বিপ্লবী মিরান উদ্দিন মাস্টার : একজন ভাষা সংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা

মো. নজরুল ইসলাম : ভাষা সংগ্রামী মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আজীবন বিপ্লবী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টর প্রবীণ সদস্য কমরেড মিরান উদ্দিন মাস্টার(৮৭) ৮ জুন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন তার মেয়ের ভাড়া বাসায় বার্ধক্যজনিত কারনে শেষ নি:শ^াস ত্যাগ করেন। তিনি মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলাধীন কাকনা গ্রামে ১৯৩৩ সালের ৫ জুন জন্মগ্রহন করেন। কৃষিভিত্তিক যৌথ পরিবারে প্রকৃতির সাথে খেলা করেই বড় হয়েছেন মিরান উদ্দিন। ছাত্র জীবন থেকেই ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। জেলার ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রী কে এন ইনিস্টিউশনে ১৯৪৮ সালে নবম শ্রেণীর ক্যাপ্টেন থাকা অবস্থায় অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশিষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতা কমরেড প্রমথ নাথ সরকার এর দুষ্টিতে আসেন এবং তার প্রেমে আকৃষ্ট ও সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উজ্জিবিত হয়ে ”মাতৃভাষা বাংলা চাই,উদ্দুভাষা মানিনা মানব না” এই দাবি নিয়ে স্কুলে স্কুলে রিপলেট বিলি করেন ও তার নেতৃত্বে স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে একটি বিশাল মিছিল মানিকগঞ্জ মহুকুমা মুখী আসতে চাইলে পুলিশ বাধা দিয়ে চত্রভঙ্গ করেন এবং ৪ জনকে গ্রেফতার, হামলা মামলা ও হুলিয়া জারি করেন। তারপর থেকেই তিনি প্রথম সারির নেতৃত্বে আসেন এবং পূর্ব বাংলার ছাত্র ইউনিয়নের সাথে ওতোপতভাবে জরিয়ে পরেন। কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় জীবনেও তিনি ছাত্র ইউনিয়নের নীল পতাকার প্রথম সারির সৈনিক ছিলেন।
কমরেড প্রমথ নাথ নন্দীর সহযোগীতায় একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তারপর নিজগ্রামে কাকনা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনেক এবং সেই স্কুলেও শিক্ষকতা করেন। বিপ্লবের নেশায় চিরকুমার কমরেড প্রমথ নন্দীর সহচর্য্যে থেকে বিবাহ ও সংসারের কথা শুনতেই পারতেন না। ১৯৬৯ সালে গণঅভুথানের সময় কমিউনিস্টদের নেতৃতে কৃষক সমিতির আয়োজনে ঢাকায় যে বিশাল মহাসমাবেশ হয়েছিল সেই সমাবেেেশর জমায়েত নিয়ে পায়ে হেটে বেতিলা আনোয়ার চৌধুরী ও ডা.চিত্ত সাহার বাড়িতে বিরতি দিয়ে তার পরের দিন ঢাকায় সমাবেশ যোগদান করার যে ঐতিহাসিক ঘটনা তার অন্যতম একজন হলেন ততকালীন মানিকগঞ্জ মহুকুমার কৃষক সমিতির সাধারন সম্পাদক কমরেড মিরান উদ্দিন মাস্টার।
মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট-ছাত্র ই্উনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহীনির সদস্য হয়ে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। চোখে মুখে বিপ্লবের স্বপ্ন,নন্দী বাবু বলে এই তো বাকশালের মাধ্যমেই সমাজতন্ত্র হবে। রাশিয়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগীতা কররেছে সমাজতন্ত্র আনার জন্য। আর ্ধসঢ়;অভাব থাকবে না,বঙ্গবন্ধু আমাদের কথা শুনবে,তিনি প্রগতিশীল নেতা। দু:খজনক হলেও বঙ্গবন্ধু কথা শুনলেও তার দল কথা রাখেনি বরং সমাজতন্ত্র ও ইসলামী সমাজতন্ত্রের গেরাকলে বাম-ডান খেলার মারপ্যাচে প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা তারই জীবনাবাসন ঘটলো। তখন থেকেই কমরেড মিরান মাস্টার খুবই আহত হলেন এবং বলেন নন্দীবাবু বল এখন আমাদের হাতে নেই। বাড়ির উঠান থেকে সমাজতন্ত্র ঘুরে গেলো বা কাছাকাছি এসেও গোল করতে পারলাম না। এই দু:খ বুকে নিয়ে কমরেড মিরান মাস্টার কমিউনিস্ট পার্টিকে পুনরায় সংগঠিত করতে কাজ করতেন কমরেড নন্দী বাবুর সাথে। আরো দু:খ হলো কমরেড প্রমথ নাথ সরকার এর অকাল মৃত্যু ও তার জায়গা জমি কুচক্রীমহলের হাতে দখল হয়ে গেলে তিনি রাজনীতিতে চরমভাবে ব্যথিত হন। তারপর আমাদের জাতীয় নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ এর অকাল প্রয়ানে তিনি আরো আহত হন এবং আপাতত বিপ্লব অনেক দূরে চলে গেলো বলে তার মত করে একটু আরাল হলেও থাকতে পারেনি ঘরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাকে আসতে হয়েছে জনতার মাঠে।
একেবারে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ৪৯ বছর বয়সে একই উপজেলর বানিয়াজুরিতে পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারপর বিভিন্ন ভাবে আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে ব্যাস্ত রাখতেন। চাকরি থেকে অবসরের পর বিনামুল্যে বানিয়াজুরী সরকারি স্কুল এন্ড কলেজসহ কয়েকটি
বিদ্যালযে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি ইংরেজীর বিখ্যাত শিক্ষক ছিলেন। প্রাইভেট,টিউশনি কোচিং বানিজ্যের বিরুদ্ধে ছিলেন আজীবন। তিনি বলতেন আমার ক্লাস করলে তাকে প্রাইভেট পড়তে হবে না। খুব প্রয়োজন হলে বাসায় আসলেই আমি বিনামুল্যে বুঝিয়ে দেব। বাসায় গিয়ে লক্ষ টাকা দিলেও প্রাইভেট পড়ানো সম্ভাব না।
তার একমাত্র কণ্য সরকারি স্বাস্থ্য কর্মী মিতু আক্তার বলেন- আমার বাবা একজন আদর্শ মানুষ ছিলেন। তিনি নীতি আদর্শে অটল ছিলেন,সাধারন জীবন যাপন করতেন,মিথ্যা কথা,মানুষ ঠকানো একেবারেই অপছন্দ করতেন না। পারিবারিক,সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে কোন প্রকার লোভ লালসা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সমাজে অনেক মানুষ আছে কিন্তু আমার বাবার মতন আদর্শবান মানুষের বড়ই অভাব। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ভাতা পর্যন্ত নিতে চাননি, আমি বুঝিয়ে তদবির করে সেগুলো পাওয়ার ব্যাবস্থা করেছি। আমি আমার বাবার আদর্শকে বিশ^াস করি এবং আগামী দিনগুলোতে তার দেখানো পথেই থাকতে চাই।




