হেমন্ত সরকার, কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার কমরেড মণি সিংহের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে কমরেড মণি সিংহ বলেছিলেন, যেভাবে পার্টিকে ভেঙ্গে ফেলা হলো তোমরা কি এক থাকতে পারবে?
ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণ হয়ে গেছে মস্কোপন্থী হউক আর পিকিংপন্থীই হউক উভয়েই যে ভ্রান্ত লাইন নিয়ে ভ্রান্ত ভাবে পার্টি ভেঙ্গে ফেলেছিলেন সেটি ছিল মারাত্মক ভুল ও বিপর্যয়ের। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি এই ভাঙ্গন অপরিহার্য ছিল না। পার্টি ভাঙ্গনকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। এসব ভুল থেকে যথার্থ ভাবে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারলে আজও মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থীদের নিজেদের যথার্থ মনে করার কোনো কারণ থাকে না।
চলবে/




