শান্ত সিংড়া অশান্ত বামিহাল গ্রাম! আবারো অশান্ত সিংড়ার বামিহাল

নাটোর প্রতিনিধি : আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে নাটোরের সিংড়ার সুকাশ ইউনিয়নের বামিহাল গ্রাম। গত ৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি হামলায় জোড়া খুনের ঘটনায় পুরুষশূন্য গ্রামে এখন সুনসান নীরবতা। এরই ১০ দিন পর গত বুধবার ভোরে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার পাটগারী এলাকা থেকে শুকাস ইউনিয়ন আলীগের সহসভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং ফরিদ গ্রুপের প্রধান ফরিদ উদ্দিনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আবারো আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত নাটোরের সিংড়ার বামিহাল গ্রাম । এলাকায় পুলিশ মোতায়েন থাকলেও মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
গত দেড় যুগের অধিক সময়ে বামিহাল চলা সংঘর্ষ ও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই বাহিনীর তিন প্রধান এবং তিন পুলিশ সদস্যসহ মোট ১২ জন। হাত পা হারিয়ে পঙ্গত্ব বরণ করেছেন অনেকেই। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসিন দলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা একাধিক গ্রুপ আধিপত্য বিস্তারে একে অপরের ওপর হামলা চালানো হয়। এছাড়া এলাকাটি চলনবিলের প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় এক সময় নিষিদ্ধ সংগঠন সর্বহারাদের অবাধ পদচারনা ছিল। এজন্য এই বামিহাল এলাকায় স্থাপন করা হয় পুলিশ ক্যা¤প। গত প্রায় দেড় যুগে তিন আমর্ড পুলিশ সহ ৯জন সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বহারাদের হামলায় ৩ আমর্ড পুলিশ নিহত হন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে ২০০৩ সাল থেকে এই গ্রামে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে নেতৃত্বের আধিপত্ত্য। এই সময় সর্বহারাদের কার্যক্রম স্থিমিত হয়ে পড়ে। তবে ২০০৫ সালে বামিহাল পুলিশ ফাঁড়িতে সর্বহারা সদস্যরা হামলা চালিয়ে ফাঁড়ি লুট সহ ৩ আমর্ড পুলিশকে হত্যা করে। এই ঘটনার পরবর্তী সময়ে বামিহাল পুলিশ ফাঁড়ি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।এই পুলিশ ফাঁড়ি প্রত্যাহার করার পর থেকে এলাকার আধিপত্য নিয়ে বিএনপি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা কুদ্দুস বাহিনীর সাথে আফজাল বাহিনীর বিরোধ চরমে ওঠে। শুরু হয় হামলা -পাল্টা হামলার ঘটনা। ২০০৩ সালে আফজালের অনুসারি আফতাব খন্দকারের মা চা¤পা বেগম সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন। এদিন প্রতিপক্ষ কুদ্দুস অনুসারিরা আফতাবের বাড়িতে হামলা চালায়। কিন্তু তাকে না পেয়ে তার মা চা¤পা বেগমকে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ডই বামিহাল গ্রামের প্রথম খুনের ঘটনা । এর পর থেকে শুরু হয় একে অপরের ওপর হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা। এর পর একে একে খুনের ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিপক্ষদের হামলায় খুন হন শাজাহান, আনসার আলী,সোহান,আইয়্যুব আলীসহ ৫ জন। ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলেও এদের রাজনৈতিক পরিচয়ও পরিবর্তন হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় আসার পর আফজাল বাহিনী দল পাল্টে আওয়ামীলীগ বনে যান। অপর দিকে কুদ্দুস বাহিনীর অনুসারিরা কুদ্দুসের ভাই ফরিদ উদ্দিনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ বনে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৩ সালে ফরিদ ও কুদ্দুস বাহিনীর অনুসারিরা ১ নং ওয়ার্ড মেম্বার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিলকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে। একই বছরে ফরিদ উদ্দিন অস্ত্র সহ র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে ফরিদ ফেনসিডিল সহ বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া থানায় গ্রেফতার হন। ২০১৯ সালে আফজাল বাহিনীর প্রধান আফজাল ও তার ভাই আনসার বন্দুক যুদ্ধে নিহত হওয়ার পর আফতাব খন্দকার এই গ্রুপের নেতৃত্বে আসেন। এসময় আফতাব ওর্য়াড আওয়ামীলীগের সাধারন স¤পাদক হন।
সন্ত্রাসী হামলার শিকার ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি আব্দুল জলিল বলেন,বামিহাল গ্রামের নেতৃত্বদানকারীরা সুযোগ সন্ধানী। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখনই এরা ভোল পাল্টে সেই দলেই ভিড়ে যায়। এরা প্রভাবশালী হওয়ায় এদের ভয় পায় সাধারন মানুষ। দলীয়ভাবেও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়না। তবে প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও অদৃশ্য শক্তির বলে ছাড়া পেয়ে যায়। পরবর্তীতে অদৃশ্য ওই শক্তির চাপে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়,ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ফরিদ উদ্দিনের অনুসারি দুলাল আকন্দের বাড়ি থেকে পুলিশ সম্প্রতি চোরাই বৈদ্যুতিক মোটর উদ্ধার করে। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়। তারা জামিনে বের হয়ে আসার পর থেকে এনিয়ে উত্তেজনা দেখা দেয়। গত ৯ অক্টোবর ৮টার দিকে আফতাবের নেতৃত্বে তার কয়েকজন অনুসারী বর্তমান ইউপি সদস্য ফরিদ উদ্দিনের অনুসারী আবু মুসাও রুহুল আমিনের দোসাপাড়ার বাড়িতে হামলা চালায়। এ ঘটনার জেরে বামিহাল বাজারে আফতাব ও তার সমর্থকদের ওপর পাল্টা হামলা করে রুহুল ও মুসার লোকজন । দুই পক্ষের এই সংঘর্ষের সময় আফতাব, রুহুল আমিনসহ দুপক্ষের অন্তত ৪ জন আহত হয়। আহতদের সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত ডাক্তার আফতাবকে মৃত ঘোষনা করেন। রুহুল আমিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ অক্টোবর ভোর ৪ টার দিকে মারা যায়। এ ঘটনায় ১০ অক্টোবর দুগ্রুপের ৬২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ১৫ জনকে আসামি করে সিংড়া থানায় দুটি পৃথক হত্যা মামলা করা হয়। এর একটি মামলার প্রধান আসামি হওয়ার পর থেকে ফরিদ উদ্দিন পলাতক ছিলেন।বুধবার ভোরে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার পাটগারী এলাকা থেকে ফরিদ উদ্দিনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বামিহাল গ্রামের এক বৃদ্ধ জানান, পাল্টাপাল্টি মামলায় অপরাধ না করেও মামলার আসামি হয়েছেন বামিহাল গ্রামের অনেকেই। তাই গ্রেফতার আতংকে গা ঢাকা দিয়েছে গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের পুরুষ সদস্য। তাই এখানকার নারী ও বৃদ্ধদের দিন কাটছে আতংকে, অনাহার আর অর্ধাহারে। এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আরও তৎপর হবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনটা প্রত্যাশা করেন তিনি।
সুকাশ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এই সন্ত্রাসী জনপদ হিসাবে বামিহাল পরিচিত পাওয়ায় জনপ্রতিনিধি হিসাবে তিনিও বিব্রত। যারা যেভাবেই ইন্ধন দিয়ে এই জনপদকে অশান্ত করে তুলেছেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে এসে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনবে প্রশাসন।
গ্রামের অধিকাংশ নারী, শিশুরা অপরিচিত ব্যক্তিদের দেখলেই দ্রুত বাড়ির ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছেন। ভয়াবহ আতংক আর থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে পুরো গ্রাম জুড়ে। নিহত পরিবারের লোকজনও কথা বলতে আগ্রহী না। নিহতের স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিশোধ নেবার কথা বলতে শোনা যায় সবাইকে।
সিংড়া সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জামিল আকতার জানান, খাসজমি, পুকুর দখলসহ নানাবিধ কারণে আফজাল ও ফরিদুল গ্রুপের সৃষ্টি হয়। বন্দুকযুদ্ধে আফজাল মারা গেলে তার স্থান দখল করে আফতাব। পুনরায় শুরু হয় আফতাব আর ফরিদুল গ্রুপের সহিংসতা। বিবদমান দুটি গ্রুপের পাল্টাপাল্টি হামলায় বিভিন্ন সময়ে হাসেম আলী, আব্দুল মান্নান, চ¤পা বেগম, শাজাহান আলী, আনসার আলী, সেলিম হোসেন নিহত হন। ২০০৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বামিহাল পুলিশ ফাঁড়ি লুটের ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন পুলিশ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দুপক্ষের প্রধান ফরিদুল, আফজাল ও আফতাব আসামি ছিলেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর আফতাব বাহিনীর প্রধানসহ দুটি খুনের ঘটনা এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ফরিদুল খুনসহ নিয়ে দেড় যুগে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ ও হামলায় দুই বাহিনীর প্রধানসহ মোট ১২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর ভবিষ্যতে যেন এখানে হানাহানি, খুনাখুনি না হয় সেজন্য কঠোর অবস্থানে আছে তারা। ইতোমধ্যে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আফতাব হত্যা মামলায় নাজিম উদ্দিন নামে একজনকে এবং রুহুল হত্যা মামলায় রবিউল ইসলাম, আলী হাসান, জুয়েল ইসলাম, হাবিবুর রহমান নামে চারজনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করে। অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে। পুরো গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা আছে। বামিহালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জোর চেষ্টা অব্যাহত আছে।




