বদরগঞ্জের কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট যেন মগের মুল্লুক

রাহুল সরকার : রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের নাগেরহাট যেন মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। এখানে কারো শাসনই কর্যকর নয়। যে যেমন করে পারছেন এলাকা শাসন করছেন। এজন্য এলাকা ভিত্তিক গড়ে উঠেছে নানা গ্রুপ। এসব গ্রুপের কাজই হল যমুনেশ্বরী নদীতে জেগে ওঠা চরের বালু লুট করা। একেকটি গ্রুপে রয়েছে কমপক্ষে ১০জন করে সদস্য। এসব সদস্য কখনো নৌকায় করে কখনোবা পাড় ঘেঁষে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু লুট করছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে বালু লুটের এমন মহোৎসব চললেও বালু লুটেরাদের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাননা। এবিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ওসি’র সাফ জবাব- বিষয়টি ইউএনও’র আমাদের করণীয় নেই। আবার ইউএনও বলছেন- পুরো বিষয়টি দেখভাল
করবে পুলিশ এক্ষেত্রে ইউএনও’র কিছুই করার নেই।
সরেজমিন এলাকা পরিদর্শণকালে দেখা গেছে নাগেরহাট ঘেঁষে বালু লুটের মহোৎসবে নেমেছেন এলাকার অর্ধশতাধিক মানুষ। তারা নদীর চর কেটে নৌকায় করে বালু এনে পাড়ে ফেলছেন। সেখান থেকে ট্রাক্টর ও ট্রলিতে করে বালু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নানাস্থানে। এক ট্রাক্টর বালু বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার টাকায় আর এক ট্রলি এক হাজার টাকায়। এভাবে মাধাইখামার চরের বালু প্রতিদিন লুট হচ্ছে শত শত ট্রাক্টর ও ট্রলিতে। আবার কেউ কেউ নতুন নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এবিষয়ে সেখানকার কর্মরত শ্রমিকরা কথা বলতে না চাইলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- এসব নৌকা চরের বালু লুটের কাজে ব্যবহৃত হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার লোকজন জানিয়েছেন নৌকায় করে বালু লুটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোট পাঁচজন। এরা হলেন- জামাতি জলিল, বুলু, ফুল বাবু, মামুন এবং রাসেল। এসব তথ্য নিয়ে চরে প্রবেশ করে দেখা গেল আরেক লঙ্কা কাণ্ড। একটি মাটিকাটার এসকেভেটর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা চরে। তবে সাংবাদিকদের দেখেই সটকে পড়েন চালক। এসময় কথা হয় গরু চরাতে আসা বৃদ্ধ জবেদ মিয়ার সাথে। তিনি বলেন এসকেভেটরটি কুতুবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান দুলুর।
এখানকার মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার ইটভাটায়। তিনি বলেন, চরের ওই জায়গা বিক্রি করেছেন জগন্নাথ নামে এক ব্যক্তি। প্রতি ট্রাক্টর মাটি বাবদ তাকে দেয়া হচ্ছে ২২০টাকা করে। সেখান থেকে সোনারপাড়া চরের দিকে রওনা হতেই দেখা যায় মোড়ে মোড়ে বাঁশ দিয়ে বেরিকেড দেয়া হয়েছে।
একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, বালু উত্তোলনকারীরা সাংবাদিক আসার কথা শুনেই এভাবে বেরিকেড দিয়ে সরে পড়েছে। বেরিকেড সরিয়ে সোনারপাড়া চরে প্রবেশ করলেই দেখা যায় কাশবন কিংবা আখক্ষেতের আড়ালে স্তুপ করে রাখা হয়েছে বালু। আর নদীতে ভাসছে ড্রেজার মেশিন বসানোর মাচাং। তবে মাত্র দু’জায়গায় পাড় ঘেঁষে দু’টি বালু উত্তোলনের শ্যালো মেশিন থাকলেও সেগুলো বন্ধ ছিল। এক জেলে জানান- রাতভর ড্রেজার মেশিন চলে। তবে ভোর হওয়ার সাথে সাথে সেগুলো সরিয়ে নেয়া হয়। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো সেখানে মোট তিনটি পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
একটির নেতৃত্বে রয়েছেন জেসিম, একটিতে জামান এবং অপরটিতে সেলিম। একেকটি গ্রুপে ১০থেকে ১৫জন করে বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপ নাকি জেসিমের। এ গ্রুপে রয়েছেন তার পরিবারের সদস্য ছাড়াও একজন বর্তমান ইউপি মেম্বার ও আরেকজন সাবেক ইউপি মেম্বার। এছাড়াও রয়েছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগনেতার তিন ছেলে। এর পাশাপাশি জেসিমের সাথে রয়েছে ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও থানা পুলিশের পরম সখ্যতা। একারণে অন্যদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো অভিযান কিংবা মামলা হলেও জেসিমের বিরুদ্ধে কিছুই হয়না। এদিকে মাধাইখামার চরের একাংশের বালু লুটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন লোহানীপাড়া ইউপি মেম্বার আইয়ুব আলী জান্টু নিজেই।
এসব বিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ওসি হাবিবুর রহমান হাওলাদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলে ওঠেন-সব সময় এগুলো আমাকে বলেন কেন। আপনারা ইউএনওকে বলেন। কারণ বালুর গাড়ি ধরলে অনেক ঝামেলার পর থানায় আনতে হয়। পরবর্তীতে ইউএনও আবার মোবাইল কোর্ট বসাতে চাননা। তাই পারলে এসব বিষয়ে ইউএনওকে বোঝান।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার(ইউএনও) মেহেদী হাসানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জুরিসডিকশনের বাইরে আমার যাওয়া সম্ভব নয়। ল্যাণ্ডের দায়িত্ব আমার- আমি এটা স্বীকার করি। তবে সেখানে যদি চুরি-চামারি হয় সেটা দেখবে পুলিশ। তাছাড়া এর আগে মামলা হয়েছে। তারপরও যদি অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হয় তাহলে সেটা আদালত আর পুলিশের বিষয়, আমার নয়। বালু লুটের মূল নেতৃত্বদানকারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বলেন, সাংবাদিকরা যেমন নিউজে কৌশল করেন এক্ষেত্রে তেমনই কৌশল করেছেন ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা।



