
মোহাম্মদ আলী : নারী জাগরণের অগ্রণী বীরযোদ্ধা বেগম রোকেয়া। যাকে বাঙ্গালি নারীজাগরণের অগ্রদূতও বলা হয়ে থাকে। একজন স্বশিক্ষিত নারী। বিবিসি বাংলার এক জরিপে তিনি “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি” তালিকায় অন্যতম। নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও তিনি অন্য নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আজীবন লড়াই করে গেছেন। কুসংস্কারে নিমজ্জিত একটি অন্ধকার সমাজ ব্যবস্থার ধ্যান ধারণা থেকে তিনি নারী জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন।
১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেগম রোকেয়ার জন্ম। তাঁর বাবা ও মা দুজনই ছিলেন উচ্চ বংশীয় ও জমিদার পরিবারের। তাঁর বাবা জমিদার হলেও ছিলেন অত্যন্ত রক্ষণশীল। ফলে ঘরের বাইরে যাওয়া ছিলো তাঁর জন্য অত্যন্ত দুষ্কর। এটা শুধু তাঁর জন্যই নয়, সে সময়ের সমাজ ব্যবস্থাটাই ছিলো এমন। এই এলাকায় ধর্মীয় প্রকৃত শিক্ষার অভাব ছিলো। ফলে ধর্মীয় কুসংস্কারে আক্রান্ত ছিলো সমাজ ব্যবস্থা। এতোসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত। নারী শিক্ষা, নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভুমিকাচির স্বরণীয় হয়ে থাকবে।
রোকেয়ার জন্মস্থান ছিলো নারী শিক্ষায় পিছিয়ে। পায়রাবন্দে জমিদার পরিবারে ছেলেদের জন্য লেখাপড়ার সুব্যবস্থা থাকলেও মেয়েদের জন্য তেমন কেনো ব্যবস্থা ছিলোনা। পর্দারনামে মেয়েদেরকে বাড়ির ভেতরে থাকতে হতো। তাই পড়াশুনা তো দূরের কথা কোন প্রয়োজনেই নারীরা সহজে বাড়ির বাইরে যেতে পারতেন না। পর্দা ব্যবস্থার বিপক্ষে রোকেয়ার অবস্থান ছিলোনা বরং পর্দার নামে সামাজিক কুসংস্কারের বিপক্ষে তাঁর বক্তব্য ছিলো সুস্পষ্ট। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, পর্দা মানে ঘরে বন্দী থাকা নয়, শিক্ষা থেকে বিরত থাকা নয়।
ইসলাম কখনো নারীশিক্ষার বিষয়ে কম গুরুত্ব দিতে বলেনি। মহানবী (সা) বলেছেন “সকল মুসলিম নর-নারীর উপর জ্ঞানার্জন ফরজ”। অপরদিকে মুসলিম নর-নারী উভয়ের জন্যই পৃথক পর্দার বিধান রয়েছে। নিজ নিজ পর্দা মেনে নিজনিজ শিক্ষা গ্রহণে কোনো বাধা থাকার কথা নয়। তাই ঊনবিংশ শতাব্দির শেষার্ধে পর্দারনামে নারীদেরকে চার দেওয়ালের ভেতরে রাখার যে কুসংস্কার প্রচলন ছিলো তা ভেঙ্গেছেন বেগম রোকেয়া।
বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত নারী। পিত্রালয়ে তিনি বড় বোনের কাছে বাংলা ও তাঁর বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ইংরেজি শিখেছেন। প্রতিরাতে মোমবাতিজ্বালিয়ে বড় ভাইয়ের সান্বিধ্যে তিনি লেখা-পড়া করেছেন। ষোল বছর বয়সে বিয়ে হয় (১৮৯৬) একজন উচ্চিশিক্ষত ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে। তাঁর স্বামীর ছিলো এটা দ্বিতীয় বিয়ে। আগের স্ত্রীর এক মেয়ে রেখে মারা যাওয়ায় তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বড় ভাই ইব্রাহীম সাবের ছিলেন এই বিয়ের উদ্যোক্তা।
স্বামী অবাঙ্গালী হলেও তাঁর কুসংস্কার মুক্ত, উদার ও শিক্ষানুরাগী মনের ছোঁয়া পেয়ে তাঁরা খুব সুখেই দাম্পত্য জীবন যাপন করছিলেন। উচ্চ শিক্ষিত স্বামীর ঘরে তিনি লেখা পড়ায় আরো মনোনিবেশ করেন। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর পরই স্বামী সাখাওয়াত হোসেন দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হন। দুটি চক্ষু নষ্ট হয়ে যায়। বেগম রোকেয়া তাঁর স্বামীর চক্ষু হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি গভীর অনুরাগে স্বামীর রোগ শয্যার পাশে তাকে নানা বিষয়ে পাঠকরে শোনাতেন। বিবাহিত জীবনের বেশিরভাগ সময় বেগম রোকেয়াকে শুধু স্বামীর রোগে নিরলস সেবা করতে হয়েছে। অসুস্থ্য স্বামীর সেবায় তিনি কখনো ক্লান্তি বোধ করেননি। ১৯০৯ সালেসাখাওয়াত হোসেন ইন্তেকাল করেন। তেইশ বছর দাম্পত্য জীবনকালে রোকেয়া দুই সন্তানের জননী ছিলেন। কিন্তু তিনি মাতৃত্বের পূর্ণ স্বাধ আস্বাদন করতে পারেননি। প্রথম শিশুকন্যা মাত্র পাঁচ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় শিশুকন্যা চার মাস বয়সে অকালে মৃত্যু বরণ করে।
স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তাঁর প্রথম পক্ষের মেয়ে ও জামাতার দূর্ব্যবহারে নি:সম্বল অবস্থায় স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কোলকাতায় বসবাস করেন। তিনি কলকাতায় একটি গার্লস স্কুল স্থাপন করেন। তাঁর জীবনে এতোঘাত-প্রতিঘাত এবং প্রতিবন্ধকতা সত্বেও তিনি নারী অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়ন আন্দোলনে পিছপা হননি। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও লেখালেখি চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, ভাষাবিদ, দার্শনিক, সমাজ-সংস্কারক ও মানবতাবদী ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখা পরবর্তীতে গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে; যা আজোদেশ-বিদেশে পাঠক সমাদৃত।
বেগম রোকেয়া নারীজাগরণের শুধু স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেননা বরংতাঁর স্বপ্ন-সাধনা, লালিত বোধ-বিশ^াস ও আদর্শকে বাস্তবে রোপায়নের জন্য স্বীয় সমাজে বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের আয়োজনও করেছিলেন। তাঁর কর্মকা-শুধু মুসলিম নারী নয় বাংলার সকল নারী জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
আজ রোকেয়া নেই। তাঁর কর্ম রয়েছে। তিনি নারীশিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখন নারী শিক্ষার পৃথক স্কুল আছে, কলেজ আছে। আছে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ^বিদ্যালয়। নারীরা এগিয়ে চলেছে পুরুষের সমান। রোকেয়ার জন্মভূমি রংপুরেই হয়েছে তাঁর নামে বিশ^বিদ্যালয়। বাংলাদেশের স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিশ^বিদ্যালয়ের নামকরণ করেছেন। এই বিশ^বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েরা পড়াশুনা করে। তবে এই বিশ^বিদ্যালয়ে মেয়েরা ভালো করছে। এই বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন ছাত্রী শিক্ষা ক্যাডারে সারা দেশে ফার্ষ্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। গত ১৫ আগস্ট এই বিশ^বিদ্যালয়ে জাতির পিতাকে নিয়ে একটি রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। এতে ১৮ জন বিজয়ীরমধ্যে ১২জনই ছিলো মেয়ে।
যদি রোকেয়া বেঁচে থাকতেন তবে তিনি খুশি হতেন; এদেশ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী, জাতীয় সংসদের স্পীকার নারী, জাতীয় সংসদের সদস্যগণের উল্লেখ যোগ্য একটি অংশ নারী। এক সময়ে গোটা বাংলায় মাত্র একজন নারী গ্রাজুয়েট পাওয়াগি য়েছিলো, এখন কয়েকটি বিশ^দ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য পদে নারী। বাংলাদেশ নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ক্রিকেটেও নারী খেলোয়ারদের সাফল্যের স্বাক্ষর রয়েছে। প্রশাসনের উচ্চ আসনে নারীর উল্লেখ যোগ্য অবস্থান রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
আমরা আশাবাদী, নারীর উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে নজির সৃষ্টি করবে। কারণ, এদেশে এখনো রোকেয়ার উত্তরসূরীরা আছেন; রোকেয়ার দর্শন ও রোকেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা সদা জাগ্রত। এই সমাজ কুসংস্কার মুক্ত হোক। সার্বজনী নশিক্ষা নিশ্চিত হোক। বাল্যবিবাহ মুক্ত হোক। নারী-পুরুষ কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে সমানে সমান এগিয়ে যাক। জয় হোক এদেশের সকল নারী-পুরুষের।
লেখক : উপ-পরিচালক (জনসংযোগ),বেগম রোকেয়াবিশ^বিদ্যালয়, রংপুর




