
মোঃ কামরুল ইসলাম, রাঙামাটি: ঢাকার বাংলা একাডেমির মিলনায়তনে আলোকোজ্জ্বল পরিবেশ। মঞ্চের সামনের সারিতে বসে আছেন দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখা কয়েকজন মানুষ। দর্শকসারিতে পরিবেশকর্মী, গবেষক, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। এই আসরে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হন রাঙামাটি সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা।
গত শনিবার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁকে দেওয়া হয় ‘ব্র্যাক ব্যাংক-তরুপল্লব দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক ২০২৪’। তাঁর হাতে পদক তুলে দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
প্রকৌশলী হয়েও সবুজ চাকমার পরিচয় কেবল অফিসকেন্দ্রিক নয়। প্রায় এক দশক ধরে পাহাড়ি এলাকায় প্রকৃতি সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি থেকে শুরু করে হাতে-কলমে উদ্যোগ সবকিছুই চালিয়ে আসছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে।
তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংগঠন ‘প্লানটেশন ফর নেচার’ ইতোমধ্যে ৮৭ হাজার ৫৬০টি পাখিবান্ধব চারা বিতরণ ও রোপণ করেছে। খাগড়াছড়িতে কর্মরত অবস্থায় সড়কের দুপাশে তিনি লাগিয়েছেন প্রায় চার হাজার জ্যাকারান্ডা গাছের চারা। রাঙামাটিতে এসে তিনি নকশা করেন সওজ লেক ভিউ গার্ডেন, যা আজ স্থানীয়দের বিনোদন ও প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়ার জায়গা হয়ে উঠেছে।
সবুজ চাকমার আরেকটি পরিচয় তাঁর আলোকচিত্র। হাতে ক্যামেরা নিয়ে তিনি পাহাড়ি অরণ্যে ঘুরে বেড়ান, খুঁজে ফেরেন পাখি ও বন্যপ্রাণীর জীবন। তাঁর তোলা ছবিতে ধরা পড়ে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির জীববৈচিত্র্যের অজস্র অজানা গল্প। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিনটি একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এসব প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা দেখেছেন শুধু ছবি নয়, প্রকৃতির প্রতি এক ধরনের ভালোবাসার বার্তাও।
দ্বিজেন শর্মা ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রকৃতিবিদ ও বিজ্ঞানলেখক। তাঁর প্রয়াণের পর ২০১৭ সাল থেকে তরুপল্লব সংগঠন এ পদক চালু করে। প্রতিবছর প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তিনজন ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ বছর সেই তালিকায় যুক্ত হলো সবুজ চাকমার নাম।
পুরস্কার হাতে পাওয়ার পর আবেগাপ্লুত হয়ে সবুজ চাকমা বলেন, প্রকৃতি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি আমার দায়বদ্ধতা থেকেই এ কাজগুলো করেছি। এই স্বীকৃতি আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করবে। চাই, নতুন প্রজন্ম প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে উঠুক, শিখুক প্রকৃতিকে ভালোবাসতে।
রাঙামাটির পরিবেশকর্মী দীপংকর চাকমা বলেন,“সবুজ দা শুধু একজন প্রকৌশলী নন, তিনি আমাদের পাহাড়ের প্রকৃতিপ্রেমী বন্ধু। তাঁর হাতে লাগানো গাছগুলো আজ সবুজে ভরে যাচ্ছে। এই পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য।
সবুজ চাকমার কাজ এখন স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও অনুপ্রেরণা ছড়াচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী তাঁর উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। তাঁর আলোকচিত্র দেখে পাহাড়ি কিশোররা বন্যপ্রাণী চিনতে শিখছে,সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝছে।



