
তেভাগা আন্দোলন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি :
বৃটিশ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তেভাগা আন্দোলন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতবর্ষের শোষকগোষ্ঠীর ভীতকে প্রচণ্ড ভাবে কাঁপিয়ে তুলেছিল। তেভাগা আন্দোলন সম্পর্কে কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা তাঁর স্মৃতিকথা বইয়ে লিখেছেন তেভাগা আন্দোলনে কোন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না। এই আন্দোলন ছিল একটি অর্থনীতিবাদী আন্দোলন যা মূলতঃ জমিদার জোতদারদের স্বার্থই রক্ষা করেছিল। কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহার বক্তব্য আলোচনার দাবি রাখে। এ ব্যাপারে আমি কোন বিস্তৃত আলোচনা মূল্যায়নে না গিয়ে এতটুকু বলতে পারি তেভাগা আন্দোলনে সুনির্দিষ্ট ভাবে কোনো ক্ষমতা দখলের কৌশল ছিল না। ওই মূহুর্তে তেভাগা আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কোনো লক্ষ্য ছিল তা দেখতে পাই না। কমরেড অমল সেন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের বিকল্প শক্তি বইয়ে তেভাগা আন্দোলনের সমীক্ষা লেখার ৯০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন,
আশু রাজনৈতিক লক্ষ্য:
(Immediate political perspective)
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে ত্রিশের দশক থেকে বাংলাদেশে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হওয়া শুরু হয় সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়েই। শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য। তাই প্রতিটি আন্দোলনে চূড়ান্ত অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যের সঙ্গে আশু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যও সুনির্র্দিষ্ট থাকতো। কমরেড অমল সেনের এই বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন না তুলেই বলা যায় কমিউনিস্টরা যেকোনো ইস্যুতে আন্দোলন করলেই সব আন্দোলন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির লক্ষ্যেই পরিচালিত হয় তেমনটি নয়। কমরেড অমল সেনের জনগণের বিকল্প শক্তি বইয়ে শ্রেণীসংগ্রামকে কেন বিকল্প রাজনৈতিক ক্ষমতার লক্ষ্যে গড়ে তুলতে হবে ঐ লেখা লিখতে হতো না। আজও কমিউনিস্ট ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব হলেই আন্দোলন বিকল্প রাজনৈতিক ক্ষমতার শক্তি হিসাবে গড়ে উঠবে এমনটি নয়। ভারতবর্ষ তথা কমিউনিস্টদের অনেক আন্দোলন যেমন সংস্কারবাদী ধারায় চলে গেছে এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বাম হঠকারী লাইনেও চলে গেছে। ফলে কমিউনিস্টদের সমাজবিপ্লবের লক্ষ্য ঘোষণার পরেও নির্দিষ্ট ইস্যু বা কর্মসূচীতে সুনির্দিষ্ট রণনৈতিক লক্ষ্য ও রণকৌশল থাকা বাঞ্চনীয় এটাইতো শিখেছি। কমরেড অমল সেনের তেভাগা আন্দোলনের সমীক্ষা থেকে একটি আন্দোলনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে কোন কোন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা উচিত সেসম্পর্কে কমরেড অমল সেনের মতামত নিম্নরুপ : ১. নেতৃত্ব ২. সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ৩. পূর্বতন আন্দোলনে বুনিয়াদ ৪. আশু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ৫. সিদ্ধান্ত ৬. সংগঠন ৭. ফলাফল ৮.উত্তরাধিকার।
এসংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েই তেভাগার আন্দোলনের পর্যালোচনা হতে পারে। কমরেড অমল সেনের উপরোক্ত দৃষ্টিভঙ্গীর নীরিখে আমরা শিখতে পারি। কমরেড অমল সেনের লেখার ছত্রে ছত্রে দেখতে পাই কমরেড অমল সেন নেতৃত্ব বলতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব বুঝতেন। ব্যাক্তি নেতৃত্বকে কমিউনিস্ট পার্টির একজন নেতা হিসাবে মূল্যায়ন করতেন।
তেভাগা আন্দোলনের পরপরই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভাগ করো শোষণ করো এই নীতির ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে বিভক্তির কাজ দ্রুততার সাথে সমাপ্ত করলো। মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থের কথা বলে ভারতবর্ষকে বিভক্ত করার জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো। ভারত বিভক্তির জন্য সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ ও তার নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রধানতঃ দায়ী হলেও কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহেরুর ভূমিকা ভারত বিভক্তিকে কিছুমাত্রায় হলেও সহায়তা ও ত্বরান্বিত করেছিল। ১৯৪৮ সালের ৬ই মার্চ ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসে পার্টির সেদিনকার অভ্যন্তরীণ কি পরিস্থিতি ছিল সে সম্পর্কে কমরেড নূর জালাল লিখেছেন “মোহাম্মদ আলী পার্কে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে নড়াইল থেকে আমরা উপস্থিত ছিলাম। দুই মতের দুইটা দল তৈরি হয়ে যায় সেখানে। সাধারণ সম্পাদক পি.সি. যোশী একদল ও রনদীভের একদল। তখনকার অবস্থায় যোশী বিপ্লবী ধরনের কাজ কর্মের বিরোধী আর রনদীভে ছিলেন অচিরাৎ বিপ্লবের পথে ঝাঁপিয়ে পড়ার নীতিতে বিশ্বাসী। মিটিংয়ে বহু বাকবিতণ্ডার পর যোশী পরাস্ত হন এবং সাধারণ সম্পাদকের পদও খসে যায়। রণদীভের রণ আরম্ভের নীতি সম্মেলনে গৃহীত হয় এবং পার্টির সর্বময় কর্তা ও তিনি হয়ে যান। কলকাতার এক সংবাদপত্রে প্রকাশ হলো রনদীভে এখন রণ দিবেন। এই রণ দেওয়ার নীতি অনুসরণ করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটি এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে দালাল হালাল কর। সারা বাংলার সমস্ত জেলা ও মহকুমা কমিটি এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। প্রত্যেক এলাকায় তখন দালালের তালিকা তৈরি হয়ে যায়। আমাদের অঞ্চলের তালিকায় এক নম্বরে স্থান পান আমার বড় ভাই নুরুল হুদা। সারা বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হয়। কমরেড অমল সেন ছিলেন দালাল-হালাল লাইনের বিরুদ্ধে। দালাল-হালাল লাইন গ্রহনের পর কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সি, কমরেড নূর জালালের পরিবারের প্রতি পাকিস্তানি পুলিশের আক্রমণ নেমে আসে। কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সি, কমরেড নূর জালাল, কমরেড আব্দুল হকসহ অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপনে থাকাকালীন অবস্থায় প্রাদেশিক কমিটি কমরেড নুর জালালকে জেলার সম্পাদক করে।কমরেড অমল সেন সম্পাদকের পদ থেকে অপসারিত হলেন। জেলা কমিটির সভায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জেলা সম্পাদক করা হয়না। কমরেড নূর জালালকে সম্পাদক করার সময়কালে কমরেড আব্দুল হক তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। কমরেড নূর জালালের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় কমরেড আব্দুল হক কমরেড নূর জালাল সম্পর্কে বলেছিলেন কমরেড নূর জালাল স্বল্প শিক্ষিত ও মার্ক্সবাদের পর তার লেখাপড়া নাই বললেই চলে।
চলবে/১৪



