তারাগঞ্জের যুবক মোখলেছুর রহমানের কফি চাষে সফলতা

রংপুর প্রতিনিধি : দিনের কর্মমুখর সময়ে কিংবা সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে এক কাপ গরম চা কিংবা কফি শরীর ও মনকে নিমিষেই চাঙ্গা করে তোলে। চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন মুহূর্তেই ক্লান্তি দূর করে শরীরে একটা চনমনে ভাব নিয়ে এসে মনকে প্রফুল্ল রাখতে সাহায্য করে। সারাবিশে^ জনপ্রিয়তায় উষ্ণ পানীয়ের মধ্যে চায়ের পরই কফির স্থান। আমাদের দেশেও কফির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। এদেশে চা চাষের ইতিহাস সুদীর্ঘ হলেও কফি চাষ খুব বেশী দিনের নয়। বিগত কয়েক বছরে উত্তরাঞ্চলে বেশ কিছু জেলায় চা চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে এবং বেশ উৎকৃষ্টমানের চা উৎপাদিত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে চা চাষের পরীক্ষামূলক সফলতার পর এবার কফি চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে বিগত বছর গুলোতে বেশকিছু কফি বাগান গড়ে উঠলেও উত্তরবঙ্গে এই প্রথম কফির চাষ হচ্ছে।
ইতোমধ্যে কিছু উদ্যমী ও আগ্রহী কৃষকের হাত ধরে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কফি চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এদেরই একজন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ি
গ্রামের উদ্যমী যুবক মোখলেছুর রহমান। তিনি ২০১৭ সালে কক্সবাজারের একটি নার্সারি থেকে ৮ শ’ কফি গাছের চারা নিয়ে এসে নিজের ২৮ শতাংশ জমিতে রোপণের মাধ্যমে কফি চাষ শুরু করেন। প্রায় দেড় বছরের মাথায় গত বছর বাগানের অল্প কিছু গাছে প্রথম কফির ফুল আসে এবং ওই বছরই তিনি পাঁচ কেজি শুকনো কফি বীজ সংগ্রহ করেন। প্রথমে পরিপক্ক বীজগুলোকে চটের বস্তায় নিয়ে হাত দিয়ে ঘসে খোঁসা ছাড়ানো হয়। এরপর পানি দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করে রোদে শুকানো হয়। শুকনা বীজগুলোকে এরপর আবারো চটের বস্তায় নিয়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করে বীজের উপরের পাতলা শক্ত আবরণটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। তারপর বীজগুলোকে চুলায় ভেজে আটা ভাঙ্গানো মিলে ভাঙ্গিয়ে গুড়ো করে নেয়া হয়। গুড়ো করা কফি বীজের কিছু নিজেদের ব্যবহারের জন্য রেখে বাকিটা আত্মীয়- স্বজনদের মাঝে বিতরণ করেছিলেন তিনি। তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রক্রিয়াজাতকৃত কফির স্বাদ ও গন্ধ বাজারের অন্যান্য প্যাকেটজাত কফির মতোই। চাষী মোখলেছুর রহমান জানান, অনেকটা শখের বশেই তিনি কফি গাছগুলো রোপণ করেছিলেন। কিন্তু গতবছর গাছে ফুল ও ফল আসার পর থেকে তিনি বেশ উৎফুল্ল। এছাড়া এবছরের ব্যাপক উৎপাদন দেখে তিনি কফির বানিজ্যিক চাষাবাদের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এবছর তার বাগানের প্রায় ৪৫০ টি গাছে ফল ধরেছে এবং সবকটি গাছ মিলিয়ে ২৫-৩০ কেজি শুকনো কফি বীজ পাবেন বলে তিনি আশা করছেন। এবছরের সংগৃহীত বীজ থেকে তিনি নিজেই বানিজ্যিক ভাবে চারা উৎপাদন করে আরও প্রায় ১.৫এ কর জায়গায় বাগান সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি উৎপাদিত চারা এলাকায় আগ্রহী কৃষকসহ কফি উদ্যোক্তাদের দ্বারা দেশব্যাপী সরবরাহের মাধ্যমে কফি চাষকে সম্প্রসারিত করার ইচ্ছে পোষণ করেন। তার কফি চাষের সাফল্য দেখে এলাকার অনেকেই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। শুরুতে কফি চাষ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে কৃষক যথাযথ পরিচর্যা নিতে পারছিলেন না।
পরবর্তীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত বাগান পরিদর্শণ করে গাছের গোড়ায় সার প্রয়োগ, মাটির আংশিক অম্লত্ব ধরে রাখার জন্য চুন প্রয়োগ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা, বিভিন্ন রোগ-বালাই (লিফ ব্লাস্ট, এনথ্রাকনোজ, ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রভৃতি) দমনে ব্যবস্থাপত্র প্রদান, বাগানে আংশিক ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষরোপণসহ নানা প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কফি চাষের জন্য উষ্ণ (২০-৩০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা) ও আর্দ্র জলবায়ু এবং বার্ষিক ১৫০-২০০ সে.মি. বৃষ্টিপাত উপযুক্ত। তবে ফল পাকার সময় শুষ্ক আবহাওয়া প্রয়োজন। মৃদু অম্লধর্মী লৌহ, পটাশ, নাইট্রোজেন ও জৈবসমৃদ্ধ উর্বর লালচে দোআঁশ মাটি কফি চাষের পক্ষে আদর্শ। এছাড়াও তীব্র সূর্যালোকের হাত থেকে কফি গাছকে রক্ষার জন্য বাগানের মধ্যে ছায়া প্রদানকারী যেমন- ইপিল-ইপিল ও কলাসহ প্রভৃতি গাছ লাগানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি অফিসার উর্মি তাবাস্সুম বলেন, তারাগঞ্জ উপজেলার মাটি এবং জলবায়ু চা ও কফি চাষের উপযোগী। ফলে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি চা বাগান গড়ে উঠেছে এবং বর্তমানে এখানে কফি চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষক নায্যমূল্যে বাজারজাত করতে পারলে তারাগঞ্জে কফি চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং কফি বীজের প্রক্রিয়া জাতকরণ ও বানিজ্যিকীকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তারাগঞ্জ উপজেলার কফি দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমদানী নির্ভরতা কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।




