
রতন রায়হান,রংপুর: দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পর্যন্ত সকল পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, “দুর্নীতি আজ বিশ্বব্যাপী একটি গুরুতর সংকট। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আরও সুসংহত করতে দুর্নীতি দমনই হবে মূল চাবিকাঠি। এ ক্ষেত্রে তরুণ সমাজই সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।”
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) সকাল থেকে রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয় দিবসটি। আলোচনাসভা, মানববন্ধন, শপথ পাঠ এবং সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে নানা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি এক সমবেত সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারুণ্যের ঐক্যগড়বে আগামীর শুদ্ধতা’। এই শ্লোগানকে সামনে রেখে প্রশাসন, আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষানবিশ তরুণদের অংশগ্রহণে দিনব্যাপী কর্মসূচিতে তৈরি হয় ব্যাপক সচেতনতা।
বিভাগীয় কমিশনার তার বক্তৃতায় বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে নয়, জনসচেতনতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতেই সফল হতে পারে। পরিবার—সমাজ প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যদি শুদ্ধাচারের চর্চা শুরু হয়, তাহলেই প্রকৃত সুশাসন নিশ্চিত হবে। ”তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা, সততা ও সুশাসন নিয়ে বিশেষ ক্লাস চালু করা জরুরি। সরকারি–বেসরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিতে হবে। তরুণদের নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
তিনি তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “এই দেশের প্রতিটি তরুণই দেশের সম্পদ। তোমরাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। সততার আলো তোমাদের থেকেই ছড়িয়ে পড়বে সমাজের প্রতিটি প্রান্তে।”
সভাপতির বক্তব্যে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান বলেছেন,“দুর্নীতি শুধু সম্পদ লোপাটই করে না; এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা ক্ষয় করে, ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত করে, উন্নয়ন প্রকল্প ধীরগতির হয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষের মানসিকতা বদল করাও জরুরি।” তিনি জানান, রংপুর জেলা প্রশাসন জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে বেশকিছু দাপ্তরিক সেবা অনলাইনে চালু করেছে। সরকারি দপ্তরের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করতে GRS (Grievance Redress System) আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনে শুদ্ধাচার নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “তরুণদের সম্পৃক্ত করা হলে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে। কারণ আগামী দিনে নেতৃত্ব তাদের হাতেই।”
অনুষ্ঠানে পুলিশ কমিশনার মো. মজিদ আলী বলেন, “কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। পুলিশের ভেতরেও শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতা বাড়ানো হয়েছে।”
অতিরিক্ত ডিআইজি ড. আ.ক.ম আকতারুজ্জামান বসুনিয়া বলেন,“উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতিহীন সুশাসন নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। দুর্নীতির ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি এখন কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।”
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাং নুরুল হুদা বলেন,“দুদকের কাজ এখন আরও প্রযুক্তিনির্ভর। যে কেউ সহজেই তথ্য দিয়ে অভিযোগ জানাতে পারে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শাওন মিয়া বলেন,“স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সামাজিক সমর্থন ছাড়া দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়।” সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় করতে হবে।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ড. নাসিমা আকতার বলেন,“নারী, শিশু, ছাত্র-ছাত্রীসহ পরিবার পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করতে হবে। নাগরিক সমাজকে সক্রিয় করে তুললে শুদ্ধাচার আন্দোলন আরও গতিশীল হবে।
”সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সভাপতি ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য বলেন,“সনাক দীর্ঘদিন ধরে জনগণকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করছে। ভবিষ্যতেও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লড়াই চলবে।”
আলোচনা সভার আগে সকাল ১০টায় রংপুর টাউন হল চত্বর–সংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি,সামাজিক সংগঠনের সদস্য,নারী উদ্যোক্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী সহ নানা শ্রেণির মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সেখানে “দুর্নীতিকে না বলুন”, “সততার বিজয় চাই” “স্বচ্ছতা–জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুন” ইত্যাদি স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে মানববন্ধন পরিবেশ রঙিন হয়ে ওঠে।
পরে দিবস উপলক্ষে সম্মিলিতভাবে দুর্নীতিবিরোধী শপথ পাঠ করা হয়। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে কেবল সরকারি উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বার্তা দিয়েই শেষ হয় প্রধান আলোচনাসভা। বক্তারা মনে করেন—
অভিযোগ করা নয়, বরং নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততার চর্চা শুরু করলেই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে ওঠা সম্ভব।




