
দুইবছর আগে নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা এখন আর নিজেদের অসহায় ভাবতে রাজি নয়। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া বা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার বিষয়ে তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে চায়। নিজেদের স্বার্থরক্ষায় তারা গড়ে তুলেছে রাজনৈতিক সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ)। এরই মধ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সভায় যোগ দিয়েছেন এই সংগঠনের নেতা মাস্টার মহিবুল্লাহ ও নুরুল আলম। নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা সাক্ষাৎকরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পূর্তিতে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের বর্ধিত-৪ নং ক্যাম্পের মাঠে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস বা এআরএসপিএইচ জানিয়ে দিয়েছে তাদের শক্তি ও সামর্থ্যের কথা। এই সমাবেশে সংগঠনটির নেতারাপরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে, রোহিঙ্গাদের সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গারাই নেবে। বাংলাদেশ চাইলেই তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পারবে না।
মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকায় পালিয়ে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। অনেকটা ‘এক কাপড়ে পাড়ি দিয়েছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গা। উদ্বাস্তু হয়ে আসা এসব রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে অস্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন। তবে উদ্বাস্তু এসব রোহিঙ্গাদের অনেকেই এখন ওই এলাকায় ক্যাম্পের ভেতরে হরেক রকমের দোকানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। অনেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছেন। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ত্রাণে ভরছে পেট, ব্যবসা-চাকরির টাকায় ভরছে পকেট।
এভাবে দুই বছরের মাথায় কক্সবাজারে অনেকটা জেঁকে বসেছে লাখ, লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে।আর এ দুই বছরেই গলার কাঁটা হয়ে রোহিঙ্গাদের মধ্যে স্বদেশে ফেরার কোনো তাড়াই নেই।বরং বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে থাকার পায়তারায় তারা গড়ে তুলেছে রাজনৈতিক সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ)। এই ব্যানারে সংগঠনটির নেতারা বাংলাদেশ সরকারের সমালোচনা করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতির পরও গত ২২ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস উসকানিতেই মূলত শেষ মুহূর্তে বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আবারও স্থগিত করা হয়েছে।এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর একই রকমের একটি প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ রোহিঙ্গাদের অনাগ্রহের কারণেই ভেস্তে যায়।এ খবরে স্থানীয় লোকজনকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেলেও ওই এলাকার রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ ও কতিপয় এনজিওগুলোর মাঝে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।
রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস আর্থিক সহায়তা দিয়ে উজ্জীবিত রাখতে সহায়তা করছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আইএনজিও। এরা মিয়ানমার সরকারের পক্ষে কাজ করছে বলে অভিযোগ আছে।
চলতি বছর মিয়ানমারের মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার ইয়াংহি লি ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা শিগগিরই ফিরে যাবে না।
মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের জন্য ‘সেফ জোন’ (নিরাপদ অঞ্চল) গড়ার প্রস্তাব ও কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে নেওয়ার পরিকল্পনার ব্যাপারেও তিনি উদ্বেগ জানান। আর ইয়াংহি লি’র বক্তব্যের সঙ্গে মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের নেতাদের কথায়।
সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং,বালুখালী এলাকার কয়েকটি ক্যাম্পে ঘুরে বিভিন্ন বয়সী শতাধিক রোহিঙ্গার সঙ্গে আলাপকালে তাদের ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের একজনও ফেরার আগ্রহ দেখায়নি। সবাই বলেছে, মিয়ানমারে তাদের ফেরার পরিবেশ নেই। তাদের ওপর যে নিপীড়ন হয়েছে তার বিচার, ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব—এসব পাওয়ার পরই ফেরার প্রশ্ন আসবে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই বোধ জাগিয়ে তুলেছে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের নেতারাই। অন্যদেশে আশ্রয়ে থেকে এই সংগঠনটির কোনো কোনো নেতা রোহিঙ্গাদের জন্য ‘স্বাধীন দেশ’ গড়ে তোলার কথাও বলছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে আসা বিদেশি সহায়তার পরিমাণ আগের চেয়ে কমেছে। বিদেশি সহায়তার একটি বড় অংশ সরাসরি চলে যাচ্ছে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনটি কাছে। এই তহবিলেই সাংগঠনিকভাবে রোহিঙ্গাদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে কাজ করছে সংগঠনটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেভাবে রাজনৈতিকভাবে দিন দিন রোহিঙ্গারা শক্তি সঞ্চয় করছে, তাদের অতি দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো না হলে এটি ফিলিস্তিনের মতো ভয়াবহ সংকটে রূপ নিতে পারে।
সুত্র : পূর্বপশ্চিম




