অর্থনৈতিক সংবাদ

শ্রমিকদের বাৎসরিক ৫% ইনক্রিমেন্ট স্থগিতের পাঁয়তারা বন্ধের দাবিতে স্মারকলিপি

মালিকপক্ষ কর্তৃক করোনার অজুহাতে শ্রমিকদের বাৎসরিক ৫% ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করার পাঁয়তারা বন্ধের দাবিতে এবং শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন ও ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধির দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের পক্ষ থেকে আজ ১৭ জানুয়ারি ২০২১ রবিবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সমাবেশ শেষে শ্রম মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হয়।
জোটের সমন্বয়ক শামীম ইমামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আমেনা আক্তার, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার, বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস এন্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইয়াসিন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ, গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মাসুদ রেজা, বাংলাদেশের সোয়েটার গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এএএম ফয়েজ হোসেন, গার্মেন্টস শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সংগঠক বিপ্লব ভট্টাচার্য।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, “আমরা মনে করি, মালিকপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখার চিঠি বা আবেদন বেআইনি, অনৈতিক ও অমানবিক। মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রমিক-কর্মচারীদের বর্তমান বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করাটাই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই বিভিন্ন খাতে যেখানে বেতন-ভাতা কমিয়ে দিয়েছে, সেখানে পোশাক খাতে ৫% বৃদ্ধি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়।’
অথচ সত্যি হচ্ছে, এই করোনাকালে যখন পৃথিবীর অন্যান্য দেশে শিল্প মালিকরা অনুদান দিয়ে বা মন্ত্রী, এমপি ও জনপ্রতিনিধিদের বেতনের একটা অংশ করোনা আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ দিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি নিশ্চিত করেছে বলে জানা যায়। যেমন: জার্মানি তার দেশের শ্রমিক কর্মচারীদের ৬০ থেকে ৬৭ শতাংশ বেতন, ফ্রান্সে ১০০ ভাগ বেতন, যুক্তরাজ্যে ৮০ ভাগ বেতন এবং আমেরিকাতে প্রতিটি নাগরিক ১২’শ ডলার এবং শ্রমিক, কর্মচারীদের সরকার ৬ মাসের বেতনের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। তখন ইতোমধ্যে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, গার্মেন্টস মালিকরা শুধু শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে ৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা পাওয়ার পরেও প্রণোদনাপ্রাপ্ত পোশাক কারখানা থেকে কয়েক লক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করেছে (বিলস্ এর তথ্য অনুযায়ী, করোনাকালে তিন লাখেরও বেশি গার্মেন্টস শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে।)। এখন আবার তারা ৫% ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করার জন্য এই বেআইনী, অনৈতিক ও অন্যায্য আবেদন করেছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গার্মেন্টস মালিকরা সুুযোগ পেলেই পুরো শিল্পের কথা না ভেবে শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নানা অজুহাতে সুযোগের অসৎ ব্যবহার করেন, যা অনৈতিক ও অন্যায়। করোনাকালে স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী এবং পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের প্রয়োজনে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও মালিকরা শ্রমিকদের রক্ষার দায়িত্ব তো নেয়ইনি, বরং ৩৫% কম মজুরি দিয়েছে, উৎসব ভাতা অর্ধেক দিয়েছে। এখন বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট বন্ধ রাখার অবেদন করেছে।”
সমাবেশে নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, “আমরা জানি, প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি হওয়ার সাথে সাথে পণ্যের দাম বাড়ে, জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়ে, যে কারণে এই ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি শ্রম আইনে ও ওয়েজ বোর্ডে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ বছর প্রায় ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হওয়ায় আগের বছরের থেকে শতকরা ৬ শতাংশ হারে পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে গতবারের চেয়ে ৬ শতাংশ হারে বেতন কমেছে। আইন অনুযায়ী এই ডিসেম্বর মাসে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিলেও আগের বছরের চেয়ে ১ শতাংশ হারে কম থাকবে। এমত অবস্থায় করোনা ও মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করে শ্রমিকদের মজুরি আরও বাড়ানো জরুরী। কিন্তু মালিকপক্ষ প্রতিবারের মত উল্টো পথে হাঁটছেন। মালিকদের এই বেআইনি ও অন্যায় আবেদন কার্যকর হলে বাস্তব কারণেই শ্রম পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, গার্মেন্টস শিল্প তথা দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা আমাদের কাম্য নয়।
আমরা মালিক সমিতি কর্তৃক এ বছর গার্মেন্টস শ্রমিকদের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করার আবেদনকে মালিকদের শোষক ও ঠগ চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। তাই আমরা করোনার অজুহাতে মালিক সমিতি কর্তৃক দেওয়া এই অন্যায় আবেদন গ্রহণ না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সাথে সাথে ইনক্রিমেন্ট বন্ধ না করে, শ্রমিকদের ঝুঁকি ও মহার্ঘ্য ভাতা প্রদান এবং আইনানুযায়ী দ্রব্যমূল্যসহ জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মজুরি পুনর্নির্ধারণ করার এবং শ্রমিকদেরকে বিনামূল্যে করোনার ভ্যাকসিন দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
নেতৃবৃন্দ গার্মেন্টস শ্রমিকদের ৫% ইনক্রিমেন্ট স্থগিতের পাঁয়তারা বন্ধের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যে সকলের প্রতি আহ্বান জানান। সমাবেশ শেষে শ্রম মন্ত্রণালয় বরাবর স্মারকলিপি পেশ করা হয়।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button