sliderস্থানিয়

যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীকে মারধর, শিশু সন্তানসহ বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: এক সন্তানের জননী লিমা আক্তার, ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আড়াই বছরের শিশু সন্তানকে ভর্তি হয়েছেন। পাশেই বসা বৃদ্ধা মা হালিমা বেগম। হাসপাতালে বেডের সংকট থাকায় মেঝেতেই কোনমতো শুয়ে ব্যাথায় কাতরাচ্ছিলেন লিমা।

কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি জানালেন তার স্বামী যৌতুকের জন্য তাকে মারধর করে এক কাপড়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। এমনকি শিশুসন্তানের কাপড়টুকুও নিতে দেয়নি শ্বশুর বাড়ির লোকজন।

রোববার রাত সাড়ে ১১ টার দিকে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কথাগুলো কান্নাজরিত কণ্ঠে বলছিলেন পিতৃহীন লিমা। তবে শুধু আজ নয়, এরআগেও বেশ কয়েকবার যৌতুকের জন্য লিমার সঙ্গে পাশবিক আচরণ করেন তার স্বামীসহ পরিবারের লোকজন। একমাত্র শিশু সন্তানের নিষ্পাপ মুখের দিয়ে তাকিয়ে সকল যন্ত্রণা হজম করে দিব্বি সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তার পরেও স্বামীর নির্যাতনের মাত্রা একটুকুর জন্যও থেমে থাকেনি।

ভুক্তোভুগী লিমা আক্তারের স্বজনদের কাছ থেকে জানা গেছে, ২০২২ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়নের মাদারগঞ্জ মহভাসী গ্রামের মৃত সরিফ উদ্দীনের কন্যা লিমা আক্তারের সঙ্গে একই উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের পূর্বপারপুগী গ্রামের মৃত ইসাহাক আলীর ছেলে সাকের আদনান ইভানের সঙ্গে বিয়ে হয়। এই দম্পতির সংসারে আড়াই বছরের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য লিমাকে চাপ দেন তার স্বামী ও শশুড় বাড়ির লোকজন।

লিমার বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই। বাড়িতে বৃদ্ধা মা আর প্রতিবন্ধী ভাই ছাড়া আর কেউ নেই। তাই সে স্বামীর চাহিদা অনুযায়ী যৌতুকের টাকা এনে দিতে না পারায় প্রতিনিয়তই মারধরের শিকার হন। কয়েকবার মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পর স্থানীয়ভাবে দুই পরিবার বসে মিমাংসাও করে দেন।

তারপরেও স্বামী সাকের আদনান ইভান ও শাশুড়ির নির্যাতনের কবল থেকে রক্ষা পায়নি লিমা। তার স্বামীর দাবি তার যৌতুক লাগবে, না হলে তার সঙ্গে সংসার করবে না বলে মারধর করে শিশু সন্তানসহ বাড়ি থেকে বের করে দেয়। লিমা আক্তারের স্বামী সাকের আদনান ইভান একটি নৈশকোচে কর্মরত রয়েছেন।

লিমা আক্তারের মা হালিমা বেগম জানান, আমার চার সন্তানের মধ্যে লিমা দ্বিতীয়, তারমধ্যে এক ছেলে প্রতিবন্ধী আর বাকি দুই ছেলে দিনমজুরের কাজ করে। লিমা যখন দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়াশোনা করে তখনেই তার বাবা মারা যায়। মানুষের বাড়িতে কাজ করে তাদের বড় করেছি।

তিনি আরও বলেন, ধার-মাহাজন করে মেয়েরটার বিয়ে দিয়েছি। বিয়ের সময় স্বর্ণলংকার সহ ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেয়। সেগুলোই তো এখনো শোধ করতে পারিনি। তারপর আবারো আমার জামাই যৌতুকের জন্য মেয়েকে নির্যাতন করছে। এখন আমি কিভাবে যৌতুকের টাকা দিয়ে মেয়ের উপর মানসিক-শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করব। আমি তো নিজেই চলতে পারি না। এক ছেলে প্রতিবন্ধী। আরেক ছেলে ছোট সেও অভাবে সংসারে স্কুলে না গিয়ে দিনমজুরের কাজ করছে। এভাবে নির্যাতন করলে মেয়েটাকে বাচাতে পারব না। আমি এটার একটা সুষ্ঠু সমাধান চাই।

লিমা আক্তার বলেন, ঠাকুরগাঁও সরকারী কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে থাকাবস্থায় আমার বিয়ে হয়। স্বপ্ন ছিল বিয়ের পরেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। আমার বিয়ের সময় আমার পরিবারের পক্ষে থেকে যৌতুক দেয়া হয়। তারপরেও একটা সন্তান হওয়ার পর তারা আমাকে যৌতুকের জন্য চাপ দেয় কিন্তু আমার তো বাবা নেই সে জন্য আমি টাকার জন্য বাসায় কাউকে বলতে পারি না। তারা আমাকে প্রতিনিয়তই চাপ দেয় যাতে আমি বাবার বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে যায়। টাকা নিয়ে না যাওয়ার কারণে বিভিন্নভাবে শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমাকে নির্যাতন করে এমন কি হত্যা করার চেষ্টা চালায় তারা।

তিনি আরও বলেন, আজ আমাদের দুই পরিবারের বসা কথা ছিল মীমাংসার জন্য। তার আগেই আমার মামি শাশুড়ি মঞ্জু বেগমের সহায়তায় আমাকে চুল ধরে টেনে ছোট বাচ্চাসহ বাড়িতে থেকে বের করে দেয়। আমার বাবা নেই। মায়ের অনেক বয়স হয়েছে। ভাইরা কাজ করে। এখন আমি কথায় যাবো? কি করব? ছোট বাচ্চাকে নিয়ে? তারপরেও আমি সংসার করতে চাই। যেহেতু আমার একটা সন্তান রয়েছে। বাচ্চাটাকে অবহেলা করতে চাই না। তার জন্য হলেই আমি সব ব্যথা সহ্য করে নিবো।

তবে অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার লিমার আক্তারের স্বামী সাকের আদনান ইভানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি এবং তার পরিবারে কাউকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সরোআরে আলম খান বলেন, স্বামী-স্ত্রীর কলহের একটি বিষয় শুনেছি। তবে এখনো কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button