রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাশিয়া ও চীন আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
‘রোহিঙ্গা সংকট বড় জটিল। এর কোনো একরতফা সমাধান নেই। এই সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তবে এই সমস্যা সমাধানে এরমধ্যেই কিছু ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে এই ইস্যুতে রাশিয়া এবং গণচীন তার পূর্বের অবস্থান থেকে অনেকটা সরে এসেছে। এই সমস্যা সমাধানে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। বৃহত্তর স্বার্থে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষায় যে অভ্যন্তরীণ কৌশল ডিজাইন করা হয়েছে তাতে করে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। এই সমস্যা অনেকদিন ধরে চললে এই অঞ্চলে কিছু অনিশ্চয়তা দেখা দিবে এবং কোনো রাষ্ট্রের জন্যেই মঙ্গলজনক হবে না। চীন ও ভারতকে বুঝাতে হবে রোহিঙ্গা সংকট যদি দীর্ঘদিন বজায় থাকে তাহলে তা তাদের জন্যও ভবিষ্যতে সংকট তৈরি করতে পারে’।
আজ রবিবার বাংলাদেশ চলচিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে (বিএফডিসি) ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ও এটিএনবাংলা আয়োজিত ইউসিবি পাবলিক পার্লামেন্টে বিতর্ক প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ডফাইনালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে আবদুল মোমেন এ সব কথা বলেন। প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। গ্র্যান্ড ফাইনালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজিকে পরাজিত করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন হয়।
ড. এ. কে আবদুল মোমেন আরও বলেন, অনেকেই মনে করেন জাতিসংঘে কোনো সংকট উত্থাপন করলেই তার সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৭৮ সালে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে আমরা জাতিসংঘে গেলেও ভারত তখন জাতিসংঘের কোনো চাপ ভ্রুক্ষেপ করেনি। ঠিক একইভাবে ইরান-ইরাক এবং সিরিয়া সংকটও কিন্তু জাতিসংঘ সুরাহা করতে পারেনি। শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে আমরা রোহিঙ্গা সংকটের সুন্দর সমাধানে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উভয়ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমরা শাখের করাতের মধ্যে আছি। মিয়ানমার মাঝে মাঝে বিভিন্ন উস্কানি দিলেও আমাদের কথা শোনে। যেমন- তাদের ওয়েবসাইটে আমাদের সেন্টমার্টিন তাদের বলে দাবি করার পর আমরা প্রতিবাদ করলে তা আবার সরিয়ে নেয়। মিয়ানমারকে আমরা একটি ‘সেফ জোন’ তৈরি করার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তচ্যূত লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ এক উচ্চ মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে। যে গণহত্যার ইতিহাস থেকে লাখো লাখো রোহিঙ্গার জীবনের মুক্তি মিলেছে বাংলাদেশের মানুষের উদারতার কারণে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দিলে পৃথিবীতে বড় ধরনের এক ‘গণহত্যা’র ইতিহাস তৈরি হতো। তাই এই সংকট উত্তরণে আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত-চীনসহ সার্ক, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে পৃথিবীর পরাশক্তি সম্পন্ন দেশগুলোকে একত্রিত করে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে এই বাস্তচ্যূত মানুষগুলোকে তাদের বাসভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়ার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। তবে বাংলদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যেভাবে এগুচ্ছে তা অত্যন্ত সন্তোষজনক। কারণ এই সংকট মোকাবিলা করতে গিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ হানাহানির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু এই ১১ লাখ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান চিকিৎসা সেবা প্রদান বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এই সমস্যা সমাধানে বন্ধুপ্রতীম আঞ্চলিক প্রধান দুই দেশে ভারত ও চীনের পাশাপাশি বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর সরকারের মদদে মিয়ানমারের সশস্ত্রবাহিনীর পরিকল্পিত আক্রমণ ছিল সম্পূর্ণ মানবাধিকার বিরোধী। রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সহনশীলতার পরিচয় দিলেও মিয়ানমারের একগুয়েমির কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষের খেতে পারলে বাস্তচ্যূত রোহিঙ্গারাও আমাদের সঙ্গে খেতে পারবে। প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিকতা সারাবিশ্বে ইতিহাস হয়ে থাকবে।
গ্র্যান্ড ফাইনাল প্রতিযোগিতা শেষে ট্রফি ক্রেস্টসহ চ্যাম্পিয়ন দল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিকে নগদ দুই লাখ টাকা, রানার আপ দল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজিকে এক লাখ টাকা এবং তৃতীয় স্থান অধিকারী ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি দলকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হয়।
উল্লেখ্য, এবারের ইউসিবি পাবলিক পার্লামেন্ট-২০১৮ প্রতিযোগিতায় সরকারি বেসরকারি মোট ৩২টি বিশ্ববিদ্যালয় অংশগ্রহণ করে। ইত্তেফাক।




