ঘিওরে “তেরশ্রী ট্রাজেডি” দিবস পালিত

নিজস্ব প্রতিনিধি, মানিকগঞ্জ: ঘিওর উপজেলায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে তেরশ্রী ট্রাজেডী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার সকালে নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। এর আগে সেখান থেকে একটি শোক র্যালি বের করা হয়। র্যালি শেষে স্মৃতিস্তম্ভের সামনে অুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুঞ্জুর মোহাম্মদ শাহ্রিয়ার, মজিবর রহমান, শিবালয় সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ শারাফত ইসলাম, বিএলএফ কমা-ার ও সাবেক সংসদ সদস্য মফিজুল ইসলাম খান কামাল, জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট গোলাম মহীউদ্দীন, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম আনোয়ারুল হক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীমা খন্দকার, জেলা কমান্ডার তোবারোক হোসেন লুডু, জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ন সম্পাদক ও জেলা সভাপতি ইকবাল হোসেন, উপজেলা কমান্ডার আব্দুল আজিজ মিয়া।
২২ নভেম্বর তেরশ্রী ট্য্রাজেডি দিবস। দিনটি মানিকগঞ্জ বাসির কাছে এক কলঙ্কিত দিন। ১৯৭১ সালে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহযোগীতায় মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী বাজারসহ ৪ টি গ্রামের ঘুমন্ত মানুষের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে এবং পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে হত্যা করে ৪৩ জন নিরাপরাধ মানুষকে। বর্বর এই হত্যাকান্ডের বিচার না পাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস এখনো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। ওই দিনে প্রতিটি দূর্সহ এলাকাবাসীর বুকে এখনো বিধে আছে।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা সদর থেকে ৩ কিলোমিটার ভিতরে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সূতিকাগার তেরশ্রী বাজার, তেরশ্রী গ্রাম, সেন পাড়া, বড়ুরিয়া ও বড়বিলা এক শান্ত গ্রাম। পল্লী গ্রাম হলেও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনে যথেষ্ট সক্রীয়তা ছিল এ গ্রামবাসীর। সচেতন গ্রামবাসীর কারনে এ গ্রামে গড়ে উঠেছিল মানিকগঞ্জ জেলার প্রথম কলেজ। আর এ কলেজকে কেন্দ্র করে পশ্চাৎপদ চেতনার কিছু অপশক্তির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগীতায় বিভেদ সৃষ্টি করা হয়। এই প্রতিহিংসাই চরিতার্থ করে ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর । জামাত, শিবির, রাজাকার, আলবদর, আলসামস, পিচ কমিটির নর পিচাশরা হানাদার বাহিনীর সর্বাত্বক সহযোগীতা নিয়ে শীতের কুয়াশা ঘেরা ঘুমন্ত পল্লী¬তে চালায় ৬ ঘন্টার নরকীয় হত্যাযজ্ঞ, আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় গ্রাম থেকে গ্রাম। হানাদাররা ব্যাবহার করে স্বয়ংক্রীয় অস্ত্র। এই বিভীষিকাময় দিনটিতে তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান সহ ৪৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় তেরশ্রীর জমিদার সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরীকে। আজও জেলাবাসী এ ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছে। প্রতি বছর দিবসটি ঘটাকরে পালিত হলেও বিচার হয়নি ঘাতকদের।
২২ নভেম্বর ভোরে সেন পাড়ার ১০ মাসের সন্তান সম্ভবা রেভা রানী দত্ত সেদিন হাড়ান তার স্বামী ও শশুরকে। তাদেরকে হাত পা বেঁধে বেনয়েট দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করা হয়। বাড়ি ঘেরাও করে স্বয়ংক্রীয় অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায় হায়েনারা। পুড়িয়ে দেয়া হয় তার সুখের সংসার। বেচে যাওয়া রেভা রানী পরেরদিন পুত্র সন্তান জন্ম দেন খড়ের গাদায়। আজও বিচার হয়নি সেই সম্স্ত হায়েনা এবং দোসরদের। এত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা তাকে দেয়নি কোন শান্তনা। এমনকি তিনি শহীদ পরিবার হিসাবে পায়নি কোন স্বীকৃতি কিংবা একটি বৃদ্ধ ভাতার কার্ড।
মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান সেদিনের হায়েনাদের দোসর পিচ কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন ফকির, সাধারন সম্পাদক মানিক ভূঁইয়া এবং পিচ কমিটির নেতা আব্দুর রাজ্জাক ভোটনের নেতৃত্বে এই হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে বলে জানান। মানবতা বিরোধী এই হত্যা কান্ডের বিচারেরও দাবী জানান তিনি।
শহীদদের নামাঙ্কিত স্মৃতিস্তম্ভটি মানিকগঞ্জ-দৌলতপুর সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে পথচারীদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেদিনের বিভৎসময় স্মৃতি। ২০১২ সালে এলজিইডি ২৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করে। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মানের একটি দাবী পূরণ হলেও হত্যাকান্ডে জড়িতদের বিচার না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ রয়েই গেছে।




