sliderস্থানিয়

কাইশার শুভ্রতায় যমুনার চর: বুকভরা কষ্টেও হাসে ছিন্নমূল মানুষের সংসার

মোঃ আব্দুর রব মনসুর, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: যমুনার বুক জুড়ে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জেগে ওঠা উর্বর পলিমাটিতে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে বিছিয়ে দেয় সবুজের গালিচা। সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলগুলোতে এই সবুজ কাইশা ঘাস কেবল প্রকৃতির রূপই বদলায় না, বরং যন্ত্রণার ক্ষত শুকিয়ে চরের মানুষের জীবনে নিয়ে আসে নতুন প্রাণের স্পন্দন। সময়ের পরিক্রমায় কাইশার এই সবুজ রঙ গলে মিশে যায় সোনালী আভায়ে; আর যমুনাতীরবর্তী অবহেলিত মানুষের জীবন সংগ্রামে এটি হয়ে ওঠে জীবিকার এক অবিচ্ছেদ্য ও বিশ্বস্ত অবলম্বন।

বন্যার জলছাপ মুছে যাওয়ার কিছুদিন পরই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা কাইশা ঘাস বেড়ে ওঠে এক থেকে দেড় ফুট। ঠিক তখন থেকেই শুরু হয় স্থানীয় কৃষকদের ব্যস্ততা। নরম ও ছোট কাইশাগুলো পশুখাদ্য হিসেবে গোয়ালে সমাদৃত হলেও বাজারে এর রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। এরপর হেমন্তের মৃদু বাতাসে কাইশার ফুল যখন চারপাশ মাতিয়ে তোলে, তখন মনে হয় পুরো চর যেন সাদা মেঘের চাদরে ভেসে রয়েছে—এক অপূর্ব মায়াবী দৃশ্য।

সকালের মিষ্টি রোদে কৃষকরা ছোট কাইশা কেটে নিপুণ হাতে আঁটি বাঁধেন। এরপর মাথার বোঝা কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে তা পৌঁছে যায় নদীর ঘাটে। ছোট্ট ডিঙিনৌকোয় যমুনা পাড়ি দিয়ে সেই কাঁচা ঘাস হাটে পৌঁছায়। এক সপ্তাহ রোদে শুকানোর পর বাজারে প্রতিটি আঁটি বিক্রি হয় ২০ টাকায়। অন্যদিকে, একটু বড় ও শক্ত কাইশাগুলো দিয়ে গ্রামীণ জনপদের মানুষ তৈরি করেন গোয়ালঘর কিংবা বাগানের সীমানা বেড়া।

চরের সহজ-সরল মানুষের কাছে কাইশা কেবল একটি ঘাস বা পণ্য নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের চাবিকাঠি। ফুলজোড় চরের কৃষক বারিক মিয়া দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে বলেন, “ছোট কাইশা গরুকে খাওয়াই, বড়গুলো কেটে শুকিয়ে বাজারে বেচি। এই বিক্রি করা টাকাই আমাদের সংসার ঘুরায়।”

নিশ্চিন্তপুর চরের সোবাহান, তেকানি গ্রামের আচফুল নেছা ও বদিউজ্জামান ব্যাপারীরা জানান, সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ—বিশেষ করে বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্তা নারী এবং ভূমিহীন ছিন্নমূল মানুষগুলোর বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল এই কাইশা বিক্রি।

তেকানী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আতাহার আলী বলেন, “চরের মানুষ বছরের চার থেকে পাঁচ মাস এই কাইশা বিক্রি করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন।” শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, চরের এই কাইশা পাড়ি জমায় বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। সেখানে দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় কাইশা রূপান্তরিত হয় ডালা, ঝাঁকা, ফুলদানিসহ নানা নান্দনিক ব্যবহার্য ও শৌখিন পণ্যে। এমনকি লোকমুখে শোনা যায়, এসব পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

দৈনন্দিন খাটুনি আর বেঁচে থাকার অবিরাম লড়াইয়ের মাঝে কাইশার এই ছোট্ট আঁটিগুলোই যেন চরের দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের চাকা সচল রেখেছে। প্রকৃতির দান এই অবহেলিত ঘাসের মায়ায় ও টানেই আজ বেঁচে রয়েছে যমুনার চরের একটি পুরো জনপদ ও তাদের স্বপ্নগুলো

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button