
‘ওরা আমাকে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতো’- বাংলাদেশে হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন নেত্রী
“আমি যখন বড় হচ্ছিলাম আমার পুরুষের পোশাক পরতে ভালো লাগতো না। আমার বড় দুটো বোন ছিল আমি প্রায়ই ওদের ফ্রক পরতাম”, বলছিলেন বাংলাদেশে হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন নেত্রী অনন্যা বনিক।
“আমার পাশের বাসার কাকিমা বলতো তুইতো আসলে পোলা না মাইয়াও না। তাহলে তুই মনে হয় খোজা। তুই তো হিজড়া। আমি তখন আমার মাকে প্রশ্ন করেছিলাম আসলেই কি আমি হিজড়া? আমার মা তখন কোন উত্তর দিতে পারেননি।”, বলছিলেন তিনি।
পরনে সাদা কালো রঙের শাড়ি, ঠোটে লিপস্টিক, চোখে গাঢ় করে লাগানো কাজল দিয়ে অনন্যা বনিক নিজেকে সাজিয়েছেন খুব যত্ন করে।
প্রাণবন্ত হাসিভরা মুখে এসে রাস্তা থেকে আমাকে নিজের একটি বিউটি পার্লার পর্যন্ত নিয়ে গেলেন তিনি। নিজের গল্প বললেন কোন প্রকার সংকোচ ছাড়া।
হিন্দু পরিবারে তার জন্ম। সেসময় পরিবার তার নাম দিয়েছিলো গৌতম বনিক। তবে তিনি নিজেকে গৌতম হিসেবে কখনোই মানতে পারেননি।
মেয়েদের মতো হতে চেয়েছেন বলে পরিবার তাকে নিয়মিত শাস্তি দিতো।
তিনি বলছেন, “আমার দাদারা আমাকে নিয়মিত মারধোর করতো, কেন আমি ছেলেদের মতো সেজে থাকি। আমাকে জোর করে মাঠে খেলতে নিয়ে যেতো, সাইকেল চালানো শেখানোর চেষ্টা করতো। যাতে আমি পুরুষের মতো হয়ে উঠি”
তিনি বলেছেন , “গৌতম হিসেবে ওরা আমাকে পুরুষ তৈরি করতে চেয়েছে কিন্তু আমিতো পুরুষ না। শাস্তি হিসেবে আমাকে সাইকেলের চেইন দিয়ে পায়ে বেড়ি বানিয়ে তালা দিয়ে রাখা হতো। শুধু বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারতাম।”

কিন্তু একদিন নিজের মায়ের সাহায্য নিয়ে এই শিকল ছিঁড়ে একদিন বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে এলেন গৌতম। হয়ে উঠলেন অনন্যা বনিক।
তিনি বলছেন, “যখন আমি বুঝলাম এই পরিবার আমার জন্য না, যে গলিটাতে আমি বড় হয়েছি, যে গলির কাকিমা হিজড়া খেতাব আমার মাথায় চাপিয়ে দিয়েছেন, সেই গলিটার সমাজটা আমার জন্য না। আমি সেই সমাজকে সেই পরিবারকে মুক্তি দিয়ে আমার কমিউনিটিতে চলে এসেছি।”
তার বাবা তাকে নাচের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে নাচের ওপরে ডিপ্লোমা রয়েছে তার।
আজ সেজন্য ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরপরই কিছুটা আর্থিক সঙ্গতি তার ছিল। সেটিই তাকে সাহস যুগিয়েছে।
কিন্তু প্রতিটা জায়গায় তাকে কিভাবে ধাক্কা খেতে হয়েছে সেই বর্ণনা দিয়ে অনন্যা বনিক বলছেন, “প্রত্যেকটা জায়গায় আমাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। যেমন পাবলিক বাসে ওঠার সময় জিজ্ঞেস করে মালটাতো হিজড়া। কোন সিটে বসতে গেলে যাত্রীরা উঠে চলে যায়। বাস ড্রাইভার, রিকশাওয়ালা, বাড়িওয়ালা, পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়া, মুদি দোকানদার, চাওয়ালা সবার কাছেই আমাকে প্রতিটা মুহূর্তে পরীক্ষা দিতে হয়েছে।”
কিন্তু সেই পরীক্ষায় ব্যক্তি জীবনে বেশ সফল হয়েছেন অনন্যা বনিক।




