অপরাধ

দালালদের হানা, পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হচ্ছে রোহিঙ্গা কিশোরী-তরুণীরা

কক্সবাজারে অস্বাস্থ্যকর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জীবন কাটছে চরম অপুষ্টি আর দারিদ্র্যের কঠোর কশাঘাতের মধ্যে। এই দুর্বিষহ অবস্থায় শুধু দুমুঠো ভাত আর বেঁচে থাকার তাগিদে—অসহায়-সম্বলহীন-ঠিকানাবিহীন নারীরা পতিতাবৃত্তিতে ঝুঁকে পড়েছে; এদের অধিকাংশই কিশোরী-যুবতী। দিনে তারা একবারের বেশি খাবার পায় না। স্কুলে যায় না। তারা এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে গোপনে, তাদের পিতামাতারও অজ্ঞাতে। বাইরে থেকে মানুষ মনে করবে শরণার্থী শিবিরে পতিতা নেই। কারণ, আশ্রয় শিবিরের বাইরে খদ্দেরের সঙ্গে মিলিত হন তারা। তারা কোনো রোহিঙ্গা পুরুষের সঙ্গেও মিলিত হন না।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে ধর্ষণের শিকার ও দারিদ্র নারীরা মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে যখন মরণপণ লড়াই করছেন, তখন বিভিন্ন দালাল চক্র নানা ফাঁদে ফেলে, নগদ অর্থের লোভ দেখিয়ে নিষিদ্ধ পতিতাবৃত্তিতে নামাচ্ছে; কেউ কেউ অর্থের জন্য নিজেই এ পেশাকে বেছে নিচ্ছেন। পর্যটন এলাকা কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে গিয়ে ক্ষুধা, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি আর বেঁচে থাকার জন্য গোপনে যৌন ব্যবসা চালাচ্ছে অনেকে। তবে কতজন রোহিঙ্গা যুবতী বা নারী এ ব্যবসায় এ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন সে হিসাব নেই জাতিসংঘের কোনো এজেন্সির কাছে। ইউএনএফপিএর কর্মকর্তা সাবা জারিভ বলেন, ‘এর সঠিক হিসাব বের করা কঠিন, এ ধরনের কোনো তথ্য আমাদের নেই।’ ইউনিসেফ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বসবাসের অনুপযোগী শরণার্থী ক্যাম্পের নারী ও শিশুদের প্রতি পাচারকারীদের শ্যেনদৃষ্টি রয়েছে। যদিও রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে যৌনবৃত্তিকে নিষিদ্ধ কাজ হিসেবে দেখা হয়।
রোহিঙ্গা শিবিরের অধিকাংশ পুরুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাছ ধরতে গিয়ে সপ্তাহ-পনের দিন সাগরেই কেটে যায়। এ সুযোগে রোহিঙ্গা যুবতি, কিশোরী ও গৃহবধূরা জড়িয়ে নাম লিখাচ্ছেন পতিতাদের দলে। কক্সবাজারের একশ্রেণির হোটেল মালিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এ সমস্ত রোহিঙ্গা কিশোরীদের নিয়ে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে। যৌনকর্মে রোহিঙ্গা নারীরা তেমন কোনো ধরণের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় মারাত্মক সব যৌনরোগ ছড়িয়ে পড়ছে। কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা শিবিরে বছরের পর বছর ধরে থাকা প্রায় ৫০০ কিশোরী ও নারী যৌন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। নতুন ছয় লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ১০ হাজারের মতো নারী ও কিশোরী দালালের মাধ্যমে এ পেশায় ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
তরুণী রমিদা জানান, ‘যখন আমি দেখলাম আমি ক্ষুধার্ত তখন কেবল যৌনবৃত্তিই ছিল আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমি তখন সবকিছুই করতে পারতাম। আমার নিজের কোনো পছন্দ ছিল না।’ প্রথমবার এক বাংলাদেশি বন্ধুর সঙ্গে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হন তিনি। এর বাইরে যাতায়াত বাবদ আরো ২০০ টাকা পান। এরপর ওই বাংলাদেশি বন্ধু তাকে আরো ডেকে নেয়। তবে টাকার এই পরিমাণটা ক্রমেই কমে আসে। এখন সাধারণত ২০০ টাকার বিনিময়ে কাজ করতে হয় তাকে, যার অর্ধেকটা নিয়ে নেয় দালাল।
তরুণী রমিদা জানান, গড়ে প্রতি সপ্তাহে তিনজন খদ্দেরের সঙ্গে মিলিত হন। মাঝে মাঝে আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া কিংবা মার্কেটে যাওয়ার কথা বলে কক্সবাজারেও যান। আর তার খদ্দের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনীতিক ব্যক্তি। মূলত মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই তার যোগাযোগ হয়। দালালরা জানিয়ে দেন, কোথায় যেতে হবে। তবে একই খদ্দেরের কাছে খুব বেশি যান না তিনি। কারণ, এতে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। রমিদা জন্মনিরোধক ইনজেকশন ব্যবহার করেন, তারপরও এটা তাঁর জন্য ভয়ের। কারণ এইডসের ভয় কাজ করে তাঁর মধ্যে। তবে রমিদা কখনো তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি।
১৮ বছরের রীনা এক দশক ধরে এই ক্যাম্পে বসবাস করছেন। দুই বছর আগে একজন মাদকাসক্তের সঙ্গে তাঁকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই স্বামী তাঁর সঙ্গে দুর্বব্যবহার করতেন, এমনকি মারধরও করতেন। প্রথম সন্তান হওয়ার পর স্বামী রীনাকে ছেড়ে চলে যান। কর্মহীন রীনার জন্য তখন বাচ্চার মুখে খাবার দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময়টাতেই তিনি পতিতাবৃত্তির সিদ্ধান্ত নেন। বয়স তখন ছিল মাত্র ১৬, কিন্তু টাকার প্রয়োজন ছিল।
১৪ বছরের কামরু ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী সহিংসতা শুরু করলে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেয়। পরিবার এতটাই গরিব যে কোনোদিন স্কুলে যেতে পারা তো স্বপ্নের ব্যাপার, ঠিকমতো খাবারই জোটেনি কামরুর। যদিও অন্য অনেক নারীর মতো কামরু তার আসল পরিচয় জানাতে চায়নি।
কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বস্তির সি-ব্লকের বাসিন্দা ১৬ বছরের ইয়াছমিন আক্তার (ছদ্মনাম) জানায়, বস্তির ছোট্র একটি কুড়েঘরে থাকার ২ মাস পর পরিচয় ঘটে রোহিঙ্গাদের নেতা বস্তির মাঝির মেয়ে সাহানা আক্তারের সঙ্গে। সে প্রস্তাব দেয় যৌন পেশায় এসে কাড়িকাড়ি টাকা কামানোর। ভাবতে থাকে ইয়াছমিন। অভাবের সংসার, তাই কৌতুহল বশত: তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। তার সহায়তায় সে সপ্তাহে ৫ দিন কন্ট্রাকের মাধ্যমে সে কক্সবাজারের অভিজাত বিভিন্ন হোটেলে খদ্দেরদের মনোরঞ্জন করে যাচ্ছে। সেই থেকে পথ চলা, আর থামাতে পারেনি ইয়াছমিনকে।
স্থানীয় সূত্র মতে, বেশ কিছু নারী লিপ্সু ব্যক্তি ও কয়েকজন জনপ্রতিনিধিও রোহিঙ্গা নারীদের ক্যাম্প থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে নানাভাবে। কখনো দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে, কখনো লোভ দেখিয়ে, কখনো ভয় দেখিয়ে বা ফাঁদে ফেলে। এরপর এসব নারীদের কাউকে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে যৌন পল্লীতে, যে নারীদের আর খোঁজ মিলছে না। আবার কাউকে দিয়ে নিয়মিত দেহ ব্যবসা করিয়ে কমিশন খাচ্ছে এই অসাধু লোকগুলো।
খদ্দের শিক্ষার্থী আলী (২৩) বলছিলেন, উৎসবে তিনি হয়তো কোনো নারীর সঙ্গে ঘুমান। তবে বিয়ে করার জন্য তিনি ‘কুমারী’ই চাইবেন।
কুতুপালং বাজার সমিতির সভাপতি ডাক্তার মুজিব জানান, প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যাবেলা কালো বোরকা পরিহিত রোহিঙ্গা নারীরা ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে কক্সবাজার শহরে। কক্সবাজারের এক শ্রেণীর হোটেল মালিক পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য এসব রোহিঙ্গা কিশোরীদের নিয়ে পতিতাবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে রোহিঙ্গা কিশোরীরা পুলিশের হাতে আটক হলেও পেশাদার দালালদের সহযোগিতায় তারা জামিনে বেরিয়ে আসছে। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শিবিরের এসব রোহিঙ্গা কিশোরীদের জেলা শহর ও দেশের বিভিন্নস্থানের নামিদামি হোটেলে পতিতা হিসেবে সাপ্লাই দেয়া হচ্ছে। অনেকে অভাবের তাড়নায় এ পেশাকে স্থায়ী হিসেবে বেছে নিয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গা শিবির কেন্দ্রীক পাচারকারি চক্রও সক্রিয় রয়েছে।
উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গারা কক্সবাজার বাসির কাছে বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। তাদের অবাধ বিচরণ ও বেশ্যা বাণিজ্য বন্ধ করা না গেলে এবং প্রত্যাবাসন করা না হলে এখানকার ধর্মীয় মূল্যবোধও নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও ওয়ান ইন্ডিয়া

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button