এ কালের শিক্ষাগুরু শরিফুল ইসলাম তালুকদার

দাউদকান্দি (কুমিল্লা) সংবাদদাতাঃ প্রকৃতি এবং মনের যুৎসই সৌন্দর্য্যে ঘেরা জুরানপুর কলেজ। প্রাচীন সমতট অঞ্চলের পশ্চিমাংশে, বর্তমান দাউদকান্দি উপজেলার অন্তর্গত জুরানপুর গ্রামে অবস্থিত। এটি কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য মেজর জেনারেল( অব:) সুঁবিদ আলী ভূঁইয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন। সিটি কলেজে ভর্তী হয়ে বাড়ী ফেরার পথে একবার ভাবলাম, জুরানপুর কলেজটা একটু দেখে যাই। অনেকের মুখে এ কলেজের বর্ণনা শুনেছি, কখনো দেখিনী। আমাদের গ্রামে থেকে খুব বেশি দূরুত্ব না। তবে, তখনকার দিনে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে হলে খুব ‘কাঠখর পোড়াতে’ হতো। বর্ষায় নৌকা আর শুকনো মৌসুমে বিলের মাঝখান দিয়ে আইল বেয়ে হেটে হেটে। তখনকার দিনের দুই মাইল আর এ কালের দুই মাইল সমান ছিল না, ঢের বেশি কষ্টসাধ্য ছিল। এ কারনে পাশের গ্রামকে অনেক দূরের মনে হতো। তাছাড়া আমাদের সময় স্কুল পড়ুয়া ছেলেরা দু’চার গ্রামের অধিক চেনা-জানার সুযোগও ছিল না। বর্তমানে এইট-নাইনের ছেলেদের মটর সাইকেল থাকে। বাবা-মা নিজেদের সামর্থ জানান দেয়ার জন্য ছেলেদের কিনে দেয়। গ্রামে গ্রামে পাকা রাস্তা হয়েছে। ছেলেদের বায়নার ধরণও পাল্টে গেছে। তারা শ্রীলংকার রাজধানীর নাম না জানলেও, স্কুল লাইফে দু’চারটা উপজেলা মুখস্ত! যাই হোক, দাউদকান্দি নেমে গোয়ালমারীর সিএনজিতে উঠলাম। সেখান থেকে হেটে জুরানপুর। ঝাউতলী মোড়ে এসে পূর্ব দিকে তাকিয়ে সত্যিই অবিভূত হয়ে গেলাম! পায়ে পায়ে এগুচ্ছি আর ভাবছি এ কী করলাম আমি! আব্বা কে অনেক প্রেসার ক্রিয়েট করে বারো হাজার টাকা জোগার করেছি। তখনকার দিনে এটা তার জন্য অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। বড় ভাই মাসিক খরচ চালিয়ে নিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু এটাও দু:সাধ্য। ঘরের কাছে এমন কলেজ থাকতে আমি বোকার মতো “এক বিল্ডিং এর সিটি কলেজ” এ ভর্তি হয়ে আসলাম গোয়ার্তীমি গিরি করে। জুরানপুরে পা রেখে মনে হলো সবুজে ঘেরা একটা মিনি ক্যান্টনমেন্ট এ প্রবেশ করলাম। অসাধারণ এক কমপ্লেক্স! পরিকল্পিত জলাশয়, সারি সারি গাছ, পরিকল্পিত ক্লাসরুম, সু-বিন্যস্ত হোস্টেল, পরিপাটি রাস্তা-ঘাট। কী সুন্দর ছাত্র-ছাত্রীদের দলবদ্ধ হাটাহাটি! যেনো সফেন-শুভ্র স্বপ্নগুলো পায়চারী করছে! সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, এখানেই পড়বো। যেই কথা সেই কাজ, ভর্তি ফরম কিনে বিকেলে বাড়ী ফিরলাম। কষ্ট হলেও আব্বা খুব খুশি, ছেলে সিটি কলেজে ভর্তি হয়ে এসেছে। সন্ধ্যায় তাকে জানালাম আমি জুরানপুর কলেজে পড়বো। প্রথমে খুব রেগে গিয়েছিল, পরে তাকে সবকিছু বুজিয়ে বললাম।তবে ওনার “বারো হাজার টাকার পুড়ানী” থামতে অনেক সময় লেগেছে! ভবিষ্যত কম খরচের ব্যাখ্যায় সেটা পুষিয়ে দিলাম। আব্বা মেনে নিল। কলেজে ভর্তি হলাম বাণিজ্য শাখায়। হিসাববিজ্ঞান এবং অর্থনীতি পরিচিত সাবজেক্ট হলেও “স্টাটিসস্টিকস” বিষয়টি ছিল একেবারে দূরবোধ্য। বইয়ের পাতা উল্টে-পাল্টে কিছুই বুজি না। এটা জ্যামিতি, পরিমিতি, না ম্যাথমেটিকস? প্রথম দিন ক্লাস করার পর আমার মাথা খুললো। দীর্ঘদেহী সুদর্শন একজন শিক্ষক পরিসংখ্যান বুঝালেন। নাম- শরিফুল ইসলাম তালুকদার। কী সরল তার কথা বলার বাচন-ভঙ্গী! কী সহজ-সরল তার নিয়ম-কানুন! কত অনর্গল তিনি বলে গেলেন! কখন যে পয়তাল্লিশ মিনিট শেষ হয়ে গেল, টের পেলাম না। ঘন্টা পড়ার শব্দে আফসোস লাগলো, আরো কিছুক্ষণ যদি ক্লাসটা চলতো! কলেজ ছুঁটি হওয়ার পর “কেন্দ্রীয় প্রবণতা” ভাবতে ভাবতে বাড়ী পৌঁছলাম। সে দিন এটাও পরিস্কার হলো- স্কুলের শিক্ষক আর কলেজের শিক্ষকের মধ্যে প্রর্থক্যটা “আকাশ-পাতাল”। তখনকার দিনে জুরানপুর কলেজের প্রায় সব স্যারদের ক্লাসই ছিল বেশ চমকপ্রদ। তবে পরিসংখ্যান স্যারের ক্লাসের জন্য মনে মনে অপেক্ষা করতাম। সবাই তাই করতো। এই প্রথম দেখলাম কোনো শিক্ষকের ক্লাসে পড়াতে বই লাগে না, খুৎবাহ এর মতো করে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বলে যান! নিখুঁত-নির্ভুল ! কিছুদিন পর জানলাম স্যারের কাছে ব্যাচে পড়া যাবে।
আমরাও দশ-বারো জনের একটি ব্যাচ ঠিক করে পড়া শুরু করলাম। সপ্তাহে তিন দিন করে, মাসে পাঁচ’শ টাকা। তখন পরিবার থেকে মাসে অতিরিক্ত পাঁচ’শ টাকা আনাও কঠিন ছিল। যাইহোক, মাস শেষ হওয়ার পর সবাই যার যার টাকা স্যার কে বুজিয়ে দিলাম। এক এক করে যখন সব ছাত্ররা বেরিয়ে যাচ্ছে, স্যার আমাকে বলল- “তুমি দাঁড়াও, কথা আছে “। আমি অপেক্ষা করলাম। ভাবছিলাম, স্যার হয়তো তার কোনো একটা কাজ করে দিতে বলবে। সবাই বেরিয়ে যাবার পর স্যার আমার হাতে আমার দেয়া পাঁচশত টাকা ফেরৎ দিয়ে বললেন- “তোমার কোনো টাকা দিতে হবে না, তুমি এমনিতেই পড়বে। ঠিক মতো পড়াশোনা করবা, জীবনে বড় হতে হবে”। স্যারের সেই কথাগুলো মনের মাঝে স্বপ্ন হয়ে কিলবিল করতো সব সময়! এই প্রেরণা স্যার হাজারো ছাত্রদের দিয়েছেন। যা সহস্র হৃদয়ে গাঁথা আছে। বাংলাদেশের যে প্রান্তেই যাই, জুরানপুর কলেজের কথা আসলেই শরিফ স্যারের নামটা চলে আসে। শ্রোদ্ধায় মাথা নতো হয়ে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানর এমন একজন করে শিক্ষাগুরু দরকার। তবেই বাংলাদেশ বদলে যাবে। বর্তমানে স্যার জুরানপুর আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন। সাফল্যের সাথে তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ এ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মতলব দক্ষিণ উপজেলার নায়ের ইউনিয়নের শাহাপুর তালুকদার বাড়ীর আব্দুল কাদির তালুকদারের সুযোগ্য সন্তান তিনি।




