আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

নাইজেরিয়ার মাদরাসায় কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা

নাইজেরিয়ার মাদরাসায় কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা – সংগৃহীত
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার কানো প্রদেশের রাজধানীর নামও একই, কানো। সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত এই শহরটি নাইজেরিয়ার অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ও জনসংখ্যায় দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। গত বৃহস্পতিবার রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে শহরটির রাস্তায় বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত মানুষের ভিড় দেখতে পাওয়া গেল। রাস্তায় যাত্রী পেতে তিন চাকাওয়ালা রিকশাগুলোর একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতার দৃশ্যও ছিল নজরকাড়ার মতো।
এরই মাঝে একদল অল্পবয়সী ছেলেকে হাতে তোয়ালে ও এক বোতল সাবান মিশ্রিত পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। রাস্তায় কোনো গাড়ি এসে থামলেই এগিয়ে গিয়ে গাড়ির কাচ পরিষ্কার করে দেবে কি না তা জিজ্ঞাসা করতে ব্যস্ত তারা। কিন্তু বেশির ভাগ গাড়ির চালক সেদিকে কর্ণপাত না করে নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলে। সময় গড়িয়ে চলে এভাবেই। এই অল্পবয়সী ছেলেগুলো কোনো শ্রমিক নয়। আবার তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই কাজ করে না। তারা মূলত কানো শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র আল মাজিরি মাদরাসা থেকে তিন ঘণ্টার ছুটি পেয়ে অল্প কিছু রোজগারের আশায় রাস্তায় চলে আসে। আল মাজিরি মাদরাসার অনেক শাখা আছে। তারই একটি ‘তাহফিদুল কুরআন স্কুল’ নামের একটি মাদরাসার শিক্ষার্থী তারা। এই মাদরাসায় বর্তমানে আড়াইশরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে।
পরপর বেশ কয়েকটি গাড়িতে জিজ্ঞাসা করার পর হয়তো সৌভাগ্যক্রমে একটি গাড়ির জানালা বা কাঁচ পরিষ্কারের অনুমতি পায় তারা। আবার অনেক সময় বাড়ির গৃহিণীরা ঘরের বাসি কাজ ও বাসন পরিষ্কারের জন্য দুই ঘণ্টার জন্য তাদের নিয়ে যায়। বিনিময়ে তাদেরকে দেয়া হয় এক প্লেট খাবার।
এই শিক্ষার্থীদেরই একজন ১৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাগির। আলজাজিরাকে সে বলে, ‘গত তিন বছর ধরে দিনে দুইবার আমি এই কাজ করছি। কিছু মানুষ আমাদের প্রতি সদয় হন এবং আমাদের কাজ দেন। কাজ শেষে আমাদের খাবারও দেন।’ এই কথা বলার সময় পেছনে জমে থাকা ময়লা বাসনের স্তূপের কাছে সাগিরের শরীরকে বেশ ুদ্রই লাগছিল। সাগির আরো বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একটা কাজ পেয়েছি এবং খাবার খেতে পারছি।’ সাগিরের পাশেই হাঁটুগেড়ে বসেছিল ১৫ বছর বয়সী ওমর মোহাম্মদ। কর্মকান্তিতে ওমরের কপালে তখনো ঘাম লেগে ছিল। মুখে এক প্রস্থ হাসি নিয়ে ওমর বলেন, ‘চার বছর ধরে আমি এই কাজ করছি। আমি খুশি, কারণ কাজ শেষে আমি খাবার পাবো। মাঝে মাঝে খাবার ও কাজ পেতে আমাদের সংগ্রাম করতে হয়। এমনকি অনেকবারই আমরা ুধার্ত অবস্থায় মাদরাসায় ফিরে গিয়েছি।’
এক ঘণ্টা পর একটু পাশেই তাঁবুর নিচে মাদরাসার বাকি ছাত্রদের পাওয়া গেল। তারা সেখানে উচ্চস্বরে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করছিল। পাঁচটি ঘরবিশিষ্ট এই আবাসিক মাদরাসার প্রিন্সিপাল হলেন আলারাম্মা ইসা সুলাইমান। উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার নিকট থেকে দায়িত্ব পেয়ে বর্তমানে আরো ছয়জন শিক্ষকসহ তিনি এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। এক হাতে বেতের ছড়ি ও অন্য হাতে তসবিহ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানি ছাত্রদের কী কী চ্যালেঞ্জর সম্মুখীন হতে হয়। আমি এটাও জানি যে, ছাত্রদের বেশির ভাগই খাবার জোগাড়ের জন্য কাজের সন্ধানে বাইরে যায়। তারা যেতে বাধ্য হয়। কারণ আমরা তাদের সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবার বা রাতের খাবার কিছুই দিতে পারি না। আমরা কী করতে পারি? এটা মোটেও নিরাপদ নয়। বাইরে তাদের যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু আমরা তাদের খাবার দিতে সক্ষম নই। এখানে ২৫০ এর বেশি ছাত্র আছে। তাদের না আছে কোনো খাবার, না আছে ঘুমানোর জায়গা।’
প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য তাদের অভিভাবকদের মাদরাসায় প্রতি মাসে ১৯ মার্কিন ডলার বেতন দিতে হয়। সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটা খুবই কম। ধর্মীয় মাদরাসা ছাড়া অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ বেতন হিসেবে দিতে হয়। সুলাইমান বলেন, ‘বেশির ভাগ অভিভাবকই গরিব এবং অনেকের বেতন পরিশোধের সামর্থ্য নেই। তবে কাউকে ফিরিয়ে না দিতে আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করি। আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন। সরকারের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’ মাদরাসার এই পাঁচটি ঘর ছাত্রদের রাতে ঘুমানোর জন্যও ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে একটি ঘর আবার একটি ছাগল ও কয়েকটি কবুতরের থাকার জন্য ব্যবহার করা হয়। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ার কারণে অনেক ছাত্র বাইরে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়। সুলাইমান আরো বলেন, ‘ছাত্ররা রাতে বাইরে ঘুমায়। বর্তমান পাঁচটি ঘরে তাদের ঘুমানোর মতো যথেষ্ট জায়গা নেই।’
শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থী শাফিঈ মোহাম্মদ বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে এই মাদরাসায় পড়ার সুযোগ দিয়েছেন। আমি খুবই খুশি। কিন্তু এখানকার ঘুমানোর ব্যবস্থা যদি আর একটু ভালো হতো…।’
এখানকার ছাত্রদের সবাই যে কানো প্রদেশের অধিবাসী তা নয়। শাফিঈর মতো অনেকেই এখানে পাশের জিগায়া প্রদেশ থেকে পড়তে এসেছে। শাফিঈর পিতামাতা তার থাকার জায়গা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও ছেলেকে এখানে পড়াতে পেরে খুবই খুশি। শাফিঈর পিতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ টেলিফোনে আলজাজিরাকে বলেন, ‘ইসলামি শিক্ষা হচ্ছে এমন কিছু, যা ভবিষ্যতে সব কাজে তার সহায়ক হবে এবং খারাপ কিছু থেকে নিজেকে রক্ষা করতে শিক্ষা দিবে। মাদরাসায় থাকার ব্যাপারে কিছু সমস্যা থাকলেও আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ ওকে সকল সমস্যা থেকে উদ্ধার করবেন।’ ৫২ বছর বয়সী এই পিতা আরো বলেন, ‘শাফিঈকে পাঠানোর মতো যথেষ্ট টাকা আমার নেই। তাকে দেখাশোনার দায়িত্ব আমি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’
নাইজেরিয়ার সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ কানোর জনসংখ্যা ৯০ লাখেরও বেশি। শিক্ষার্থী ও তরুণদের অবস্থার উন্নয়নে সাধ্যের সব কিছুই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কানোর প্রাদেশিক সরকার। কানোর ডেপুটি গভর্নর হাফিজ আবুবকর আলজাজিরাকে বলেন, ‘জনসংখ্যা নিয়ে আমরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছি। কারণ আমাদের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশই ৪০ বছরের কম বয়সী। তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা খুবই কঠিন কাজ। যদি আমরা আমাদের প্রাদেশিক বাজেটের পুরোটাই এই খাতে খরচ করি তবুও তাদের আমরা সঠিকভাবে সব সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো না।’
আবুবকর আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে ১৪ হাজারেরও বেশি মাদরাসায় প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কানো সুপরিচিত এবং সমগ্র নাইজেরিয়া থেকেই অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের এখানে পড়াশোনা করতে পাঠান। শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
সূত্র : আলজাজিরা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button