জাপানীরা কেমন পর্ব–১৭
জাপানের অন্যতম বৃহত্তম এ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালটির ‘আই সি ইউ’ তে আজ কতোদিন যাবত আছি জানি না। আমি জীবিত নাকি মৃত তাও জানি না। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি নাটকের মতো অনেক কিছু ঘটছে। আজ জাহাঙ্গীর এসে বলল, “মামা, আমি আপনাকে যেমন করেই হোক এ হাসপাতাল থেকে বের করে নিব! আমি গাড়ি নিয়ে গেইটের কাছে থাকবো। আর আপনি হুইল চেয়ারে উঠে চলে আসবেন। পারবেন তো?”
বললাম, পারব।
সে বলল, “আগামি কাল লাঞ্চ টাইমে নার্সগুলি আপনার কাছে থাকবে না। সে সময় ঐ হুইল চেয়ারে বসে গেইটে চলে আসবেন। আমি সেখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবো।”
বললাম, ঠিক আছে। আমি তাই করবো।

পরের দিন লাঞ্চ টাইমে আমি হুইল চেয়ারে উঠে বসে গেইটের দিকে যাচ্ছি। কিছু দূর যাওয়ার পর গতোকাল তানাকাকে দেখতে যে লোকটি এসেছিল তাকে দেখলাম। লোকটি বলল, “আমি হুইল চেয়ার ঠেলে নিচ্ছি। আপনার কষ্ট হচ্ছে। একথা বলে সে হুইল চেয়ার ঠেলতে লাগল। অদূরে জাহাঙ্গীর গাড়ীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে আর বলছে তাড়াতাড়ি এদিকে চলে আসুন। সে লোকটি জোরে ঠেলে যখন যাচ্ছিল ঠিক সে সময়ে একটি যুবতী নার্স এসে লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আমাকে অন্যদিকে সরিয়ে নিল। সে কিছু দূর নিয়ে গিয়ে থামল। তারপর আমার সামনে হাটুগেড়ে বসে বলল, ‘ আমি নার্স নই। আমি হলাম রিহ্যাবিলেটেশন সেন্টারের টীচার। আমার সেন্টারে তোমাকে ১০ দিন হাঁটার ট্রেনিং নিতে হবে!’
লক্ষ করলাম সামনে কিছু পাহাড়ের সারী রয়েছে। টীচারটি বলল, “কী সুন্দর দৃশ্য, তাই না! মুহাম্মদ দেখতে তোমার ভাল লাগছে কি?”
বললাম, খুব সুন্দর!
মহিলা টীচারটির বয়স ত্রিশ এর কাছাকাছি হবে। সে বলল, “এখন যদি তুমি পালিয়ে যেতে চাও তাহলে তোমার নির্ঘাত মৃত্যু হবে – তাকি জান? এমন সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে কি এতো তাড়াতাড়ি মরে যেতে চাও?”
বললাম, “এমন বন্দি অবস্থায় বেঁচে থাকার কোন মানে আছে কি?”
“কিসের বন্দি অবস্থা, টীচার বলল। তুমি এখানে চিকিৎসাধীন আছো।”
সে আরো বলল, “তোমার কি কোন স্বপ্ন নেই! তোমার কেউ নেই এ পৃথিবীতে?”
বললাম, ‘ ভ্যাঙ্কুভারে আমার একটি নাতনি আছে। বয়স ১০ মাস। তাকে দেখতে ইচ্ছা হয়!’
টীচার এবার হা হা হা করে হেসে বলল, “ তোমার স্বপ্ন তো অবশ্যই তোমার নাতনি। সে নিশ্চয় বড় কিউট হবে। আর, তার জন্যে তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে।”
বললাম, “আমার নিউমোনিয়া ভাল হবে কি?”
বলল, “তোমাকে ভাল করার জন্যে আমরা সবাই কাজ করে যাচ্ছি। আর তুমি কি না হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গিয়ে মরতে চাও!”
কিছুক্ষণ পর সে বলল, “চল এখন আমরা ফিরে যাবো এখান থেকে।”
কোথায় নিয়ে যাবে?
বলল, “যাওয়ার পর তুমি চিনতে পারবে।”
টীচারটি, আমাকে এদিক সেদিন ঘুরিয়ে তার সেন্টারে নিয়ে গেল। বলল, “তুমি যদি আরেকটু সুস্থ হও তাহলে এই সেন্টারে তোমাকে এনে ১০ দিন রাখবো। তারপর হাঁটাচলা করার শক্তি অর্জন করলে তোমাকে তোমার বাসায় যেতে দেয়া হবে।”
টীচারটি আমাকে সোঝা আমার বেডে এনে শুইয়ে দিল। তৎক্ষণাৎ সেখানে কর্মরত নার্সগুলি এসে আমাকে ঘিরে নানাহ প্রশ্ন করতে লাগল!
দু’তিন জন নার্স এসে হাঁটু গেঁড়ে আমার বেডের নিকট বসল। তারা আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগলো। একজন বলল, “আমাদের কী তোমার পছন্দ হয় না যে পালিয়ে চলে যেতে চাও?”
কী জবাব দিবো ভাবছিলাম। তখন একটি নার্স প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা মুহাম্মদ সান, বলতো আমাদের মধ্যে কে বেশী সুন্দরী!”
অতি কষ্টের মাঝেও হাসি পেল তার প্রশ্ন শুনে। বললাম, “তিন জনই সমান সুন্দরী। তোমাদের তিন জনকেই আমার পছন্দ।”
“তাহলে বল, এখান থেকে আবার পালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে না। আমাদের ভালবেসে এখানে রোগমুক্ত হওয়া পর্যন্ত থাকবে, প্রমিজ!”
বললাম, ‘প্রমিজ।’
কিছুক্ষণ পর জাহাংজ্ঞীর এসে বলল, “এটা কেমন কাজ করলেন আপনি। কেনো আমাকে দেখেও অন্যদিকে চলে গেলেন?”
বললাম, “আমি তো আমার ইচ্ছায় যাইনি। আমাকে টীচার অন্যদিকে নিয়ে গেল!”
‘বুঝলাম!’ তারপর বলল, “আমি আবার আসবো, মামা!”
বুঝতে পারছিলাম যে জাহাঙ্গীর আমার জন্য অত্যান্ত চিন্তিত, সর্বক্ষণ হাসপাতালের কাছে ঘুরছে। সে আমার ভাগনী জামাই অথচ আমার সন্তানের চেয়েও বেশি উদগ্রীব। সে চলে যাওয়ার পর একটি নার্স এসে হাঁটু গেড়ে আমার বেডের পাশে বসল। তারপর বলল, “মুহাম্মদ সান, তোমার সাথে কিছু কথা বলার আছে আমার!”
বললাম, বল!
এই নার্সটির বয়স বেশি নয়। বড়ো জোর ২৫ বৎসর বয়স হবে। সে নিন্মকন্ঠে বলল, “আমার নাম মারিকো। আমি প্রেমে স্যাকা খেয়েছি। আমার কিচ্ছু ভাল লাগছে না। আমি যথাশীঘ্র বিয়ে করতে চাই। তোমার জানাশুনা আছে এমন একজন বিদেশী ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে কি?”
অতি কষ্টের মাঝেও না হেসে পারলাম না। বললাম, “তোমার বয়স কম। এদেশে নতুন বন্ধু পেতে তোমার বেশিদিন লাগবে না। তাদের একজনকে পছন্দ করে নিও!”
এবার আমার কথা শুনে রেগে গেল মারিকো। বলল, ‘তোমাকে বললাম কি, আর তুমি বলছো কি?”
এখন আমি বড় সমস্যায় পড়লাম। বললাম, “কেন, কোথাও কি আমার ভুল হয়েছে?”
“আমি তোমাকে বলেছি বিদেশী ছেলের কথা। আর, তুমি আমার এই সহজ কথাটি বুঝলে না!”
‘এখন বুঝলাম।’ জবাব দিলাম।
“বল আমাকে তুমি ভাল হয়ে ফিরে গিয়ে আমার জন্যে বিদেশী একটি ছেলে দেখবে। আমি তাকে বিয়ে করবো।”
বললাম, ঠিক আছে, দেখবো।
মনে থাকবে তো?
বললাম, ‘অবশ্যই মনে থাকবে।’
এবার মারিকো খুশি হল। তারপর বলল, ‘তুমি তো অনেক দিন স্নান করনি। আমি গরম পানিতে টাউয়েল ভিজিয়ে এনে তোমার হাত মুখ মুছে দিবো এখন।’ এ বলে সে চলে গেল।
দু’মিনিট পর কয়েকটি টাউয়েল গরম পানিতে ভিজিয়ে পানি ছেকে নিয়ে সে আমার হাত মুখ ও দেহ যথাসম্ভব মুছে দিল। তারপর বলল, “আগামি কাল রাত দু’টা পর্যন্ত তোমাকে দেখার দায়িত্ব আমার। অসুবিধা হলে এই বাটনে টিপ দিবে তখন তোমার সাহায্যে আমি আসব!”
মনে হয় পনের মিনিট পর একটি মহিলা দেখতে একজন জুডো প্লেয়ারের মতো বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী একজন নার্স এসে আমার বেডের কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি পালাতে চেয়েছিলে, তাই না!”
আমি তার চেহারার কাঠিন্য দেখে জবাব দিলাম না। চুপ করে রইলাম।
নার্সটি আবার বলল, “আবার যদি পালাতে চাও তাহলে এই ‘AED’ দিয়ে তোমাকে ইলেক্ট্রিক শক দিবো, বুঝলে?”
আমার বেডের পাশেই সেটা রাখা ছিল। সে সেটি হাতে নিয়ে আমার মুখের কাছে এনে বলল!
বললাম, ‘আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?’
বলল, “ ভয় দেখাবো কেনো কার্যত তা করবো।” একটু থেমে আবার বলল, “তুমি আবার পালাবার চেষ্টা করলে এটা ব্যবহার করবো।”
এমন সময় দেখতে পেলাম আমার স্ত্রীকে কয়েকজন নার্স দরজার নিকট রুমে ঢুকতে বাঁধা দিচ্ছে। এমন আর কখনো দেখিনি। তাকে ভিতরে আসতে দিচ্ছে না। এই নার্সটি তার কাছে গিয়ে বলল, “আপনি কার সাথে দেখা করতে চান?”
সে আমার নাম বলল। নার্সটি উত্তর দিলো, ‘আপনার স্বামি এখানে নেই।’
“এখানেই আছে সে।” আমার স্ত্রী বলল।
“না, সে এ ওয়ার্ডে নেই! আপনি চলে যান!”
এবার আমার স্ত্রী দৃঢ় ভাবে বলল, ‘যতোক্ষণ তার সাথে আমাকে দেখা না করাবে ততক্ষণ আমি ফিরবো না!”
নার্সটি সরাসরি জবাব দিল, “সে মারা গেছে!”
আমি বেড থেকে তাদের কথা শুনছিলাম। কিন্তু তাদের দেখতে পাচ্ছিলাম না!
আমার স্ত্রী বলল, “যদি সে মারা যায় এবং যদি একথা সত্য হয়, তাহলে আমি তার লাশ নিয়ে ঘরে ফিরে যাবো। তুমি তার লাশ এনে দাও আমাকে!”
নার্সটি এমন ব্যবহার কেনো করছে বোধগম্য হল না। সম্ভবত আমি পালাতে চেষ্টা করেছিলাম বলে সে রেগে আছে। কিন্তু এমন কি কখনো হয়? বাস্তবে যা হবার নয় অথচ এখানে তা হচ্ছে। আমি আমার স্ত্রীকে তার নাম ধরে জোরে ডাক দিলাম।
বললাম, “আমি মরিনি, আমি বেঁচে আছি। নার্সটি তোমার সাথে মিথ্যা বলছে।” কিন্তু আমার কন্ঠ সে শুনতে পেল না। পাশের একটি খালী চেয়ারে বসে রইল!
কিছুক্ষণ পর ক্ষিপ্ত ভাবে সে রুমে প্রবেশ করতে চাইল। কিন্তু তাকে কয়েক জন নার্স একত্রে মিলে বাঁধা দিল। আমার বেডের নিকট আসতে দিল না। এখানে শয়তানের ক্রিয়া আছে কি না ভাবতে লাগলাম। অথবা আমার ক্রিটিক্যাল মোমেন্ট ও হতে পারে। শুনেছি মৃত্যুর সময় শয়তানের ভূমিকা বিরক্ত জনক ও ভয়াবহ! এখানে তাই হচ্ছে মনে হল।
আজ একজন সুন্দরী মহিলা আসলেন। তিনি তানাকার ছেলের বউ। তানাকা বলেছিল তার ছেলে একটি কোম্পানি পরিচালনা করে। মহিলার পরনে দামি জামা কাপড়। এ পোষাকে তাকে বেশ ভাল লাগছিল। সে তানাকার কাছে গিয়ে বসল। তাদের কথা বার্তা আমি শুনছিলাম।
মহিলা বললেন, ‘আপনার পায়ের নখ বেশ বড় হয়েছে। এমন বড় হওয়ার মানে কি জানেন?’
মহিলা বললো, ‘হাত পায়ের নখ বৃদ্ধি পাওয়ার মানে হল আপনার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি!’
এ কথা শুনে আমি আমার পায়ের হাত পায়ের নখ দেখলাম। একটুও বৃদ্ধি পায়নি। আমি ভয় পেলাম।
ভাবলাম, আমার নখ যেহেতু বৃদ্ধি পায়নি তাহলে আমার আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা কম।
এমন সময় কিছু নার্স এসে তানাকার কাছে গেল। মহিলাটি দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিল। বলল, ‘আমি একজন নার্স। আমার শহরের একটি হাসপাতালে কাজ করি। যদি প্রয়োজন মনে করেন আপনাদের আমি সাহায্য করবো। কিন্তু এখানের নার্সগুলি বলল, ‘না, আপনি ভিজিটর, সাহায্য করতে হবে না।’
একজন ডাক্তার এসে তানাকাকে পরীক্ষা করলেন। তারপর মহিলাটিকে বললেন, ‘নুতুন একটি হুইল চেয়ার কিনে সেটিতে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার সেট করে নিয়ে আসবেন। কারণ, তানাকাকে ঘরে নিয়ে গিয়েও অক্সিজেন সাপোর্টে রাখতে হবে! তার দেহ পরিমিত অক্সিজেন কঞ্জিউম করছে না!’
ডাক্তারের কথা শুনে আমি ভয় পেলাম। ভাবলাম তাহলে তো আমাকেও এমন ব্যবস্থা নেয়ার কথা তিনি বলবেন।
কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রী এসে বলল, ‘এতোক্ষণ নার্সগুলি আমাকে আটকে রেখেছিল। এখন আসতে দিল।’
বললাম, ‘তারা তোমার সাথে মিথ্যা বলেছে। তোমাদের সব কথা আমি শুনতে পেয়েছি।’
“যাক সে কথা, এখন কেমন বোধ করছো বল?”
বললাম, ‘এতোদিন এখানে আছি অথচ তারা আমাকে খাবার খেতে দিল না। সম্ভবত ভাল হতে অনেক দেরী হবে।’
সে কিছু বলল না। চুপ করে রইল। বললাম, ‘তানাকার জন্যে নতুন হুইল চেয়ারে অক্সিজেন সিলিন্ডার সেট করে আনতে তার পুত্রবধূকে ডাক্তার বলেছেন। আমার জন্যও কি সে রকম কিছু করতে বলবে?’
‘যদি ডাক্তার বলে সে ব্যবস্থা করবো!’
“জান কি, তানাকাকে নাকি তার বাকি জীবন অক্সিজেন সাপোর্টে থাকতে হবে!’
এমন সময় নার্স মারিকো এসে বলল, “ কেমন আছো, মুহাম্মদ!”
বললাম, ভাল না।
“কেন এমন বলছ?”
বললাম, “মারিকো, বলতো ঐ দজ্জাল নার্সটি কে?”
মারিকো বলল, “সে সিকিউরিটি নার্স। মাঝে মাঝে অনেক রুগী ছাড়পত্র না নিয়েই পালিয়ে যায়। তাই তার কাজ হল সব রোগীর উপর নজর রাখার।”
বললাম, “সে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে।’
বলল, ‘তুমি যে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলে তাই রেগেছে!’
এবার আমার স্ত্রী কথা বলল, ‘আচ্ছা মারিকো, এ রোগী তোমাদের সাহায্য ছাড়া বেডে উঠে বসতে পারে না। তাছাড়া তার দেহে এতোটুকু বল নেই। সে কেমনে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল আমাকে বল!
‘নার্স মারিকো মৃদু হাসল। তার হাসিটি রহস্যজনক মনে হল। কিন্তু আমার স্ত্রীর প্রশ্নের কোন জবাব দিল না!’
তানাকার পুত্রবধূ কিছু বই নিয়ে এসেছেন। আমাকেও একটি বই পড়তে দিলেন।
সে তানাকাকে জিজ্ঞাসা করল, “রিলিজ অর্ডার যদি ডাক্তার দেয়, প্রথমে আপনি কোথায় যাবেন ভাবছেন। ঘরে ফিরে যাবেন কি?”
তানাকা বলল, “আমি Hot-spring SPA তে কিছুদিন থাকবো।”

জাপানের হটস্প্রিং স্পা- গুলি বেশ সুন্দর। উষ্ণ প্রস্রবনের উপর বড় বড় আবাসিক হোটেল রয়েছে। সেখানে থাকা খাওয়া ও হট্স্প্রিং এ স্নান করতে বেশ ভাল লাগে। তবে সবাইকে ল্যাংটা হয়ে স্নান করতে হয়। আনডার ওয়ার পরেও স্নান করা নিষেধ! ছোট একটি টাউয়েল হাতে নিয়ে এক সাথে অনেক লোক ল্যাংটা হয়ে গোসল করে। মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে।
আমি বললাম, ‘তানাকা সান তকিগাওয়াতে শহরে একটি আছে। সেটাতে আমি গিয়েছি! সেটি তোমার জন্য কাছে হবে!’
কিন্তু তানাকা বলল, ‘নাহ, আমি টোকিওর হাচিওজির স্পা- পছন্দ করি।’ তানাকা তার পুত্রবধূকে সেটিতে রিজারভেশন করে রাখতে বলল।
পরের দিন মহিলা অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগানো নতুন হুইল চেয়ার নিয়ে আসলেন। তিনি তানাকাকে বললেন, “আজ যদি রিলিজ অর্ডার পাই তাইলে আজই আপনাকে নিয়ে যাবো!”
কাছের ডিউটিরত ডাক্তারটি বললেন, “ আরো দু’দিন পর আমরা তার রিলিজ অর্ডার ইস্যু করে দিব!”
তাহলে কি আমি দু’দিন পরে নিতে আসব?
ডাক্তারটি বললেন, “ঠিক আছে, দু’দিন পরেই আসুন।”
তানাকার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে একটি জাপানী পত্রিকা পড়ছিলাম। তাতে দেখলাম, taxidermist মিঃ আকেবনো নামে একজনকে পুরুষ্কার দেয়া হয়েছে। টুনির মতো ছোট্র একটি পাখী। সেটাকে মেরে taxiderm করা হয়েছে। Taxiderm হল এমন এক পদ্বতি যে পদ্বতিতে মৃত পাখির বা পশুর ভিতরের মাংশ নিয়ে ভিতরে তূলা কিংবা কটন দিয়ে ভরাট করা হয়। তারপর পাখিটিকে শুকিয়ে ঘরে রাখা হয়। এতে পাখি বা জন্তুর সৌন্দর্য একটুও কমে না। দেখতে ভালই লাগে। একটি ছোট ২ ইঞ্চি বাই ২ ইঞ্চি কাঠের উপর এক পায়ে পাখিটি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু একটি পা’ কেটে উলটো করে কাঠের উপর সেট করা হয়েছে। অর্থাৎ পায়ের আঙ্গুলের দিক উপর দিকে পেটে লাগিয়ে উরুর দিকটি কাঠের সাথে লাগানো আছে। অন্য পা’টি পাখিটি উপরে তুলে রেখেছে। চতুর্কোণ কাঠের পাশেই একটি ছোট প্লেট আছে। সেটা পাখির আদাড়ের জন্য। আদাড় খেয়ে পাখিটি হা করে তৃপ্তির গান গাইছে। এমন একটি ক্রাফট। যা দেখে আমার ভাল লাগল। কিন্তু তার পা উল্টো করে সেট করাতে এবং তার মানে কী হতে পারে তা নিয়ে ভাবনায় পাড়লাম। একজন নার্সকে সেটি দেখালাম। সে দেখে কোন কমেন্ট করলো না, মৃদু হাসল!
পাখিটির পা’ এমন ভাবে সেট করার অর্থ কী কোন অশনি সঙ্গেত! এর সাথে আমার ভাগ্য মিশ্রিত না কি? এমন কতোকিছু ভাবনা এসে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
যখন পত্রিকাটি মনোযোগ দিয়ে দেখছি ঠিক তখন রুমের উলটা দিক থেকে তিন জন পুরুষ প্রবেশ করলো। একজনের বয়স ষাটের কোঠায় হবে আর বাকি দু’জনের বয়স ত্রিশের কোঠায়। কিন্তু রুমটির অন্যদিকে কোন দরজা নেই! তারা ওদিক দিয়ে এ রুমে কি করে প্রবেশ করল বুঝলাম না। সবই অলৌকিক মনে হচ্ছে। আমার পত্রিকাটির দিকে এক নজর দেখে বয়স্ক লোকটি বললেন, “আপনি বিদেশি? মনে হয় আপনার সাথে কোথাও আমার আরেক বার সাক্ষাৎ হয়েছে।”
তাদের পরনে সাদা এপ্রন। তাঁর সঙ্গি দু’জন বলল, “স্যার, তখন আমরাও সঙ্গে ছিলাম। ওনাকে দেখেছি!”
তাদের কথা শুনে চিন্তা করতে লাগলাম। তারা তখন পাশের রুমে প্রবেশ করলেন।
তারপর একজন নার্স এসে বলল, “শুন মুহাম্মদ, তারা খুবই উচ্চপদস্ত লোক। এখানে সবাই তাদের সন্মান করে।
জানতে চাইলাম, “কি ধরনের কাজ করেন তারা?”
বলল, “তারা সবাই জার্নালিষ্ট রুগীদের দেখতে আসেন!”
তাদের সাথে ষাটের কোঠায় যার বয়স, তাঁর চেহারা হুবহু পাশের রুমের রোগী জার্নালিষ্ট এর মতো। পাশের রুমের জার্নালিষ্ট এর ক্যান্সার ঘোষণা করার পর অনেকদিন তাঁকে দেখি না। তবে কি তিনি মৃত্যু বরণ করেছেন? আর, এখন যে তিনজন আসলেন ওয়াল ভেদ করে, যেদিকে কোন দরজা নেই, তবে কি তারা স্বর্গ থেকে এখানে এসেছেন? শুনেছি মৃত্যুর পর তাদের আত্মা আবার ফিরে আসে। এখন আমার মনে এক ধরণের ভয় এসে ভর করল!
এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটি নরনারী জন্মের পর বয়সের বিভিন্ন পর্যায়ে একটির পর একটি রোগে আক্রান্ত হোন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বদৌলতে অনেক দুরারোগ্য রোগ থেকেও আরোগ্য লাভ করেন। তন্মধ্যে ‘বডি ইমিউনিটি’র ক্রিয়া যথাযথ হলে আরোগ্য লাভ করতে তেমন সময় লাগে না। যে সকল রোগীর ‘বডি ইমিউটি’ বা দেহের প্রতিরক্ষা শক্তি কম থাকে তাদের রোগের সাথে দীর্ঘদিন লড়ে আরোগ্য হন। আবার তার চেয়েও কম প্রতিরক্ষা শক্তি যাদের তাদের অকালে মৃত্যু বরণ করতে হয়। এ হল মানুষের নিয়তি।
আমার অদৃষ্টে তেমন সুখ নেই! অনেক রোগের সাথে লড়ে আজ অব্দি সুন্দর এ পৃথিবীতে বেঁচে রয়েছি। হয়তো বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য। আমার মতো অনেকে নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক কষ্ট পায়। অনেকে রক্ষা পান আবার অনেকে মৃত্যু বরণ করেন। এদিকে নতুন নতুন ভাইরাস সৃষ্টি হচ্ছে, যেমন, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু এবং এবোলা ভাইরাস, ইত্যাদি, মারাত্মক। গেল বছরে এবোলা ভাইরাসের আক্রমনে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে। এসব ভাইরাসের কার্যকর প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। উন্নত দেশগুলিতে অবশ্য প্রতিষেধক বের করার জন্য ব্যাপক গবেষণা চলছে। জাপানের জনগণের গড়পড়তা হায়াত ৮৪ বৎসর। তাদের হায়াত বৃদ্ধির মূল কারণ হল দেশটিতে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
স্বাস্থ্য বীমা থাকার কারণে কম খরচে চিকিৎসা করানো সবার পক্ষে সম্ভব। এমন ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই বলে রোগীরা কতিপয় বিজনেস ক্লিনিক বা তথাকথিত মেডিক্যাল হাসপাতালে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত টাকা দিয়েও জীবন রক্ষা করতে পারে না। আর, ডাক্তারদের অপচিকিৎসায় যে সকল রোগীর মৃত্যু হচ্ছে সে ব্যাপারে সরকারি তদন্তও হয় না। তাই, রোগী মারা গেলে ডাক্তারদের কিছুই হয় না। অথচ, জাপানে এমনতর কোন অঘটন অর্থাৎ অপমৃত্যু হাসপাতালে হলে তদন্ত করা হয়। ডাক্তারের কোন গাফেলতি থাকলে লাইসেন্স ক্যান্সেল করা হয়। এমনতর কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে বলেই তো জাপানের চিকিৎসা ব্যবস্থার এতো উন্নতি হয়েছে।
জন্মের পর আমার জীবনের ভয়াবহ একটি রোগে আক্রান্ত হয়েছি ২০১২ সালের ২৮ আগষ্টে। তখন জাপানে ব্যাপক তাপদাহ চলছিল। যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং!” জাপান শীত প্রধান দেশগুলির অন্তর্ভুক্ত হলেও গ্রীষ্মকালে কিন্তু বিশ্রী ধরণের গরম পড়ে। টিভি ও অন্যান্য মাস মিডিয়াতে এ ব্যাপারে শতর্ক করে দেয়া হয়। আমার ভাগ্যে যে এর পরণতি মারাত্মক হবে তা কখনো ভাবিনি। প্রথমে জ্বর হল। পরের দিন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার এক্স-রে করে বললেন, “অতিরিক্ত গরমে অনেকের এমন জ্বর হচ্ছে। ঔষধ দিচ্ছি তাতে জ্বর কমে যাবে।”
ঘরে ফিরে ঔষধ সেবনেও আমার জ্বর তো কমলই না বরং আরেক ডিগ্রী বেড়ে গেল। ডাক্তারের দেয়া ঔষধে বিশ্বাস হারালাম। পরের দিন বিকালে টয়লেটে যাওয়ার সময় অর্ধপথে পড়ে গেলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারালাম। এবার এম্বুলেন্সে আবার সে হাসপাতালের ‘ইমারজেন্সি সেকশনে’ গেলাম। তারপর আমি নাকি ১১ দিন অজ্ঞান ছিলাম। আত্মীয় স্বজনের কান্নাকাটি চলছে। কিন্তু এ সময়ে আমি এক আলৌকিক জগতে চলে গেলাম। অনেকের মতে অবচেতন অবস্থায় অনেক রোগী অলৌকিক জগতে বিচরণ করতে থাকে। আবার অনেকে near to the death point ও বলে। আমি যখন মৃত্যুর সাথে লড়ছি তখন এসব দেখেছি যা এতোদিন মনে পোষণ করে রেখেছি। কোন অতিরঞ্জিত কাহিনী এতে নেই। তবে যা লিখে যাচ্ছি তাতে অনেকে ‘পরকাল’ সম্পর্কে অথবা মৃত্যুর পূর্বক্ষণে যারা জ্ঞান হারায় – তখন অজানা এক অস্থির জগতে তাদের মন বিচরণ করবে! সে রকম কিছু অবিশ্বাস্য রকম ধারণা পাঠকেরা পাবেন বলে মনে করি। আমার ভাগ্যেও তাই হয়েছিল – যা আজো স্মরণে আছে!
আমি জানি যে অজ্ঞান হওয়ার পরেই জাপানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ক্যানাডায় অবস্থিত একটি ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেটি বৃটিশ কলাম্বিয়া ষ্টেটের ভ্যাঙ্কুভার সিটির অদূরে অবস্থিত। এই সিটির একটি আবাসিক এলাকায় বাড়ি কিনে আমার মেয়ে সাকুরা তার স্বামির সাথে থাকে। মাত্র আটমাস পূর্বে আমার একটি নাতনি হয়েছে যার ছবি দেখেছি কিন্তু বাস্তবে তাঁকে দেখিনি। অজ্ঞান অবস্থায় সে রক্তের টানেই কী আমার এখানে আসা? নাকি অন্য কিছু – তা তিন বৎসর পরেও বুঝতে পারিনি।

‘আই সি ইউ’ এর একটি বেডে শুয়ে আছি। এমন সময় ব্ল্যাক ছেলে নার্সটি বৃষ্টিতে ভিজে প্রবেশ করে ইংরেজীতে বলল, “ ক্যানাডার এই ষ্টেটে বৃষ্টি বেশি হয়। বাসা থেকে যখন আসছিলাম হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল!”
তার কথা শুনে হাসলাম। বললাম, “শুনেছি এখানে শীতও নাকি অন্যান্য অঞ্চল থেকে কম।”
ঠিক বলেছেন, “ ভ্যাঙ্কুভারে শীতের প্রভাব অন্যান্য ষ্টেটের চেয়ে কম!”
এমন সময় এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। আমার পাশের রুমের বা দিকের ওয়াল বদলে গিয়ে মোটা গ্লাসের ওয়ালে পরিণত হল! তার পাশে সামান্য খালী স্থান আছে। সেখানে কাল দাড়ি ওয়ালা দীর্ঘদেহি কৃষ্ণাঙ্গ একজন পুরুষ এসে প্রথমে ব্রডকাষ্টের জন্য একটি টিভি ডিশ এন্টেনা বসালেন। তার বয়স চল্লিশ-পয়তাল্লিশ হবে। ছোট একটি টেবিল এনে রেখে একটি মাইক ও ছোট একটি টিভি সেটার উপরে ব্রডকাষ্টের জন্য বসালেন। আর, পাশের রুমের একটি ওয়ালে এবং করিডোরের ওয়ালে তিন পিস ফাটো সেট করলেন। ফটোগুলি আমি দেখতে পাচ্ছি। সেটিতে চার কি পাঁচ বৎসর বয়সের তিনটি ছেলে শিশুর ছবি এবং শিশুগুলি হাসিমুখে রয়েছে। এ তিনটি শিশুর মধ্যে একটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু রয়েছে। এমন সময় পুরুষ লোকটি উঠে দাঁড়ালেন। তার সঙ্গী দু’জন সাহকারীও রয়েছে। প্রথমে তিনি একটি নার্সকে বললেন, “এ হাসপাতালে আপত্তিজনক বর্ণ বৈষম্য রয়েছে। এখন আমরা এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপি টিভিতে ব্রডকাষ্ট করবো!”
তার কথা শুনামাত্র একটি নার্স দৌড়ে গিয়ে এ হাসপাতালের প্রধান সেই ডাঃ মিসেস কিমুরাকে নিয়ে এলেন। ডাঃ কিমুরা লোকটিকে সরাসরি কিছু না বলে নার্সটিকে বললেন, “তারা হাসপাতাল সম্পর্কে কী প্রচার করতে চায় কাগজে লিখে জানাতে বল!”
নার্সটি গিয়ে টিভি টীম প্রধানকে তা বলল।
লোকটি একটি কাগজে এক পৃষ্টা পূর্ণ করে কিছু লিখে নার্সটির হাতে দিলেন।
ডাঃ কিমুরা সেটি দেখে বললেন, “না, আমাদের হাসপাতালের উপর এমন বক্তব্য প্রচার করা যাবে না।”
নার্স লোকটিকে একথা বলার পর তিনি জবাব দিলেন, “আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাব। কারো বাঁধা মানবো না বলে তিনি টেবিলের সামনে বসে মাইকে ইংলিশে বলতে লাগলেন, “ এ হাসপাতালে একজন নন জাপানিজ আছেন। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি যে তিনি বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তার প্রতি বৈষম্য মূলক আচরণ করা হচ্ছে – দিনের পর দিন।”
এমন সময় লক্ষ করলাম মিসেস কিমুরার মুখাবয়ব বদলে ফ্যাঁকাসে হয়ে গিয়েছে। তিনি ওয়ালের পাশে রাখা একটি চেয়ারে বসে হাসপাতালের মেইন ক্যম্পাস সুদূর জাপানে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু জাপান এবং ক্যানাডার টাইমের ব্যতিক্রম হল ১২ ঘন্টা। এ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হলেন মহিলার আত্মীয়। টাইমের ব্যবধানের জন্যে ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে মহিলা হতাশ হলেন। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে নির্বাক বসে রইলেন।
“আই সি ইউ” তে এখন আমরা দু’জন বেডে শুয়ে আছি। তানাকা বাম পাশের বেডে শুয়ে আছে।
তাকে মাঝ খানের পর্দাটির জন্য দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার কন্ঠ শুনতে পাচ্ছি। মনে হল টিভি টীম আসাতে তিনি খুশি হয়েছেন। টীমটির বাকি দু’জন লোক ক্যামেরা দিয়ে তার এবং আমার ফটো তুলছেন। এমন সময় শুনতে পেলাম টীম প্রধান বলছেন, “লক্ষ করুণ, রোগীর হাত পা শক্ত বেল্ট দিয়ে বেঁধে রেখেছে। রোগী তার হাত পা নাড়াতে কষ্ট পাচ্ছে।” তিনি আমার দিকে টিভি ক্যামেরা ঘুরিয়ে আমাকে ইঙ্গিত করলেন হাত উঠাবার জন্য। আমি চেষ্টা করলাম। হাত ১০ সেন্টিমিটারের উপর তুলতে পারলাম না। সরাসরি এ ব্রডকাষ্ট হচ্ছে। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, “ লক্ষ করুণ, হাসপাতালে রাখা আছে ডজন খানেক ডিনামাইট। এসব রাখার মানে কী হতে পারে?”
ডিনামাইটের কথা শুনে পাশের কামরায় দেখতে পেলাম ওয়ালের পাশে লম্বা টেবিলের উপর অনেকগুলি ডিনামাইট রাখা আছে। সেগুলি দেখে আমি অবাক হলাম। কারণ, সে গুলি আমি আগে কখনো দেখিনি। অথবা সেগুলি হয়তো ছিল শুধু আমার নজরে পড়েনি।
লোকটি বলে যাচ্ছে, “এসব ডিনামাইট নাকি হাসপাতাল প্রধানের শখের কলেকশন! বাহ, চমৎকার হবি!”
এমন সময় ডাঃ কিমুরা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি নার্সগুলিকে ডেকে একত্রিত করলেন। তাদের মধ্যে সেই দজ্জাল নার্সটিও আছে।
ডাঃ কিমুরা তাদের বললেন, “ তোমারা সবাই গিয়ে টিভি ব্রডকাষ্টের সবগুলি এন্টেনা খুলে ফেল অথবা কেটে ফেল। তাহলে সে আমাদের হাসপাতালের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে পারবে না!”
এ কথা বলামাত্র দজ্জাল নার্সটি ডিশ এন্টেনার সাথে যতগুলি তার যুক্ত ছিল সেগুলি একটির পর একটি হাত দিয়ে খুলতে লাগলো।
মনে করেছিলাম যে টীম প্রধান দীর্ঘদেহি লোকটি নার্সটিকে বাঁধা দিবেন। কিন্তু তিনি কোন বাঁধাই দিলেন না। তিনি তার কথাই বলে যাচ্ছেন। তার সঙ্গীরা অন্যদিকে লাইন যুক্ত করে দিল। ব্রডকাষ্টের কাজ ঠিক মতোই চলছে।
কখনো স্যালাইন বেঁধে রাখার ষ্টীলের যে ষ্ট্যান্ডটি রয়েছে সেটি থেকে ব্রডকাষ্ট হচ্ছে। সেটা থেকে ‘সি সি সি’ এমন একটি শব্দ বের হচ্ছে। সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক ওয়েভ যেদিকে ফাঁক পাচ্ছে সেদিক দিয়ে গিয়ে পাহাড়ের উপর যে বড় টাউয়ারটি আছে সেদিকে ছুটে যাচ্ছে। বড় আশ্চর্যের ব্যাপার যে ইলেক্ট্রিক ওয়েভ গুলিও আমি দেখতে পাচ্ছি। চিকন হালকা পাতলা রঙ্গিন রেশমি সূতার মতো এবং প্রস্থে ২০ সেন্টিমিটার হবে। একটি নার্স দৌড়ে এসে ষ্টীলের ষ্ট্যান্ডের মাথায় রাবারের ক্যাপ পরিয়ে দিল। তখন অন্য রোগীর ষ্ট্যান্ড থেকে ওয়েভ যাচ্ছে। তারা সেখানেও রাবারের ক্যাপ পরাচ্ছে। তখন ইলেক্ট্রিক বাল্ব যে ধাতব হোল্ডারে সেট করা হয়েছে সেখান থেকে ওয়েভ যাচ্ছে। নার্সগুলি লাফালাফি করে সর্বত্র গিয়ে রাবারের ক্যাপ লাগিয়ে দিচ্ছে কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। ব্রডকাষ্টিং চলছে!
মিসেস কিমুরা টেবিলের উপর রাখা টিভিটির দিকে তাকালেন। ছোট টিভিতে হাসপাতালের কোন কোন স্থানের দৃশ্য ব্রডকাষ্ট হচ্ছে তা দেখা যায়। টীম প্রধান টের পেয়ে স্ক্রিনে সেই শিশু তিনটির যে ফটো রয়েছে সেটি অভিনব ভাবে সেট করে ফেলেন। কী সুন্দর কিউট শিশু তিনটি। তখন আর বুঝার উপায় থাকে না যে তাতে কী ব্রডকাষ্ট হচ্ছে। এদিকে নার্সগুলি ব্রডকাষ্ট বন্ধ করতে লাফিয়ে লাফিয়ে রাবারের ক্যাপ পরিয়ে দিচ্ছে। তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কিন্তু ব্রডকাষ্টের কাজ অলৌকিক ভাবে চলছে। আমার রুমের দরজা দিয়ে বের হয়ে ইলেক্ট্রিক ওয়েভ পাশের রুমের যে দরজাটি রয়েছে – সেটি ভিতরে আসা এবং বের হয়ে হবার জন্য রয়েছে, সে দরজাটি দিয়ে আঁকাবাঁকা ভাবে ‘বৈদ্যুতিক ঢেউ’ বের হচ্ছে!
তখন লক্ষ করলাম যে তিনজন জার্নালিষ্ট ওয়াল ভেদকরে আমার কামরায় একবার এসেছিলেন তারাও সে ইলেক্ট্রিক ওয়েব হালকা ভাবে হাত লাগিয়ে মেইন ফটকের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে যাতে ওয়েভ সহজে ব্রডকাষ্টিং টাউয়ারে যায়। আরো দেখলাম সেই বৃদ্ধ জার্নালিষ্ট যার ক্যান্সার হয়েছিল, তিনিও তাদের সাথে যথাসম্ভব কাজ করে যাচ্ছেন। অবাক হলাম তাঁকে এখানে দেখে। তিনিও সেই টিভি টীমের সাথে যুক্ত! আর, আমার ভাগনী রোক্সানাকে দেখলাম তাঁদের পাশে একটি চেয়ারে মন খারাপ করে বসে আছে। তখন মনে করলাম যে জাহাঙ্গীর এ টীমকে খবর দিয়ে এনেছে। ( কিন্তু আমার সে ধারণা পরে ভুল প্রমাণীত হয়েছে।)
এখন মনে হচ্ছে আমার এই ছোট “আই সি ইউ” তে ছোট একটি ভয়াবহ নাটক চলছে। নার্সগুলি লাফালাফি করছে টিভি ব্রডকাষ্টিং বন্ধ রাখতে কিন্তু তারা কিছুতেই বন্ধ করতে পারছে না। ব্রডকাষ্টিং চলছে। এমন সময় তানাকার কন্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলছে, “চমৎকার, তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও!”
সম্পূর্ণভাবে ব্রডকাষ্টিং এর কাজ সেরে টিভি টীম চলে গেল। এখন এক অদ্ভুত নিরবতা বিরাজ করছে। তারা চলে গেলেও শিশু তিনটির যে ফটো ওয়ালে লাগিয়েছিল সেগুলি নিয়ে যায়নি। আহা কী সুন্দর হাসিহাসি মুখ তাদের। কৃষ্ণাঙ্গ শিশুটি আর শ্বেতাঙ্গ ছেলে দু’টি মুখামুখি দাঁড়িয়ে আছে। আমি যখন তাদের ফটোগুলি দেখছি ঠিক সেই সময়ে লক্ষ করলাম যে পাশের রুমটিতে একজন পুরুষ আড়াআড়ি ভাবে বুকে দু’ হাত রেখে আমার দিকে চেয়ে আছেন। তাঁর বয়স সত্তরের কাছাকাছি, পরনে সাদা হাফহাতা শার্ট, গায়ের বর্ণ ফরসা এবং মাথার সবগুলি চূল সাদা। তিনি নিরবে আমাকে দেখছেন। পাশের কামরা আর আমার কামরার মাঝামাঝি মোটা গ্লাসের দেয়াল রয়েছে। তাই তাঁকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তিনি আমার দিকে চেয়ে আছেন কেন? চোখ বুঝে চিন্তা করতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখি তিনি একই ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এক সময় তার সাথে আমার চোখাচোখি হয়ে গেল এবং ঠিক তখন তিনি মাথা নাড়িয়ে আমাকে ইশারা দিলেন কামরা থেকে বের হয়ে তাঁর নিকট যেতে। তারপর আরেক বার চোখাচোখি হল। এবারও তিনি মাথা নেড়ে একই ভাবে ইশারা দিলেন। তখন ভাবলাম তাকে কী জবাব দেয়া যায়!
আমি আমার হাত সামান্য উপরে উঠিয়ে বাঁধা বেল্টগুলি দেখালাম। বুঝালাম যে আমি বন্দি, আমাকে বেঁধে রেখেছে। যাওয়া সম্ভব নয়!
তারপর বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে তিনি চলে গেলেন!
চলে যাওয়ার পর বড় ভাবনায় পড়লাম। তিনি কে? কেন আমাকে যেতে ইশারা করেছিলেন? আমি তো আমার বেডে বাঁধা অবস্থায় ছিলাম। ইচ্ছা করলে তিনি নিজেই তো আমার বেডের কাছে আসতে পারতেন এবং আমার বেল্ট খুলে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন! কিন্তু তিনি আমার বেডের কাছে আসেননি কেন? এমনতর অনেক প্রশ্ন মাথায় এসে ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমার বাবা বলেছিলেন, “ আজরাইল যখন কারো রুহ্ নিতে আসেন তখন জবরদস্তি করে রূহ নেন না। যার রুহ নিতে আসেন সে ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় তার রুহ না দেয় তখন তিনি চলে যান!”
এসব ভাবনাগুলি আমাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। বারবার বাবার কথাগুলি স্মরণ করছিলাম। তিনি আরো বলেছিলেন যে এক পর্যায়ে রোগী নিজেই তার রুহ্ আজরাইলকে দিয়ে দেন। কারণ, রোগী কষ্টের চেয়ে ওপারে চলে যাওয়াটাকে তখন বেছে নেন! আমি যখন হাই স্কুলে পড়ি তখন বাবা এসব কথা আমাকে বলেছিলেন। অনেক বছর আগের কথা। আজ কেন বাবার সেই কথাগুলি মনে আসছে কিছু বুঝতে পারলাম না! তবে সে ভদ্রলোক কি তাহলে সেই আজরাইল? তিনি আমাকে ওপারে নিয়ে যেতে এসেছিলেন!
( চলবে )




